উনিশে কি দিল্লিতে দিদি?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অর্ক ভট্টাচার্য

    একুশের ঘোষণার কথা মনে পড়ে!

    প্রায় ৬ মাস আগে, তৃণমূলের শহিদ সমাবেশের মঞ্চ থেকেই উত্তরের দিকে হাত দেখিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পর দিদি যে ভাবে বলেন,- জেনে রাখুন, উনিশে দেশকে পথ দেখাব আমরাই। ১৯ জানুয়ারি ব্রিগেডে সভা হবে। মোদী সরকারের মৃত্যু ঘন্টা বাজাবো ওদিন।

    আঠারোর ইতি। উনিশ এসে গেল। বাংলার রাজনীতির ব্রিগেডে প্রশ্নও ঘুরপাক করতে শুরু করে দিল,-সত্যিই কি এ বার দিল্লি যাচ্ছেন দিদি?

    পণ্ডিতরা বলেন, রাজনীতি হল হাতির দাঁতের মতো। খাওয়ার জন্য এক রকম। লোককে দেখানোর জন্য অন্য। সুতরাং দিদি কোনটা দেখাতে চেয়েছেন দিদিই জানেন। তবে অতি সহজ করে দেখলে ধরে নেওয়া যায়, মুখ্যমন্ত্রী পদে সাত বছর তো হল, এ বার প্রধানমন্ত্রী হতে চান মমতা।

    রাজনীতিতে উচ্চাকাঙ্খা স্বাভাবিক ব্যাপার। আজ যিনি মুখ্যমন্ত্রী, কাল তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ্রহ থাকতেই পারে। নরেন্দ্র মোদীরও তাই হয়েছিল। ফলে পর পর দু’বার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর দিদির যদি তেমন উচ্চাকাঙ্খা তৈরি হয়, তা অন্যায়ের নয়!

    বড় কথা হল, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এই মুহূর্তে যে রথী মহারথীরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ওজনে এবং অভিজ্ঞতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমতুল্য নেতা বা নেত্রী খুবই বিরল। সাত বারের সাংসদ, নরসিংহ রাও জমানায় ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, পরে বাজপেয়ী জমানায় প্রথমে রেল ও পরে কয়লা মন্ত্রী। তার পর মনমোহন জমানায় ফের রেলমন্ত্রী। বাস্তব হল, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে নরেন্দ্র মোদীরও এত দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল না।

    তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠতে পারে, মোদী বা বিজেপি-র যে সংখ্যার তাকৎ ছিল, দিদি-র তা হবে কোত্থেকে! বাংলায় সব আসন জিতলেও ঝুলিতে থাকবে সাকুল্যে ৪২টি আসন। তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়া যাবে?

    হয়তো না। কিন্তু হওয়া যে একেবারেই যাবে না সেটাই বা কে বলতে পারে? বিশেষ করে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ক্রমশ এই ধারণাই যখন মজবুত হচ্ছে যে উনিশের ভোটে ত্রিশঙ্কু হবে। বিজেপি একক সংখ্যা গরিষ্ঠ দল হিসাবে তো নির্বাচিত হবেই না, উপরি দু’শ পার করবে কিনা তা নিয়েও সংশয়ে রয়েছেন অনেকেই।

    দিদি ঘনিষ্ঠরা আশা করছেন, সে ক্ষেত্রে দুটি রাস্তা খুলে যেতে পারে তৃণমূলের সামনে। তাঁদের মতে, বাংলায় তৃণমূল যদি চোদ্দর নির্বাচনের মতই ৩৪টি আসনও জিততে পারে, তা হলে এখনই বলা যায় উনিশের ভোটের পর তৃণমূলই হবে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি। কংগ্রেস ও বিজেপি-র পর সব থেকে বেশি আসন থাকবে তৃণমূলের ঝুলিতে। কে বলতে পারে কংগ্রেসের সমর্থনে তখন দিদি-র প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার স্বপ্নপূরণ হবে না! কেন না এ ব্যাপারে তৃণমূল কেন, চব্বিশ নম্বর আকবর রোডের নেতারাও নিশ্চিত যে, উনিশের নির্বাচনে কংগ্রেস দেড়শ-র কম আসন পেলে রাহুল গান্ধী জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবেন না। কারণ, দুর্বল কংগ্রেসের নেতৃত্ব তখন অনেকেই মানতে চাইবেন না। তাই রাহুলও হয়তো চাইবেন, বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে থাকতে।

