বুধবার, জুন ১৯

‘অনাথ, অভুক্ত মরতে দেওয়া যাবে না একজনকেও,’ ফি দিন হাজার মানুষকে খাইয়ে বিশ্ব রেকর্ড হায়দরাবাদের যুবকের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাথার উপর অভিভাবকের ছায়া নেই তো কি হয়েছে, ‘সার্ভ নিডি’ (Serve Needy) তো রয়েছে!  ঠিক মায়ের আদরেই আগলে রাখবে এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। অভুক্ত, অনাদরে রাস্তায় পড়ে থাকা বৃদ্ধা থেকে দু’বছরের শিশু— হায়দরাবাদের গৌতম কুমারের নজর এড়িয়ে যেতে পারে না কেউই। কোলে তুলে নিজের সংস্থা ‘সার্ভ নিডি’-র অন্দরে তাদের ঠাঁই দেন যুবক। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই এনজিও এখন দেশের গর্ব। ফি দিন প্রায় হাজারেরও বেশি মানুষকে খাইয়ে সম্প্রতি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম তুলে ফেলেছেন গৌতম।

‘‘একজনকেও অনাহারে মরতে দেওয়া যাবে না,’’ এটাই ‘সার্ভ নিডি’-র মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন গৌতম। মনের টানেই তাঁর সংস্থায় কাজ করতে আসেন তরুণ-তরুণী, যুবক থেকে মধ্যবয়স্করাও। গোটা হায়দরাবাদের আনাচ কানাচ ঘুরে রাস্তা থেকে অভাবী মানুষদের সংস্থার অন্দরে ঠাঁই দেওয়াটাই তাঁদের কাজ। ফুটপাথের ঘর ছেড়ে যাঁরা আসতে চান না, তাঁদের জন্য রয়েছে দু’বেলা পেট ভরা খাবার। শিশুদের জন্য পড়াশোনার বিশেষ ব্যবস্থা।

দু’চোখে স্বপ্ন নিয়ে মানুষের সেবার ব্রত নিয়েছিলেন কিশোর বয়স থেকেই. জানিয়েছেন গৌতম। রাস্তায় ধুলোয় গড়াগড়ি দেওয়া শিশুদের দেখে চোখ ভিজে যেত তাঁর। মনের কোথাও একটা টান অনুভব করতেন সবসময়। ঠিক করেছিলেন পড়াশোনা শেষ করে মোটা মাইনের চাকরি নয়, বরং মানুষের সেবার কাজই হবে তাঁর পেশা এবং নেশাও।

সংস্থা তৈরির আগে জনা কয়েক বন্ধুকে নিয়ে অভাবী মানুষের হাতে খাবার তুলে দিতে শুরু করেন গৌতম। রাস্তায় পাত পেড়ে বসে অভুক্তদের পেট ভরে খেতে দেখে স্বর্গীয় আনন্দ হতো তাঁর। ২০১৪ সালে শুরু হয় ‘সার্ভ নিডি’। গৌতমের কথায়, প্রথম প্রথম অনাথ শিশুদের তুলে আনা হতো এই সংস্থায়। ধীরে ধীরে ঠাঁই পেতে থাকেন সর্বহারা বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। হালে এই সংস্থায় নয় নয় করেও ১৪০ জন অভাবী মানুষের আশ্রয়। দিন দিন সেটা বাড়ছে।

‘সার্ভ নিডি’-র উদ্যোগে হাজার খানেক মানুষের পাত পড়ে প্রায় প্রতিদিনই, জানিয়েছেন গৌতম। তাঁর কথায়, ‘‘গত রবিবার তিন জায়গায় পালা করে হাজারের বেশি মানুষকে নিজের হাতে খাইয়েছিলাম আমি। সেই জন্যই এই বিশ্ব রেকর্ড।’’ শুরুটা হয়েছিল গান্ধী হাসপাতাল দিয়ে। দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা করাতে অনেক দুঃস্থ মানুষই আসেন এই হাসপাতালে। তাঁদের জন্য খাবারের আয়োজন করেছিল ‘সার্ভ নিডি’। এর পরের গন্তব্য ছিল রাজেন্দ্র নগর, শেষে চৌতুপালের আম্মা নান্না অনাথ আশ্রম। গৌতম জানিয়েছেন, শিশু থেকে বয়স্ক ব্যক্তি, প্রত্যেককেই নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দিয়েছিলেন তিনি।  এই অভিনব উদ্যোগের কারণেই বিশ্ব রেকর্ডের পুরস্কার তাঁর হাতে তুলে দেন ইউনিভার্সাল বুক অব রেকর্ডস-এর ভারতীয় প্রতিনিধি কে ভি রামানা রাও এবং তেলঙ্গানা সরকারের প্রতিনিধি টি এম শ্রীলতা।

রুটি, চাপাটি, ডাল-ভাত-তরকারির পাশাপাশি মরসুমি ফলও থাকে থালাতে, গৌতম বলেছেন, শিশুদের জন্য বিশেষ করে নানা রকম ফল রাখা হয়। তা ছাড়া সামর্থ্য মতো মিষ্টিও দেওয়া হয় পাতে। কোনও রকম সরকারি সাহায্য ছাড়াই নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচা করেই চলে এই সংস্থা। কেউ অনুদান দিলে সেই টাকাও জমা রাখা হয় ফান্ডে।

‘‘সবচেয়ে বেশি দুঃখ হয় যখন দেখি বৃদ্ধ বাবা-মাকে রাস্তায় অভুক্ত ফেলে চলে গেছে ছেলেমেয়ে,’’ গৌতমের চোখে জল। নিজের জীবনের অত্যন্ত তিক্ত একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন ‘সার্ভ নিডি’-র ফেসবুক পেজে। বলেছেন, ‘‘হায়াত নগরের বাসিন্দা এক বৃদ্ধকে তাঁর ছেলে ফেলে গিয়েছিলেন রাস্তায়। আমরা উদ্ধার করার আগেই ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যু হয় তাঁর। আমিই শেষকৃত্য করেছিলাম। গর্বিত একজন ছেলের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলাম সে দিন।’’

Dear Friends, This is our 1106th Anna Daatha event and We would like to THANK and SALUTE Mr. RAGHU for being a Anna…

Serve Needy এতে পোস্ট করেছেন সোমবার, 20 মে, 2019

শুধু খাবার খাওয়ানো, পোশাক বিলি বা আশ্রয় দেওয়া নয়, এলাকার ছোটখাটো স্কুলগুলিতে বাচ্চাদের পড়াশোনার জিনিস সরবরাহ করে এই সংস্থা। রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা অবাঞ্চিত দেহের সৎকার করার দায়িত্বও তাদের। তবে সরকারের সাহায্য থেকে এখনও বঞ্চিত ‘সার্ভ নিডি’। গৌতম জানিয়েছেন, তাঁর নিজের জন্য নয়, বরং বিশ্ব রেকর্ডের তকমা সংস্থার প্রসারে সাহায্য করবে। হায়দরাবাদের আরও নানা জায়গায় ‘সার্ভ নিডি’-র শিকড় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। রাস্তাতেই যাঁদের জীবন, তাঁদের মধ্যে বাঁচার আলো ছড়িয়ে দেওয়াই গৌতমের একমাত্র উদ্দেশ্য।

ছবি: সার্ভ নিডি-র ফেসবুক পেজের সৌজন্যে।

Comments are closed.