রবিবার, অক্টোবর ২০

এনআরসি তালিকায় নাম নেই, গুজব শুনেই কুয়োয় ঝাঁপ, মৃত্যু বৃদ্ধার

দ্য ওয়াল ব্যুরো : অসমে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ বা এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হয়েছে শনিবার। তার আগে থেকেই কার নাম রয়েছে, আর কার নাম বাদ গিয়েছে, তা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল অসমে। আর এই গুজবের জন্য প্রাণ হারাতে হল ৬০ বছরের সায়েরা বেগমকে।

শনিবার সকালে উত্তর অসমের সনিতপুরের বাসিন্দা সায়েরা বেগম খবর পান, এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম বাদ পড়েছে। এই খবর শুনেই কুয়োয় ঝাঁপ দেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষ কুয়ো থেকে তাঁকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডাক্তাররা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

জানা গিয়েছে, এই ঘটনার এক ঘণ্টা পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হলে সেখানে দেখা যায় সায়েরা, তাঁর স্বামী ও ছেলের নাম রয়েছে। অর্থাৎ তালিকা থেকে বাদ পড়েননি তাঁরা।

এই ঘটনার পর প্রশাসনের তরফে জানানো হয়, তাঁরা বারবার আবেদন করেছেন, কার নাম থাকবে, কার নাম বাদ যাবে, তা নিয়ে কেউ যেন গুজবে কান না দেন। কিন্তু তারপরেও এই ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছে প্রশাসন। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ অন্য জায়গায়। তাঁদের অভিযোগ, একাধিক পরিবারে এই ঘটনা ঘটেছে। কেউ তালিকায় আছেন, তো কেউ বাদ পড়েছেন। তাই হয়তো ভয় পেয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন সায়েরা।

বাসিন্দাদের অভিযোগ যে ভিত্তিহীন নয়, তার অবশ্য একাধিক উদাহরণ রয়েছে। ৪৭ বছরের চাষি মিজানুর রহমান, তাঁর ছেলে ও দুই মেয়ের এই তালিকায় নাম রয়েছে। অথচ স্ত্রী ও অন্য তিন মেয়ের নাম বাদ গিয়েছে তালিকা থেকে। দিপালী দাস, তাঁর স্বামী ও চার মেয়ের নাম এই তালিকায় রয়েছে। অথচ বড় ছেলের নাম বাদ পড়েছে তালিকা থেকে। এমনকী রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পাওয়া প্রাক্তন সেনা অফিসার মহম্মর সানাউল্লাহর নামও বাদ পড়েছে এই তালিকা থেকে। এই ধরণের ঘটনা যে সাধারণ মানুষের মনে চরম ভয় ও উদ্বেগের বাতাবরণ তৈরি করেছে, তারই খেসারত দিতে হলো সায়েরাকে, এমনই অভিযোগ স্থানীয় মানুষদের।

শনিবার সকাল থেকেই তামাম অসমবাসীর চোখ ছিল জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের (এনআরসি)-র সরকারি ওয়েবসাইটে। তালিকা প্রকাশ হতে দেখা যায়, নতুন এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ৩ কোটি ১১ লক্ষ মানুষ। বাদ পড়েছেন ১৯ লক্ষ। গত বছরের ৩০ জুলাই ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল প্রায় ৪০ লক্ষ আবেদনকারীর নাম।

প্রসঙ্গত তালিকা প্রকাশের পর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে এমন আশঙ্কা করেই কার্যত নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা রাজ্য। মোতায়েন করা হয়েছে কয়েক হাজার নিরাপত্তা বাহিনী। গুয়াহাটি-সহ সমস্ত স্পর্শকাতর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গুজবে কান না দেওয়ার জন্য অসম পুলিশ আবেদন করেছে। অসমের উত্তরপূর্ব দিকের সুরক্ষাও যথেষ্ট আঁটোসাঁটো করা হয়েছে। অসম পুলিশের তরফ থেকে টুইট করে জানানো হয়েছে, যে সব ব্যক্তিদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে না, তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার।

এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য জুড়ে তুমুল উত্তেজনা শুরু হয়েছে। বহু বাঙালি হিন্দুর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজ্য বিজেপির বেশ কিছু নেতা-মন্ত্রীও।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ অসমে অনুপ্রবেশ করেছেন। সেই নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অশান্তিও হয়েছে। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় নাগরিকপঞ্জি সংশোধন করতে বলে। এর ফলে রাজ্যের ৩ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষকে প্রমাণ করতে হচ্ছে, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে তাঁরা অথবা তাঁদের পরিবারের লোকজন ভারতীয় ছিলেন।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সূত্রে  খবর, জাতীয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত খসড়ায় নাম না থাকলেও কেউ ‘বিদেশি’ বলে গণ্য হবেন না। সে ক্ষেত্রে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে আবেদন করার সুযোগ থাকছে।  ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে ১০০ ট্রাইবুনাল চালু রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ২০০ বাড়ানো হবে এবং ধাপে ধাপে সেই সংখ্যা এক হাজারে নিয়ে যাওয়া হবে। চূড়ান্ত তালিকায় নাম না থাকলে ১২০ দিনের মধ্যে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে আবেদন করা যাবে। কেউ ট্রাইবুনালে হেরে গেলে হাইকোর্টে যেতে পারবেন। সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ থাকবে। কিন্তু দীর্ঘ এই আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন কী অবস্থায় থাকবেন তালিকা বহির্ভূতরা, সে বিষয়ে কেন্দ্রের আশ্বাস, কাউকেই ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হবে না। প্রত্যেককে সর্বোচ্চ আইনি অধিকার দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।

Comments are closed.