রবিবার, নভেম্বর ১৭

শ্রীনিকে বলে দেওয়া হল, সৌরভকেই বোর্ড প্রেসিডেন্ট করতে, ব্যস আর কোনও কথা নয়!

শঙ্খদীপ দাস

রবিবাসরীয় সন্ধেটা মহারাজের কেমন কেটেছে অনেকেই খুব কাছ থেকে দেখেছেন। অভিষেক ডালমিয়াকে সঙ্গে নিয়ে দুপুরে যখন মুম্বইয়ে নামেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক তখনও প্রত্যাশা মতোই ঘুঁটি সাজানো। ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে তাঁর অভিষেক হতে চলেছে বলেই এক প্রকার নিশ্চিত অনেকে।

অথচ আরব সাগরের পারে সন্ধে গড়াতেই রহস্যজনক ভাবে খেলা ঘুরতে থাকে। রাত সাড়ে আটটা যখন বাজে তখন হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে মহারাজের মুখও থমথমে। এমনকি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়ে দেন, তিনি বোর্ড সভাপতি হচ্ছেন না। এমনকি কমিটিতেও থাকছেন না!

রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে যেমন হয়, এর পরের কয়েক ঘণ্টার ব্যাকরুম ড্রামা যেন তার থেকেও রোমহর্ষক। ক্রিকেট মাঠ ও রাজনীতির বারান্দা তখন মিলেমিশে একাকার। বলা যেতে পারে সীমিত ওভারের খেলার পাওয়ার প্লে-র মতোই সেই মুহূর্তে শুরু হয়ে যায় পাওয়ার পলিটিক্স।

সৌরভকে প্রায় প্যাভিলিয়নে পাঠিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে প্রাক্তন বোর্ড প্রেসিডেন্ট নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসন যখন তাঁর পছন্দের মোহরা ব্রিজেশ পটেলকে শীর্ষ প্রশাসক পদে বসানোর সমস্ত ফিল্ডার সাজিয়ে ফেলেছেন, তখন রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ এক নতুন তৎপরতা শুরু হয়ে যায় দিল্লিতে।

মুম্বইয়ে ভোটের প্রচার সেরে তার কিছুক্ষণ আগেই দিল্লি পৌঁছেছেন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এই মুহূর্তে অমিতশক্তিধারী নেতাটি — কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপি সভাপতি তথা গুজরাত ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ। বোর্ড গঠন নিয়ে তাঁর ব্যক্তি স্বার্থও ভাল রকম জড়িয়ে। কারণ, বোর্ডের সচিব হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন অমিত পুত্র জয় শাহ।

জানা গিয়েছে, এর দু-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই অমিতের ফোন যায় উত্তর-পূর্বে তাঁর অন্যতম আস্থাভাজন সেনাপতি তথা অসমের মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার কাছে। উত্তর-পূর্ব থেকে বোর্ডের ভোটাভুটিতে মহার্ঘ আটটি ভোটের উপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে হিমন্তের।

বোর্ড ও বিজেপি-র শীর্ষ সূত্রে খবর, অমিত শাহ হিমন্তকে ফোনে বলেন, শ্রীনিকে বলে দাও কথা অনেক হয়েছে, আর নয়। বোর্ড সভাপতি করতে হবে সৌরভকেই। কর্তার যেমন আজ্ঞা। হিমন্ত তক্ষুণি ফোনে শ্রীনিবাসনকে জানিয়ে দেন, ব্রিজেশ পটেলকে বোর্ড সভাপতি করা যাবে না। সৌরভই প্রেসিডেন্ট হবেন। আর কোনও যদি কিন্তু নয়।

প্রসঙ্গত, শ্রীনিবাসনের জামাই গুরুনাথ মইয়াপ্পন আইপিএল টুর্নামেন্ট চলাকালীন বেটিং কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত। তার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।

জানা গিয়েছে, শ্রীনির পাশাপাশি ফোন যায় সৌরভের কাছেও। তারপর মধ্যরাতে বোর্ড সভাপতি পদের জন্য মনোনয়ন পেশ করেন মহারাজ।

প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন সৌরভকেই বোর্ড প্রেসিডেন্ট করার ব্যাপারে সমস্ত ওজন ও শক্তি ঢেলে দিলেন অমিত শাহ?

এর ব্যাখ্যা অমিত কাউকে দিয়েছেন বলে জানা যায়নি। তবে অমিতের ঘনিষ্ঠরা মনে করছেন, এর স্পষ্ট দুটি কারণ থাকতে পারে। এক, জয় শাহ বোর্ডের সচিব হওয়ায় কিছুটা সমালোচনা হতে পারে আশঙ্কা ছিলই। সেই সঙ্গে ব্রিজেশ পটেল সভাপতি হলে, নতুন বোর্ড ও তার কমিটি নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়ে যেতে পারত। তুলনায় সৌরভকে সভাপতি করলে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং গোটা আলোটাই শুষে নেবেন মহারাজ। জয় শাহর ব্যাপারে খুব বেশি আলোচনা তখন হবে না। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে বাংলার রাজনীতিতেও একটা বার্তা দেওয়া যাবে। এটুকু অন্তত বোঝানো যাবে বিজেপি বাঙালি আবেগকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনে সৌরভকে কোনও প্রশাসনিক পদের জন্যও ভাবা যেতে পারে।

বলে রাখা ভাল, বিসিসিআইয়ের ক্ষমতা দখল নিয়ে এই পাওয়ার পলিটিক্স নতুন নয়। শরদ পওয়ারকে বোর্ড সভাপতি করার সময় দশ নম্বর জনপথ তথা সনিয়া গান্ধীর বাসভবন সেই রাজনীতির এপিসেন্টার হয়ে উঠেছিল। সনিয়ার রাজনৈতিক সচিব আহমেদ পটেল তখন অধুনা হিমন্তের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই ট্র্যাডিশনই সমানে চলছে।

অমিত ঘনিষ্ঠ এক নেতার কথায়, এই রাজনীতির বাইরে মহারাজের মেজাজ, তাঁর ইমেজ, তাঁর ক্রিকেটীয় কেরিয়ারের গুডউইল সবই তাঁর অ্যাডভান্টেজ হিসাবে এ যাত্রায় অনুঘটকের কাজ করেছে। নইলে অমিত শাহেরও তো সমস্যা হতো।

পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

Comments are closed.