গুলমার্গ বিষণ্ণ, বন্ধ ব্যবসা, কাশ্মীর ভাবছে শীতে খাব কী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    কাশ্মীর থেকে তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    উপত্যকায় দ্বিতীয় দিন। সকাল সকাল ডাল লেকে নৌকো বেয়ে হাউসবোট থেকে রাস্তায় উঠে আসা হল। ঠিক করে রেখেছিলাম, আজ যাব গুলমার্গ। কাশ্মীরের অন্যতম এই ট্যুরিস্ট স্পটের পরিস্থিতির খোঁজ নিতে। গোটা গুলমার্গ এলাকার মানুষই নির্ভর করে থাকেন গুলমার্গে বেড়াতে আসা পর্যটকদের উপরে। হাতে বোনা সোয়েটার নিয়ে পসরা সাজান বহু মানুষ। আছে খাওয়ার দোকান, চায়ের দোকান। আছেন বেশ কয়েকজন ঘোড়াওয়ালা, যাঁরা পর্যটকদের ঘোরান গুলমার্গ জুড়ে। মোটা চাকার ছোট ছোট গাড়ি চলে, পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্য।

    কেমন আছে তারা?

    সকালে রওনা দিতে অবশ্য খানিক দেরি হল। কারণ নির্দিষ্ট সেই মিডিয়া সেন্টারে এসে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে, ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্টোরি ফাইল করার তাড়া ছিল। সেই যুদ্ধপর্ব শেষ করে যাত্রা শুরু।

    রওনা দেওয়ার পরে মনটা বেশ ভাল লাগছিল। কারণ কালকের তুলনায় আজকের শ্রীনগর অনেকটাই চনমনে। বেশ কিছু দোকান খুলেছে রাস্তার ধারে ঠেলাগাড়ির উপরে, যানবাহনের সংখ্যাও অনেক বেশি। মানুষজনের গতি দেখলে বোঝা যায়, কর্মব্যস্ততায় ফিরছেন সকলে। যদিও বড় দোকানগুলি এখনও বন্ধই, এবং যেসব গাড়ি চলছে, তার বেশিরভাগই প্রাইভেট কার। পর্যটকদের গাড়ি বা অন্যান্য ব্যবসায়িক কাজের গাড়ি চোখেই পড়ে না।

    লালচক বাজারে চা খেতে নেমে কথা হচ্ছিল চায়ের দোকানি ইকবালের সঙ্গে। আখরোট কাঠের তৈরি ক্রিকেট ব্যাট বিক্রির দোকান রয়েছে ইকবালের। কিন্তু পর্যটকহীন সুনসান কাশ্মীরে সেই দোকান খোলেনি আড়াই মাস। ফলে বাধ্য হয়ে চায়ের দোকান শুরু করেছেন তিনি। তা-ও চলছেই না প্রায়। স্থানীয় ক’টা মানুষ আর স্থানীয় বাসিন্দার দোকানে এসে চা খাবেন! ইকবালের গলাতেও সেই একই হতাশার স্বর, “আর কত দিন এমন যোগাযোগহীন থাকব আমরা! কত দিন পেটে কিল মেরে রাখব! শীতকাল এসে গেলে তো…”

    পাহাড়ি যাপনে শীতকালের ভূমিকা অপরিসীম। শীতে তিন-চারটে মাস বাধ্য হয়ে ঘরে বন্দি থাকতে হয় তাঁদের। বরফে, ঠান্ডায় স্বাভাবিক ভাবে চলে না কাজকর্ম। তাই সেই সময়টার জন্য আগেভাগেই রসদ জমিয়ে রাখেন তাঁরা। খাবারদাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, জ্বালানি– সবই জমিয়ে রাখতে হয় পর্যাপ্ত পরিমাণে। কাশ্মীর একা নয়, সিকিম, লাদাখ, হিমাচল, অরুণাচল– সব জায়গাতেই এটাই নিয়ম। সেই শীতের রসদ জমানোর একমাত্র সময় বর্ষা পরবর্তী এই পর্যটন ঋতু। অগস্ট থেকে অক্টোবর, ভরে থাকে উপত্যকা। মানুষের রোজগার বাড়ে, ঘরে-ঘরে রসদ বাড়ে। আর কাশ্মীর ঠিক সেই সময়টা জুড়েই ফাঁকা হয়ে রয়ে গেল। অবরুদ্ধ যোগাযোগ, অবরুদ্ধ রোজগার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

