বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২
TheWall
TheWall

আদিবাসী দেবতাকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে প্রভাব বাড়াচ্ছে আরএসএস

রজত রায়

গত তিন দশকে ভারত তথা বিশ্বের রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে তছনছ, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি সমাজতন্ত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে ফিরে গেছে ধনতন্ত্রের পথে। এমনকী, চিনও সব অর্থেই ধনতন্ত্রের পথে হাঁটছে। ইউরোপ ও আমেরিকার মতো ভারতেও এখন পুরনো ধাঁচের বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে জনপ্রিয়তাবাদী (Populist) রাজনীতি সামনে চলে এসেছে। তারই জয়জয়কার এখন। আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফ্রান্সের লা পেন, ইংলন্ডের জেরেমি করবিনের মতোই ভারতে নরেন্দ্র মোদী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়ালরা এখন চিরাচরিত রাজনীতির পথে না হেঁটে জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছেন।

এই রাজনীতির মূল লক্ষণগুলি কী কী? কোথায় তার শক্তি? এ সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ক্যালকাটা রিসার্চ সেন্টারের (সিআরজি) উদ্যোগে ও রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশনের আনুকূল্যে সম্প্রতি একটি কনফারেন্সে অংশ নিলেন ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশের বিশেষজ্ঞ গবেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতত্ত্ববিদরা। কলকাতার সল্ট লেকে গত শনিবার ও রবিবার এই কনফারেন্স হয়।

প্রথম দিন এলাহাবাদের জি বি পন্থ সোশ্যাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বদ্রীনারায়ণ তিওয়ারি এই জনপ্রিয়তাবাদী বা লোকায়তিক (Populist) রাজনীতির চরিত্রের সাধারণ ধারণা ব্যাখ্যা করে কী ভাবে আরএসএস তার মাধ্যমে সমাজের নিচুতলার দলিত, আদিবাসী সমাজের মানুষকে তাদের হিন্দুত্বের পতাকার তলায় জড়ো করছে, তার বিস্তারিত আলোচনা করেন। বদ্রীনারায়ণের মতে, জনপ্রিয় (Popular) ও জনপ্রিয়তাবাদী (Populist)–এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। রাজনীতিক মাত্রই জনপ্রিয় হতে চাইবে। তার জন্য নানা ছলচাতুরি কলাকৌশল অবলম্বনেও তার আপত্তি নেই। অন্যদিকে, জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি মানুষের মধ্যে কিছু পাওয়ার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। তারা মানুষের সমষ্টিগত চিন্তার মধ্যে এই আগ্রহ জন্মাতে নিরন্তর ইন্ধন জুগিয়ে চলে।

(বাঁ দিক থেকে) বদ্রীনারায়ণ তিওয়ারি, সৈয়দ বদরুল আহসান, রণবীর সমাদ্দার

এই প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কী ভাবে উত্তরভারতে নিম্নবর্ণের মানুষে ও আদিবাসীদের মধ্যে আরএসএস প্রভাব বিস্তার করছে। হিন্দিবলয়ের নিম্নবর্ণের মুশায়র সম্প্রদায়ের মধ্যে সমীক্ষা চালানোর সময় তিনি দেখেছেন, আরএসএস বেনারসের কাছের একটি মুশায়র গ্রামকে অটলনগর নামকরণ করল, তারপর সেখানে মানুষের ইচ্ছাপূরণ করতে একটি মন্দির স্থাপন করল। তারমধ্যে, মুশায়রদের কুলদেবতা `সাবরি’র সঙ্গেই শিবলিঙ্গও প্রতিষ্ঠা করল। একইভাবে আদিবাসীদের মধ্যেও ধীরে ধীরে হিন্দু দেবতাদের অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে। আরএসএস এখন আদিবাসী ও নিম্নবর্ণের মানুষদের গ্রামে গ্রামে ‘ধর্ম গ্রাম’ তৈরি করছে। সেখানে স্কুলে ধর্মশিক্ষা হচ্ছে। পাশাপাশি, হাসপাতাল ও মন্দির থাকছে।

রোজ ভোর সাড়ে ৪টের সময় মাইকে ভজনকীর্তন শুরু হয়। সরকার আর্থিকভাবে স্কুল ও হাসপাতাল চালাতে সাহায্য করছে। কারণ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সঙ্গে অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রলোভন না দেখাতে পারলে, কাজে ফল পাওয়া কঠিন।

