সোমবার, আগস্ট ১৯

‘অপরাধীকে ধরতে সৌদি আবায়া পরতে হয়েছিল,’ সে দিনের ঘটনা শুনিয়েছেন কেরলের মহিলা আইপিএস মেরিন

দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্পেশাল টিম নিয়ে রিয়াধে পৌঁছেছিলেন ভোর বেলায়। ইন্টারপোল ততক্ষণে গ্রেফতার করেছে নাবালিকা ধর্ষণে অভিযুক্ত সুনীল কুমার ভদ্রনকে। কিন্তু, অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে গেলে অনেকগুলো নিয়মকানুনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। বিশেষত দেশ যেখানে সৌদি আরব, সেখানে নিয়ম শৃঙ্খলা অনেকটাই কঠোর। প্রতি পদে মেনে চলতে হয় সতর্কতা। দোষীকে ধরে আনার ঘটনা যে কোনও বলিউড ছবির থেকে কম রোমাঞ্চক নয়।

“সেখানকার পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে দেখ করতেই আমাকে বলা হয়েছিল, এই পোশাকে ঘোরাফেরা চলবে না। অপরাধীর কাছে পৌঁছতে হলে সৌদির নিয়ম মেনেই এগোতে হবে,” সে দিনের ঘটনা মিডিয়াকে জানিয়েছেন কেরলের এই সাহসিনী আইপিএস অফিসার মেরিন জোসেফ। ২৯ বছরের মেরিন বর্তমানে কেরলের কনিষ্ঠতম আইপিএস অফিসার। তাঁর সাহস ও জেদ মুগ্ধ করেছে গোটা দেশকেই। মেরিনের কথায়, “সৌদির মহিলাদের মতো আবায়া বোরখা পরেছিলাম। মাথা ঢাকা ছিল পর্দায়। এই ভাবেই সুনীলকে পাকড়াও করতে বেরিয়ে পড়ি। ” অপরাধীকে বাগে পাওয়াটাই একমাত্র লক্ষ্য ছিল। সে পোশাক যাই হোক না কেন! নিয়ম যতটাই কড়া হোক না কেন!

মেরিন জানিয়েছেন, আবায়া বোরখাতেও তাই এতটুকু অসুবিধা হয়নি তাঁর। এর পরের ধাপ আরও কঠিন। রেড কর্নার নোটিস জারি করেছিল ইন্টারপোল। তারপর গ্রেফতার করা হয়েছিল সুনীলকে। এর পরে ছিল নানা প্রশ্নোত্তরের পালা। গোটা অপরাধই অস্বীকার করেছিল সুনীল। মেরিন জানিয়েছেন, কেরল পুলিশের আন্তর্জাতিক তদন্তকারী শাখার অফিসাররা আগেই কথাবার্তা বলেছিলেন ইন্টারপোলের সঙ্গে। কিন্তু, সে দেশে গিয়ে কী ভাবে পুরো বিষয়টা তদারকি করতে হবে সেটা জানতেন না তাঁর টিমের কেউই। আইপিএসের কথায়, “দুঁদে আরব পুলিশের সঙ্গে তর্ক করাটা বোকামির কাজ। কাজেই পুরো বিষয়টা বুদ্ধি করে করতে হতো আমাকে। সবার প্রথমে আমিই এগিয়ে গিয়েছিলাম। অফিসারদের শুনিয়েছিলাম সেই ১৩ বছরের বাচ্চা মেয়েটির যন্ত্রণার কথা। আমার কথায় সম্মতি দিয়েছিলেন তাঁরা।”

টিম নিয়ে সৌদিতে মেরিন।

কোল্লামের ওই নাবালিকা ছিল দলিত পরিবারের, জানিয়েছেন মেরিন। এমন একটা পরিবারে কিশোরী মেয়েরা ধর্ষিতা বা নির্যাতনের শিকার হলে সেই দায় নেয় না পরিবার। সমাজচ্যুত ও একঘরে হওয়ার ভয়ে মেয়েটিকে খেদিয়ে দেওয়া হয় পরিবার থেকে। তিন মাস ধরে তাই যৌন লালসার শিকার হতে হতেও মুখ খুলতে ভয় পেয়েছিল মেয়েটি। মেরিন বলেছেন, “মহিলা মন্দিরমের ওই সরকারি হোমে গিয়ে প্রতিজনের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। জেনেছিলাম মেয়েটিকে যখন হাসপাতাল থেকে হোমে নিয়ে আসা হয়, তখনও শরীরের ক্ষত ভরেনি। মানসিক ভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ছিল মেয়েটি। ঠিক মতো খাবার খেতে পারত না। এই ভাবেই একদিন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।”

মেরিন জানিয়েছেন, মহিলা ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করাটাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। আর এই মেয়েটি কোথায় যেন তাঁর মনে ঝড় তুলেছিল। তাই এই মামলার নিষ্পত্তি তাঁকে করতেই হতো। সে পথ যতই দুর্গম হোক না কেন।  ্অভিযুক্ত সুনীল কুমারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে পকসো আইনে মামলা দায়ের হয়েছে।

দিল্লির বাসিন্দা মেরিন। সেন্ট স্টিফেন কলেজে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা। স্নাতকোত্তরও ইতিহাসেই। এর পরে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় একবারেই আইপিএসের র‍্যাঙ্ক। এরনাকুলাম থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু হয় জার্নি। মেরিনের বাবা রাজ্য কৃষি মন্ত্রকের উপদেষ্টা, মা অর্থনীতির শিক্ষিকা। ডঃ ক্রিস আব্রাহামের সঙ্গে বিয়ের পরে এখন কোচির সরকারি গেস্ট হাউসেই সংসার পেতেছেন মেরিন। বলেছেন, “ঘোরদৌড় থেকে অস্ত্রচালনা সব কিছুই আয়ত্তে রাখি। এই অসহায় মেয়েদের জন্যই কাজ করতে চাই আমি। অপরাধকে কোনও ভাবেই ক্ষমা করা যায় না। সে অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন আর যত দূরেই পালিয়ে যাক না কেন। আমার হাত থেকে নিস্তার নেই।”

আরও পড়ুন:

আত্মহত্যা করেছিল ধর্ষিতা নাবালিকা, অভিযুক্তকে সৌদি থেকে ধরে আনলেন কেরলের মহিলা আইপিএস মেরিন

Comments are closed.