    শুধু তাই নয়। এই সময়টা কাশ্মীরের আরও একটা ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মরসুম। আপেল চাষ। পৃথিবীর নানা প্রান্তে রফতানি হয় কাশ্মীরের আপেল। সেই আপেল চাষ এবং সংগ্রহের সময় এই সেপ্টেম্বর-অক্টোবরই। এখন ঘরে ঘরে আপেল পচছে চাষিদের। রফতানি বন্ধ এত দিন ধরে। যানবাহনের উপর অবরোধ ওঠার পরে কিছু পরিমাণ আপেল চালান শুরু হলেও, ইন্টারনেট ছাড়া বড় স্তরের ব্যবসা কার্যত অসম্ভব।

    গুলমার্গে পৌঁছে চোখে পড়ল, একটি পর্যটক দল এসে পৌঁছেছে, আর তাঁদের ঘিরে ধরেছেন ঘোড়াওয়ালারা। কাছে যেতেই বোঝা গেল, বাঙালি। ব্যান্ডেল, চুঁচুড়া, ভদ্রেশ্বর– এই কয়েকটি জায়গা মিলিয়ে ১৫ জন বেড়াতে এসেছেন কাশ্মীরে। মাস চারেক আগে থেকে বুকিং ছিল তাঁদের। ভেবেছিলেন, এই অবরোধে-অশান্তিতে আসা হবে না। শেষমেশ ১০ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা উঠতেই চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তবে মোট ৪৬ জনের দল থেকে এসেছেন ১৫ জন মাত্র।

    আরও পড়ুন: রাষ্ট্র শব্দের অর্থ খুঁজছে যোগাযোগ হারানো কাশ্মীর

    সাহস করে এসে পড়ার পর অবশ্য তাঁদের ধারণা বদলে গেছে। বারবার করে জানালেন, স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা পেয়ে, নিরাপত্তা পেয়ে তাঁরা অভিভূত। রাস্তাঘাটে এত সেনা দেখেও নিরাপদ বোধ করছেন যে কোথাও কোনও সমস্যা হবে না হয়তো। স্বীকার করছেন, না এলে হয়তো পস্তাতেন। সেইসঙ্গে বলছেন, “খুব খারাপ লাগছে সাধারণ মানুষের এই অবস্থা দেখে। আমরা চাই, আরও বেশি করে আসুন পর্যটকেরা। ভয়ের কিছু নেই।”

    শুনে নিন, কী বলছেন তাঁরা:

    পর্যটকদের উল্টো দিকে যাঁরা আছেন, অর্থাৎ ঘোড়াওয়ালারা, তাঁদের মধ্যে যেন হইহই পড়ে গিয়েছে! বহুদিন পরে একসঙ্গে এতজন এসেছেন গুলমার্গে। দীর্ঘদিন পরে খুলবে রোজগারের খাতা। কথা বলে জানা গেল, এই কয়েক মাসের রোজগারই বলতে গেলে সারাবছরের সঞ্চয় তাঁদের। অন্য কোনও ব্যবসা নেই। ঘোড়াটুকুই সব। উমর, জাভেদ, বিলালরা বলছিলেন, নিজেদের রোজগার নেই, ঘোড়াগুলিকেও ভাল করে খাওয়াতে পারছেন না। এ যেন আরও বেশি কষ্ট। পর্যটকদের আনাগোনা স্বাভাবিক হলে ঘোড়াগুলো আর একটু ভাল থাকবে। শুধু তাই নয়। কথা বলে জানা গেল, এখন যেটুকু রোজগার হচ্ছে, দিনে যদি একজন মাত্র পর্যটকও আসেন, তা হলেও সেই টাকাটুকু গুলমার্গের সমস্ত ঘোড়াওয়ালার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

    “বড় বড় নেতাদের রাজনৈতিক দরবারে কী হয়, কেন হয়, আমরা জানি না। আমরা শুধু এটা জানি, খেটে খাওয়া মানুষদের জীবন কোনও দিন ভাল ছিল না, কোনও দিন ভাল হবেও না। দুনিয়ায় অনেক লড়াই হয়েছে, অনেক ভাগাভাগি হয়েছে। অনেক সমানাধিকার এসেছে। কিন্তু গরিব আর ধনীর তফাত ঘোচেনি।”– বলছিলেন বৃদ্ধ ঘোড়া-মালিক বিলাল হোসেন। কাশ্মীরে এই মুহূর্তে কী অবস্থা, তা নিয়ে আলাদা করে কিছু ভাবতে চান না তিনি। তাঁর কথায়, “পৃথিবীর কোনও প্রান্তই ভাল নেই।”

    প্রতিটা মানুষ যেখানে নিজের রোজগারের জন্য চিন্তিত, যোগাযোগহীন জীবনে বিরক্ত, এই বৃদ্ধ যেন তখন তৃতীয় নয়ন দিয়ে দেখতে পাচ্ছেন, পৃথিবীর কোনও প্রান্তই ভাল নেই! গায়ে কাঁটা দেয় যেন। মনে হয়, ঘোড়াওয়ালার ছদ্মবেশে উপত্যকায় বাস করছেন কোনও এক দার্শনিক!

