সোমবার, জানুয়ারি ২৭
TheWall
TheWall

৪২-এর মায়ের ২৪টি সন্তান, তিনি রক্তশূন্য হবেন না তো কে হবেন?

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফহিমের বয়স এখন ৪২ বছর। চামড়া কুঁচকে গেছে, চোখের নীচে পুরু কালি। শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ওজন মাত্র ৩৬ কিলোগ্রাম। ২০ বছরের বিবাহিত জীবনে ১১টি সন্তান। শেষেরটি জন্মেছে বছর দুই আগে। তাকে কোলে টেনে নিয়ে বললেন, ‘‘আরও তিনটি সন্তানের কথা ভেবেছি। সবই আল্লার দান!’’

ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছেন আর একটিও সন্তান হলে মৃত্যু হবে ফহিমের। কারণ তাঁর শরীরে রক্ত বলতে আর কিছুই বাকি নেই। অনাহার, অপুষ্টিতে ভোগা রুগ্ন শরীরটা পুরো ছিবড়ে হয়ে গেছে।

জামশিদার বয়স ৪৭ বছর। ১৩টি ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে শবনম ২০ বছরেই চার সন্তানের মা। মা-মেয়ে দু’জনেরই এখনও সন্তানের পরিকল্পনা রয়েছে। দু’জনেই ভুগছে রক্তাল্পতায়।

ফহিম, জামশিদা বা শবনম নয়, বর্তমান ভারতের বেশিরভাগ গ্রাম, আধা-শহরের বাস্তব চিত্রটা এখনও এমনই। জন্ম নিয়ন্ত্রণের বার্তাটা সেখানে শুধু সরকারি খাতায় নথিবদ্ধ একটা ধারণা মাত্র। অনাহার, অপুষ্টি, জলাভাব যেখানে নিত্য সঙ্গী, সেখানে অধিক সন্তান প্রসব যে শুধু মাত্র স্বাস্থ্যহানি নয় মৃত্যুরও কারণ সেটা এখনও বিশ্বাস করতে চান না এই সব এলাকার মানুষজন। হরিয়ানার তেমনই একটি জেলা নুহ্। ফহিম, জামশিদা বা শবনম এখানকারই বাসিন্দা। গুরুগ্রাম থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে এই জেলার প্রতিটি গ্রামে ঘরে ঘরে কম করে হলেও দশের বেশি সন্তান। সকলেই রক্তাল্পতার শিকার। প্রায় প্রতি বছরই রক্তাল্পতার কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হয় নুহ্-তে।

ছেলে কোলে ফহিম

হরিয়ানার এই জেলার আগের নাম ছিল মেওয়াত। ২০১৬ সালে নাম বদলে রাখা হয় নুহ্। এর অধীনে তাওরু, নাগিনা, ফিরোজপুর, ঝিরকা, ইন্দ্রি, পুনহা-সহ পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ব্লকে মহিলা ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা প্রশাসনের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের অধীনে একটি সমীক্ষা চালানো হয় হরিয়ানার বিভিন্ন গ্রামগুলিতে। দেখা যায়, নুহ্-তে জন্মহার যেমন বেশি, তেমনি রক্তাল্পতার কারণে মহিলা ও শিশু মৃত্যুর হারও অধিক। সরকারি আধিকারিকদের প্রচেষ্টায় এখানে জন্ম নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা বোঝানোর সব রকম প্রয়াস ব্যর্থ হয়। কারণ এলাকাবাসীর ধারণা সন্তান ঈশ্বরের আশীর্বাদ, সন্তান প্রসবের সঙ্গে রক্তাল্পতা বা মৃত্যুর কোনও সংযোগই থাকতে পারে না।

চাষাবাদ ও দিনমজুরি করে সংসার চালান ফহিমের স্বামী হাকুমুদ্দিন। ছোট্ট দু’টি ঘরে টিনের চালা। গাদাগাদি করে ১১টি ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাস তাঁদের। হাকুমুদ্দিনের কথায়, ‘‘আল্লাহ আমাদের এই ছেলেমেয়ে দিয়েছেন। ডাক্তাররা বারণ করলেও আগামী দিনে আরও তিনটি সন্তানের আশা রেখেছি আমরা। ফহিমের রক্তাল্পতার কারণ ওর স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীনতা। নিজের খাবার ছেলেমেয়েদের খাইয়ে দেয়, আর কোনও কারণ নেই।’’

জামশিদার পরিবার

ফহিমদের দু’টো বাড়ি পরেই জামশিদাদের পাকা ঘর। বাড়ির ভিতরে বড় দালানও রয়েছে। ফহিমদের থেকে কিছুটা অবস্থা ভালো জামশিদাদের। ১৩টি ছেলেমেয়ের পরেও সন্তান প্রসবের ইচ্ছা রয়েছে জামশিদার। ছ’বছর আগে তাঁর রক্তাল্পতা ধরা পড়ে। তাঁর পরিবারের অনেক সদস্যই এই রোগের শিকার। জামশিদার বড় মেয়ে শবনমের বিয়ে হয় ১৩ বছর বয়সে। সরকারের জন্ম নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচিকে হেলায় উড়িয়ে চার সন্তানের মা শবনম বলেছেন, ‘‘আমার মায়ের কী হয়েছে, কিছুই তো হয়নি। এটা এখানকার সব মহিলাদেরই হয়। কারণ অভাব আর অতিরিক্ত পরিশ্রম। আমরা ভোর সাড়ে চারটায় কাজে বার হই। বাইরের কাজ সেরে সংসার আর ছেলেমেয়ে সামলে বিশ্রামের সময় পাই মাঝ রাতে।’’

