মঙ্গলবার, নভেম্বর ১২

আট বছরে দৃষ্টি কেড়ে নেয় গ্লকোমা, তারপরেও সফল আইনজীবী, দৃষ্টিহীনদের জন্য বানিয়েছেন সফটওয়্যারও

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

চোখে দেখতে পায় না মেয়ে। যদিও তার জন্য আটকে থাকে না কিছুই। পড়াশোনায় সে তুখোড়। নিজের কাজকর্মের জন্য কারও মুখাপেক্ষীও থাকতে হয় না। কিন্তু তাই বলে পাহাড়ের দুর্গম পথে ট্রেকিং করতে যাওয়ার বায়না! মেয়ের সব আবদার মেনে নিলেও, কোনও কিছুতে বাধা না দিলেও, এটা শুনে ঠিক মেনে নিতে পারেননি বাবা। মেয়ে উল্টে বলেছিল, “তুমিই তো বলো জীবনের পথ অনেক কঠিন। পাহাড় কি তার চেয়েও কঠিন হবে?”

মেয়ের এই প্রশ্নের মুখে আর পাল্টা যুক্তি খুঁজে পাননি বাবা। যেতে দিয়েছিলেন মেয়েকে। তখন অবশ্য জানতেন না, সেই দৃষ্টিহীন পর্বতারোহী হিসেবে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে তাঁর মেয়ে, কাঞ্চন গাবা!

হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে পর্বতারোহণের বেসিক কোর্স করে ফেলার পরে একের পর এক ট্রেকিং সেরে ফেলেছেন কাঞ্চন। পুরস্কৃত হয়েছেন বারবার। এ সবের মাঝেই চলেছে জোরকদমে পড়াশোনা। আইন নিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন কাঞ্চন। কিন্তু সে বিষয়ে ব্রেলে লেখা বইপত্রের সংখ্যা খুব কম। তবু হার মানেননি। লড়ে গিয়েছেন মনের জোরে। অর্জন করেছেন ডিগ্রি। একের পর এক কঠিন মামলা জিতে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আইন জগতের রথী-মহারথীদের।

গল্পটা হয়তো এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান উৎসবের তৃতীয় দিনে, বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারের সাত নম্বর হলের দর্শকদের জন্য আরও চমক বাকি ছিল। মহিলা বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করতে এসেছেন তিনি। শুধু কি নিজের সাফল্যই সেখানে শেষ কথা হতে পারে?

আরও পড়ুন: বর্ধমানের রোভার আন্তর্জাতিক আসরে, ফের চমক দেখাল বাংলার কিশোর

“একটা সময়ের পরে চাকরি ছেড়ে দিই আমি। পিএইচডি করতে শুরু করি। আমার অনেক জানার ছিল। অনেক জ্ঞান অর্জন করার ছিল। সবাই বলেছিল, মেয়েটা কি পাগল হয়ে গেছে? একে অন্ধ, তাই মেয়ে চাকরি করছে তাই তো কত! আবার পড়াশোনা করার কী দরকার! আমি বলেছিলাম, পাগলরাই জীবনে কিছু করতে পারে। এর পরে নিজের থিসিস নিজে লিখে শেষ করি আমি।”– বলে চলেন কাঞ্চন।

কথা বলতে বলতেই দেখাচ্ছেন স্লাইড। প্রতিটি স্লাইড বদল করছেন নিখুঁত দক্ষতায়। দর্শকেরা দেখছেন, তিনি বলছেন। শোনা আর দেখায় কোনও ফারাক ঘটছে না একটা বারের জন্যও। কে বলবে, তিনি চোখে দেখতে পান না!

চাকরি ছেড়ে, দৃষ্টিহীনদের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ডেভেলপিংয়ে মন দেন কাঞ্চন। একার পক্ষে সম্ভব ছিল না কাজটি করা। গড়ে তোলেন একটি সংস্থা, ‘টার্নস্টোন গ্লোবাল।’ সেই সংস্থার তরফেই ডেভলপ করা হয় ‘নন ভিজ্যুয়াল ডেস্কটপ অ্যাকসেস’ নামের একটি সফটওয়্যার। এত দিন যেখানে ৩৪ হাজার টাকার বিনিময়ে মার্কিন সফটওয়্যার কিনতে হতো, কাঞ্চনের জেদে এবং চেষ্টায় সেটা হয়ে গেল একেবারে বিনামূল্যে। দৃষ্টিহীনদের জন্য অন্য এক জগৎ খুলে যায় কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে।

শত বাধার পরেও নিজের জীবন নিজের শর্তে বাঁচতে পারলেও, এ দেশের বাকি পাঁচটা মেয়ে যে সবসময় তেমনটা পারে না, তা জানেন কাঞ্চন। জানেন, বিজ্ঞানচর্চার মতো একটা ক্ষেত্রে মহিলাদের আনাগোনা খুব সহজ থাকে না একটা সময়ের পরে। তার একটা বড় কারণ পরিবার, সংসার, সন্তানের দায়িত্ব।

কাঞ্চনের কথায়, “মহিলাদের কাজের জায়গায় যদি বাচ্চাদের জন্য ক্রেশ রাখা যায়, তাহলে একধাক্কায় মেয়েদের উন্নতি অনেকটা বেড়ে যাবে সমস্ত কেরিয়ারের ক্ষেত্রেই। কারণ মা হওয়ার পরে বহু মহিলা কাজ ছেড়ে দেন বাধ্য হয়ে। সেই বাধ্যতাই একসময়ে কমফোর্ট জ়োন হয়ে যায় তাঁদের কাছে। বাচ্চা বড় হওয়ার পরে সেই কমফোর্ট জ়োন থেকে বেরিয়ে ফের নতুন করে শুরু করা অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার বিষয় হয়। তাই আমার মতে, কেরিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কখনওই উচিত নয়। মেটারনিটি লিভের পরে, বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়েই যাতে কাজ এগোনো যায়, সেই পরিকাঠামো তৈরি করাটা মেয়েদের উন্নতির প্রথম ধাপ।”

গবেষক থেকে বিজ্ঞানী, প্রবীণা থেকে নবীনা– প্রতিটি মানুষের হাততালিতে ফেটে পড়ে প্রেক্ষাগৃহ। কাঞ্চন মনে করিয়ে দেন, এপিজে আবদুল কালামের সেই বিখ্যাত উক্তি– “স্বপ্ন সেটা নয়, যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখো। স্বপ্ন তো সেটা, যেটা তোমায় ঘুমোতে দেয় না।”

Comments are closed.