    বিকেলের গুলমার্গ আরও বেশি বিষণ্ণ। ঘোড়াদের নিয়ে ফিরে গেছেন ঘোড়াওয়ালারা। গাড়ি নিয়ে সারা দিন অপেক্ষা করে সেগুলি ঢেকে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। দিনভর খুলে রাখার পরে ঝাঁপ ফেলছেন সোয়েটার ব্যবসায়ী। বন্ধ হল খাবারের দোকানও। কথা বলেছিলাম সকলের সঙ্গেই। না, নতুন কথা কেউ বলতে পারেননি। কিন্তু যে কথাটা সকলেই বারবার করে বললেন, “আপনি তো রিপোর্টার। বাংলার রিপোর্টার। বাংলা থেকেই তো কত মানুষ আসেন। সকলকে বলুন না আসতে। এই তো আপনি এসেছেন। কোনও অসুবিধা হয়েছে কি? আমরা আছি তো। কারও কোনও ক্ষতি হতে দেব না। কিন্তু এভাবে আমরা কী করে বাঁচব বলুন তো! খাব কী এই শীতে!”

    উত্তর নেই। সবুজ চাদরে মোড়া গুলমার্গে শীত নেমে আসে আচমকা। মেঘ না কি অন্ধকার, কে বেশি দায়ী এই শীতের জন্য! ঠাহর করা যায় না। কেবল বোঝা যায়, ভাল নেই কাশ্মীর। ভাল থাকার আর্তিতে সারা দেশের পর্যটকদের মুখের দিকে তাকিয়ে সে।

    ফেরার সময়ে রাস্তাঘাট অসম্ভব ফাঁকা। সকালে যে চনমনে ছবি ধরা পড়েছিল আমারই চোখে, তা যেন কয়েক ঘণ্টায় বদলে গেছে। মনে হচ্ছে, অনেক রাত হয়ে গেছে। অথচ ঘড়ি বলছে সন্ধে সবে সাড়ে ছ’টা। ফেরার সময়ে ফের ঢুকলাম মিডিয়া সেন্টারে। সেখান থেকে ডাল লেকে আমার থাকার হাউসবোট মিনিট কুড়ির রাস্তা। “আপনি চলে যান,অনেক সকালে বেরিয়েছেন। আমি কাজ শেষ করে অটো ধরে চলে যাব।” আমার গাড়ির চালক অর্থাৎ কাদির ভাইকে বললাম এ কথা। কারণ আমি জানি, ইন্টারনেটের যা অবস্থা, তাতে সময় লাগবে অনেকটা। অতটা সময় ওঁর থাকার কথা নয় আমার সঙ্গে। তেমন চুক্তি হয়নি।

    কিন্তু কাদির ভাই হেসে বললেন, “অ্যায়সে ক্যায়সে আপকো ছোড় সাকতা হ্যায় আকেলে! ইয়ে হামারা ‘কাশ্মীরিয়ৎ’ নেহি হ্যায় ম্যাডাম।”

    কাশ্মীরিয়ৎ। কাশ্মীর কেমন আছে খবর নিতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছে, আসল লড়াই এই কাশ্মীরিয়তের স্বার্থেই। কাশ্মীরের ছোট ছোট সংস্কার, ঐতিহ্য, সম্ভ্রম, নিয়ম, আতিথেয়তা– সব কিছু নিয়ে গড়ে উঠেছে এই কাশ্মীরিয়ৎ। রাজনীতি, দ্বন্দ্ব, সংবিধান, যোগাযোগহীনতা, বেরোজগার জীবন– এই সব কিছুর ঊর্ধ্বে বোধহয় এই শব্দটুকু আঁকড়েই শেষ লড়াই লড়ছেন কাশ্মীরের মানুষ। এই কাশ্মীরিয়তের কথা হবে অন্য দিন।

    আরও পড়ুন:

    ডাল লেক ঢেকেছে পানায়, আলো জ্বলে না হাউসবোটে, নির্জনতায় ভাসে শুধু আজানের সুর

    পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

    http://www.thewall.in/pujomagazine2019/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%9a%e0%a7%87/

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More