বদ্রীনারায়ণের মতে, এ ভাবে দলিতদের ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের (যেমন, বৌদ্ধদের) দেবতাদেরও হিন্দুধর্মের মধ্যে নিয়ে আসার যে প্রক্রিয়া, সেটাই সমাজে আরএসএস–র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজ করছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, কংগ্রেসের রাজনীতির ভাষার ইতিহাস বড়জোর ১৫০ বছরের পুরনো, কিন্তু আরএসএস ৫০০০ বছরের ইতিহাস থেকে রসদ সংগ্রহ করতে পারছে। মদনমোহন মালব্য, যিনি কংগ্রেসের নেতা ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, বলেছিলেন, ভারতীয় গ্রাম তিনটি আধারের উপর দাঁড়িয়ে থাকে – কথা, বিদ্যাশালা ও মধুশালা। আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার ছিলেন মালব্যের সহপাঠী ছাত্র। তিনি এই কথার সার বুঝেছিলেন। তাই কথা, অর্থাৎ কথকতার মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে অতীতের লুপ্তগৌরবের স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আরএসএস–কে।

সম্মেলনের প্রথম দিনে অন্য বক্তা ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক ও ইতিহাস চর্চার জন্য বিশিষ্ট সৈয়দ বদরুল আহসান। তিনি মূলত বাংলাদেশে মৌলানা ভাসানির কৃষক আন্দোলনের জনপ্রিয়তাবাদী ঝোঁকের দিকটি ব্যাখ্যা করেন। ফজলুল হক থেকে মুজিবুর রহমান কী ভাবে জনপ্রিয়তাবাদী লাইনে দেশের মানুষকে সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন, তার বিবরণ দেন। পাশাপাশি, জুলফিকার আলি ভুট্টোর জনপ্রিয়তাবাদী স্লোগান “ইসলাম, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র” এবং সমসাময়িক কালেই ইন্দিরা গান্ধীর স্লোগান  “গরিবি হঠাও”– এর তুলনা করে বলেন, ভুট্টো তাঁর চিন্তার কোনও ব্যাখ্যা দেননি। এবং তা কার্যে পরিণত করারও কোনও চেষ্টা করেননি। তাঁর কথাবার্তার মতোই স্লোগানও ছিল ধোঁয়াশাপূর্ণ, অন্যদিকে, ইন্দিরার স্লোগান নিশ্চিতরূপেই জনপ্রিয়তাবাদী।

সিআরজি’র অধ্যাপক রণবীর সমাদ্দার এই জনপ্রিয়তাবাদী বা লোকায়তিক (Populist) চিন্তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, পশ্চিমী দুনিয়ার প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব ও ধারণার মাপকাঠি দিয়ে ভারতের মতো উত্তর ঔপনিবেশিক দেশগুলির লোকায়তিক রাজনীতিকে বোঝা সম্ভব কি না, তা এখনই বলা যায় না।

সম্মলনের দ্বিতীয় দিনে শিবাজীপ্রতিম বসু, মইদুল ইসলাম ও রিয়া দে তাঁদের গবেষণাপত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির বিশ্লেষণ করেন। অন্যদিকে, সুমনা দাশগুপ্ত কেজরিওয়ালের আপ দলের রাজনীতি খতিয়ে দেখেন। টাটা ইসন্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের মনীশ ঝা হিন্দুবলয়ের জাতপাতের রাজনীতির বিশ্লেষণ করেন। একই প্রতিষ্ঠানের গবেষক রাশাদউল্লা খান হিন্দুত্বকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির চাপে কী ভাবে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ বিপন্ন হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করেন। গোর্খা পরিচিতির আন্দোলনের আড়ালে কী ভাবে সেখানে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি মাথা তুলছে, সেদিকে আলোকপাত করেন কপিল তামাং। জেএনইউ’র অমিত প্রকাশ মনে করিয়ে দেন, প্রচলিত ধারার উদারপন্থী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নিজস্ব সংকটের সুযোগেই দেশজুড়ে জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি মাথা তুলতে পারছে। মহারাষ্ট্রের ক্ষেতকারী সংগঠনের কৃষক আন্দোলন ও  উত্তরপ্রদেশের মহেন্দ্র সিংহ টিকায়েতের কৃষক আন্দোলনের প্রতিতুলনা করার সঙ্গেই  বাংলাদেশের মৌলানা ভাসানির কৃষককেন্দ্রিক জনপ্রিয়তাবাদী আন্দোলনের  বৈশিষ্ট্যগুলির পার্থক্য চিহ্নিত করেন বিশ্বভারতীর ইতিহাসের অধ্যাপক অতীগ ঘোষ।

Comments are closed.