নিত্যদিন জল আনতে ৫ কিলোমিটার হাঁটতে হয় মহিলাদের।

নুহ্ জেলা হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের ডঃ অমিতার কথায়, দিনে অন্তত ১৫ জন মহিলা আসেন রক্তাল্পতায় ভুগে। প্রসবজনিত সমস্যার উদাহরণ ভূরি ভূরি। তাঁর কথায়, ঠিক মতো খাবার নেই, জল নেই, অথচ ফি বছর সন্তানের জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন এখানকার মহিলারা। প্রায় প্রত্যেকেরই বাল্য বিবাহ হয় এবং কিশোরী বয়সেই সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য বেশিরভাগ শিশুই নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগে। প্রিম্যচিওর ডেলিভারি এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। একই মত স্থানীয় চিকিৎসক ডঃ গোবিন্দ সারানেরও। বলেছেন, ‘‘ফহিম, জামশিদার মতো এখানে ঘরে ঘরে রক্তাল্পতা। আয়রনের পাশাপাশি ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতেও ভোগেন মহিলারা। জলের সমস্যার কারণে দিনে অন্তত ১৫ বার মহিলাদের গ্রামের বাইরে থেকে জল টেনে আনতে হয়। যেটাও মারাত্মক ক্ষতি করে শরীরের।’’

হরিয়ানার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের রিপোর্ট বলছে, প্রতি বছর রাজ্যে ১৫৩ জন মহিলা ও ৪৭টি শিশুর মৃত্যু হয় অপুষ্টি ও রক্তাল্পতার কারণে। অন্তত ৮০ শতাংশ মহিলার শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। ৩০ শতাংশের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অনেক মহিলাই গর্ভবতী অবস্থায় সঠিক চিকিৎসা এবং পরিচর্যা পাননি। ফলে, সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে শিশু বা মায়ের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সন্তান জন্মের পরে তার ঠিকমতো টিকাকরণও হয়নি। ১৯ মে হরিয়ানার নুহ্ জেলায় ভোট। তার প্রচারও চলছে জোরকদমে। নির্বাচনী উত্তাপে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও মহিলা-শিশুদের স্বাস্থ্যবিধির প্রয়াসটা এখন ধামাচাপা পড়ে গেছে।

ইউনিসেফের রিপোর্ট বলছে, ২০১৯ সালের প্রথম দিনে ভারতে ৬৯ হাজার ৯৪৪ জন নবজাতকের জন্ম হয়েছে। শিশু জন্মের হারে ১৩০ কোটির ভারত বছরের প্রথম দিনটিতে চিনকেও টপকে যায়। চিনের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যাটা ছিল ৪৪ হাজার ৯৪০। গোটা দুনিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রে ভারতের অবস্থান কী দাঁড়াবে, সেই বিষয়ে ২০০৮ সালে ‘দ্য ইকনমিস্ট’ একটি তালিকা প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি-র নিরিখে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারত আমেরিকার সমান হবে। ২০২৫ সালের পর চিনের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার খুবই কমে আসবে এবং সেই জায়গাটা পাকাপাকি ভাবে দখল করে নেবে ভারত।

অথচ একটা সময়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনায় ভারতই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। রঘুনাথ দন্ড কার্ভে ‘সমাজ স্বাস্থ্য’ নামে মারাঠি ভাষার একটি ম্যাগাজিন চালু করেন ১৯২৭ সালে। ১৯৫৩ সাল অবধি রমরমিয়ে চলে এই ম্যাগাজিন। রঘুনাথ সেখানে জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য মহিলারদের গর্ভনিরোধক ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন। অবাঞ্ছিত গর্ভাবস্থা এড়ানো যায় কী করে, তার নিদানও দেওয়া থাকতো সেখানে। ১৯৫২ সালে গঠিত প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ভারতই প্রথম দেশ, যা পরিবার পরিকল্পনার বিষয়টিকে ‘জাতীয় নীতি’ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের এক গবেষণায় জানা গিয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০১৬— এই আট বছরে এ দেশে কন্ডোমের ব্যবহার কমেছে ৫২ শতাংশ, পাশাপাশি বন্ধ্যত্বকরণ হ্রাস পেয়েছে ৭৩ শতাংশ। দেখা গিয়েছে বিগত আট বছরে জন্মনিয়ন্ত্রণে এ দেশের মহিলাদের পাশাপাশি পুরুষরাও দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছেন। অশিক্ষা, দারিদ্র, খাদ্যাভাব, পরিবেশ-পরিস্থিতি, অনুন্নয়ন, কুসংস্কার যার প্রতিটির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ গভীর সম্পর্কযুক্ত।

নুহ্ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে থাকেন মহম্মদ ইশাক ও তাঁর স্ত্রী। ৪২ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ২৪টি সন্তান। বেশিরভাগেরই নাম মনে নেই ইশাকের। এই গ্রামে আশা কর্মীদের সচেতনতার আওয়াজ পৌঁছয় না। কন্ডোমের ব্যবহার জানেনই না গ্রামবাসীরা। দারিদ্রসীমার নীচে থাকলেও তাঁদের নেই বিপিএল রেশন কার্ড। ভারতের মতো দেশে গণতান্ত্রিক দেশে যে জোর করে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, তা বেশ বোঝা গিয়েছে। এটাও অজানা নয় যে, শিক্ষার প্রসার হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিজে থেকেই কমে। কিন্তু, প্রক্রিয়াটি খুবই মন্থর। এই মন্থর প্রক্রিয়া কবে মানসিকতার পরিবর্তন আনে, সেটাই কোটি টাকার প্রশ্ন।

আরও পড়ুন:

অক্ষর পরিচয়ের এক আজব স্কুল অসমে, বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়েই মাইনে দেয় কচিকাঁচারা

Share.

Comments are closed.