শনিবার, মার্চ ২৩

‘ঠিক আছে আমিও মনে রাখব!’, রেগে গিয়ে সনিয়াকে বললেন মমতা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ব্যাপারটা ঘটে গেল হয়তো একেবারে কাকতালীয় ভাবেই! দেশের ‘গণতন্ত্রকে বাঁচাতে’ দিল্লির যন্তরমন্তরে ধর্ণা দিতে গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু দিল্লি গেলেই উনি যা করেন, এক ফাঁকে বুধবার সংসদ ভবনে গিয়েছিলেন। সবে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলের অফিসে গিয়ে বসেছেন। ও দিকে তখন লোকসভায় ধুন্ধুমার চলছে!

বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে লোকসভায় বিল পেশ করেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। সেই বিল নিয়ে বিতর্কে অংশ নিয়ে দৃশ্যত উত্তেজিত কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী বলছেন, “আমি এই বিলকে সমর্থন করি। কারণ, বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থা তথা চিটফান্ড বাংলায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে সর্বস্বান্ত করেছে।” অধীর যখন বক্তৃতা শুরু করেছেন, তৃণমূলের সাংসদরা তখন উঠে দাঁড়িয়েই ছিলেন। মোদী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলছেন। সেই চিৎকারের মধ্যেই অধীরবাবু বলেন, “এই এখানে যাঁরা চোর চোর বলছে, তাঁরাই বাংলায় চিটফান্ড কাণ্ডের জন্য দায়ী। চোর মাচায়ে শোর! বাংলায় গরিব মানুষের টাকা লুঠ করেছে। সেই কারণেই এই বিলে আমি সমর্থন জানাচ্ছি।”

বহরমপুরের কংগ্রেস সাংসদ তথা প্রাক্তন রেল প্রতিমন্ত্রী যখন তৃণমূলের বিরুদ্ধে এমন চাঁচাছোলা অভিযোগ করছেন, তখন ট্রেজারি বেঞ্চে বসে দৃশ্যত হাসি মুখে তা উপভোগ করছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। বিজেপি-র সাংসদরাও টেবিল চাপড়ে অধীরের বক্তব্যকে সমর্থন করেন। ওদিকে বিরোধী বেঞ্চের প্রথম সারিতে বসে গোটা ঘটনাটি চুপচাপ দেখেন সনিয়া গান্ধী। তিনি অধীর চৌধুরীকে একবারও বিরত করেননি।

শুধু অধীর চৌধুরী নন, একই ভাবে চিটফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হন সিপিএম সাংসদ মহম্মদ সেলিমও। পরে অবশ্য তৃণমূল সাংসদ তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সৌগত রায় বিল বিতর্কে অংশ নিয়ে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বাংলায় কোনও চিটফান্ড হয়নি। তা শুরু হয়েছে আশির দশক থেকে। যখন বামেরা বাংলায় ক্ষমতায় ছিলেন। বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় ক্ষমতায় এসে চিটফান্ডের রমরমা বন্ধ করেছেন। বহু অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছেন।

লোকসভার ভিতরে এই কাণ্ড দেখেই রেগে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে সংসদের সেন্ট্রাল হলে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় সনিয়া গান্ধীর। সামান্য সৌজন্য বিনিময় হয়েছে কি হয়নি, সনিয়ার কাছে মমতা অভিযোগ করেন, লোকসভায় অধীর চৌধুরী যেটা করলেন সেটা ঠিক হল না। সূত্রের খবর, তিনি প্রাক্তন কংগ্রেস সভানেত্রীকে এও বলেন, এর পর কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে কী করে? কিন্তু সনিয়া ধীর স্থির হয়েই বলেন, বাংলায় তৃণমূল যেমন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছে, তেমন কংগ্রেসও তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছে। তবে রাজনীতিতে আমরা বন্ধু। সনিয়ার মনোভাব বুঝে সম্ভবত আরও রেগে যান তৃণমূলনেত্রী। সূত্রের খবর, সনিয়ার মুখের উপরেই তিনি বলেন, ঠিক আছে আমিও মনে রাখব!

এর আগে এ দিন সকালে সংসদ ভবন চত্বরে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে ধর্ণায় বসেছিলেন তৃণমূল সাংসদরা। তখন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীকে হাত ধরে তাঁরা নিয়ে যান সেখানে। রাহুলও তৃণমূলের ধর্ণা-স্থানে যান। কিন্তু তার পর দুপুর গড়াতে সংসদ ভবনের মধ্যে যা হল, তা রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বইকি।

বস্তুত দিল্লি রাজনীতির করিডরে সাধারণ ধারণাই হল, রাহুল গান্ধী ব্যক্তিগত ভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে পছন্দ করেন না। কারণ, বাংলার কংগ্রেস নেতারা বার বার তাঁর কাছে অভিযোগ করেন, তৃণমূল অনৈতিক ভাবে বাংলায় কংগ্রেসের বিধায়ক, সাংসদদের ভাঙিয়ে নিচ্ছে। সদ্য মালদহ উত্তরের সাংসদ মৌসম বেনজির নূরও কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। মৌসমকে সনিয়াও দল না ছাড়তে অনুরোধ করেছিলেন। তা ছাড়া অধীরবাবুরা রাহুলকে এও বহুবার জানিয়েছেন যে, মিথ্যা মামলায় বিরোধীদের জড়ানো হচ্ছে বাংলায়। তবে অনেকেই মনে করতেন, রাহুল তৃণমূলকে পছন্দ করুন বা না করুন, মমতার প্রতি সনিয়ার অন্ধ স্নেহ রয়েছে। কিন্তু তৃণমূল নেতারা বুঝতে পারছেন, অধীর চৌধুরী এ দিন লোকসভায় যা বলেছেন, তাতে সনিয়ারও সায় রয়েছে। কারণ, তিনি তখন সভায় উপস্থিত ছিলেন।

এ ঘটনার পর সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেস-তৃণমূল রসায়নে কী প্রভাব পড়বে তা সময় বলবে, তবে লোকসভা ভোটের আগে বাংলায় তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের জোটের বিশেষ সম্ভাবনা রইল না বলেই অনেকে মনে করছেন। বরং বামেদের সঙ্গে কংগ্রেসের আসন সমঝোতার সম্ভাবনাই উজ্জ্বল হচ্ছে বলে তাঁদের মত।

আরও পড়ুন-

বাংলায় যা হয় হোক, দিল্লিতে কংগ্রেস, সিপিএম আমরা একসঙ্গে লড়ব

Shares

Comments are closed.