    কিন্তু কংগ্রেস যদি দেড়শ-র বেশি আসন পায়? তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, তখন রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হলেও তৃণমূল হবে সব থেকে বড় শরিক দল তথা অন্যতম চালিকা শক্তি। যার সুযোগ নিয়ে বাংলায় আরও উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারবেন মমতা। ঠিক যেমন দ্বিতীয় ইউপিএ জমানায় হয়েছিল। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকলেও, দিদি-র কথাতেই তখন গতিপথ প্রভাবিত হবে দিল্লির।

    কেউ বলতেই পারেন, এ সবই আষাঢ়ে গল্প। গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল। এখন থেকে এ সব ভেবে লাভ কী? এমনকী এ ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে সোশাল মিডিয়ায় টিপ্পনিও কাটতে শুরু করে দিয়েছেন, বাম-বিজেপি বা কংগ্রেস শিবিরের অনেকেই।

    অবশ্য সোশাল মিডিয়ায় এখন কী না হয়। টিপ্পনি কাটা তো কম কথা। তবে এঁদের অনেকেই হয়তো দিদিকে চেনেন না।

    বস্তুত লোকসভা ভোটের সময় বাংলায় একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে যে লোকসভা ভোটে কেন ভোট দেব আঞ্চলিক দলকে? দিল্লিতে ওদের ভূমিকা কী? ৯৯ সালে বিজেপি-র সঙ্গে বা ২০০৯ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে থাকার কারণে অবশ্য সে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়নি তৃণমূলকে। আবার ২০১৪ সালে রাজ্য স্তরে বিরোধী সব কটি দলেরই ছিল ভঙ্গুর দশা। তা সে সিপিএম হোক বা কংগ্রেস। বিজেপি-র ভোট বাড়লেও সংগঠন বলে কোনও বস্তু ছিল না। ফলে তৃণমূলকে দিল্লিতে কেউ বিকল্প হিসাবে না দেখলেও, চতুর্মুখ লড়াইয়ের সুবিধা পেয়েছিল।

    কিন্তু এ বার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিরোধী পরিসরে বিজেপি এখন আগের থেকে অনেক শক্তিশালী। এবং ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, কৃষ্ণনগর, রাণাঘাট, বনগাঁ, বসিরহাট, দমদম, ব্যারাকপুর, মেদিনীপুর সহ দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু আসনে তারা বেগ দিতে পারে বলে তৃণমূলের নেতারাই স্বীকার করছেন। আবার অন্যদিকে সিপিএমের সঙ্গে জোট করার জন্য তাল ঠুকছে কংগ্রেস। উত্তরবঙ্গের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় জোট করে তৃণমূলকে হারানোর কৌশল নিচ্ছেন সোমেন মিত্র-আবদুল মান্নানরা। ফলে দিদিরও এটা দেখানো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে যে দিল্লি দখলে নেমেছেন তিনিও। গুলাম নবি আজাদ, চন্দ্রবাবু নায়ডু, চন্দ্রশেখর রাও, অখিলেশ যাদব, ফারুক আবদুল্লাহ, অরবিন্দ কেজরীবালরা উঠতে বসতে যোগাযোগ রাখছেন তাঁর সঙ্গে। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী পদে সম্ভাব্যদের নিয়ে আলোচনায় রয়েছে তাঁর নামও। সন্দেহ নেই, এ কথা বলে বাংলা ও বাঙালির আবেগকে ভোট বাক্সে পুরে ফেলার একটা চেষ্টাও রয়েছে। এবং তাতে কাজ হলে অর্থাৎ আগের বারের মতই ৩৪ টি আসনে কিংবা তার বেশি আসনে জিততে পারলে উপরের অঙ্কগুলোর সম্ভাবনা থাকছেই। কে বলতে পারে, তখন সত্যি সত্যিই দিল্লি চলে যাবেন না দিদি! অথবা কলকাতায় থেকেও দিল্লির রাশ থাকবে দিদির হাতে!

    (লেখকের মতামত ব্যক্তিগত )

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More