মঙ্গলবার, জুন ২৫

‘ইংরাজিতেই কথা বলবো, কেন নয়?’ দিনমজুরের মুখে সপ্রতিভ ইংরাজি শুনে হতবাক সাংবাদিক, ভাইরাল হলো ভিডিও

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  ‘নেভার জাজ এ বুক বাই ইট’স কভার’, অর্থাৎ শুধু বাইরেটা দেখেই কোনও কিছুর মূল্যায়ন করা উচিত নয়। জোর দিয়ে এই ইংরাজি প্রবাদ বাক্যটা আমরা বলে থাকি বটে, তবে এর সত্যতা যে এ ভাবে সামনে আসবে সেটা বোধহয় ঘুণাক্ষরেও টের পাননি সাংবাদিক। বুম হাতে তাঁর চোখে তখন অবাক, ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি। মনের অবস্থা হয়ত আপাত নিরীহ ঝিনুকের ভিতরে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া মুক্তোর মতো, স্তম্ভিত। কারণ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ঝরঝরে ইংরাজিতে যিনি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর পরনে হাল ফ্যাশনে স্যুট-বুট নেই, দেখনদারিতে চমকও নেই। তিনি অত্যন্ত সাধারণ, ছাপোষা একজন দিনমজুর।

পরনে চেক শার্ট, মাথায় কাপড়ের ফেট্টি, হাতে ধরা শক্তপোক্ত মোটা খুঁটিতে ভর দিয়ে এক গাল কাঁচা-পাকা দাড়ির প্রৌঢ়ের মুখে তখন ইংরাজির খই ফুটছে। বুম হাতে কেতাদুরস্ত পোশাকের তরুণ সাংবাদিক প্রথমটায় একটু ঘাবড়ে গেলেও পরে দ্বিগুণ উৎসাহে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন ‘ইংরাজি-বাবু’কে। হিন্দি-ইংরাজির মিশেলে দিব্যি ফটাফট উত্তরও দিয়ে যাচ্ছেন প্রৌঢ়।

হিন্দি মিডিয়া ‘দ্য লাল্লানটপ’-এর হয়ে বিহারের নানা এলাকায় ভোটের কভারে বেরিয়েছিলেন তরুণ সাংবাদিক সৌরভ ত্রিপাঠী। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, উনিশের ভোট ঘিরে কার প্রতিক্রিয়া কেমন তার সবটাই অনলাইনে দেখাবেন তিনি। প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে গরিব, খেটে খাওয়া মানুষদের সামনেও ধরলেন বুম। উত্তর জানতে জানতে বুম এসে থামল এই প্রৌঢ়ের সামনে। প্রশ্নের আগেই ঝটিতি উত্তর, ‘আই ওয়ান্ট টু ওয়ার্ক।’ ভুরু তুলে, অবাক ত্রিপাঠির মুখে তখন একটাই প্রশ্ন,’ইংরাজি?’ প্রৌঢ়ের পাল্টা,  ‘হোয়াই নট?’

উত্তর নয়, যেন সপাটে এক চাবুক। তাতে সামান্য তাচ্ছিল্যের শ্লেষ, যেন বোঝাতে চাইলেন, ইংরাজি কি শুধু শহুরে চাকচিক্যেরই একচেটিয়া অধিকার! আন্তর্জাতিক ভাষার উপর দখল রাখার অধিকার সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণি বিশেষের নয়, চেহারা আর পোশাকআশাকের মাপকাঠিতে তার বিচার কখনওই ঠিক নয়।

শ্লেষটা মনে হয় বুঝলেন সাংবাদিক, তাঁর মুখেও এ বার গর্বের হাসি। স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, ‘গজব ইংরাজি বোল রাহে হ্যায় ভাইসাব তো!’ সাংবাদিক আর প্রৌঢ়কে ঘিরে তখন ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেছে। সকলেই প্রশ্নোত্তর পালা শোনার জন্য উৎসাহী। শুরু হলো কথোপকথন। কখনও ইংরাজি, কখনও হিন্দি। থামতে রাজি নন প্রৌঢ়। জানালেন, ইন্দিরা গান্ধীর আমলে তিনি ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। তবে তখন চাকরি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি, তাই এই দিনমজুরি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে চাকরি পেলে মন্দ হয় না। নরেন্দ্র মোদী তাঁর কাছে সেরা, তবে কর্মসংস্থানের ঘাটতি নিয়ে অভিযোগ করতেও ভোলেননি প্রৌঢ়। তাঁর সাহসী জবাব, “সাম্প্রতিক সময় মোদী সরকার সবচেয়ে ভালো। তবে কর্মসংস্থান তেমন ভাবে হয়নি। সরকার যদি চাকরির ব্যবস্থা করেন তাহলে তাঁর মতো দিনমজুরদের বরাত খুলে যায়।” তবে ইংরাজি শুনিয়ে চাকরি পাওয়ার আশা রাখছেন না সেটাও বেশ জোরের সঙ্গেই বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, “আমি খেটে খেতে চাই। পরিশ্রম করেই দু’বেলা পেট ভরাতে চাই।”

এখন কথা হচ্ছে, ইংরাজি তো অনেকেই বলতে পারে, তাহলে চমকটা কোথায়। প্রথম চমক হচ্ছে এই ঘটনা বিহারের। সেখানকার প্রত্যন্ত এলাকার এক দিনমজুর দেহাতি ভাষার বদলে ঝরঝরে ইংরাজি এবং কখনও সুস্পষ্ট হিন্দিতে কথাবার্তা চালাচ্ছেন, সেটাই হয়তো শহুরে মানুষদের কাছে একটা আশ্চর্যের বিষয়। তাই এই ভিডিও ভাইরাল হতে বেশি দেরি হয়নি। ইতিমধ্যেই ভিডিওটি দেখে ফেলেছেন ২০ লক্ষ মানুষ, কমেন্ট পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। শেয়ার তো বলাই বাহুল্য।

ভালো করে বিবেচনা করলে হয়তো দেখা যাবে, এই ভিডিও নিছকই একটা ভাইরাল ভিডিও নয়। প্রৌঢ়ও নিজের কেরামতি দেখানোর জন্য ইংরাজির বুলি আওড়াননি। শিক্ষিত হয়েও দারিদ্রের সঙ্গে নিত্যদিনের এই লড়াইটা বড় বাস্তব হয়ে উঠেছে প্রৌঢ়ের প্রতিটা কথায়। সরকারের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ নেই, শুধু বোঝাতে চেয়েছেন ডিজিটাল ভারতে এখনও খাবারের জন্য হাহাকার করতে হয় মানুষকে। পেটে বিদ্যে থাকা সত্ত্বেও।

Comments are closed.