বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

চূড়ান্ত মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন সুনন্দা, সারা শরীরে ছিল ১৫টি দগদগে ক্ষতের দাগ, চার্জশিটে জানাল দিল্লি পুলিশ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সুনন্দা পুস্করের অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলায় তাঁর স্বামী, কংগ্রেস সাংসদ শশী তারুরের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আগেই এনেছিল পুলিশ। গত বছর সেই মামলার চার্জশিটও পেশ করা হয়। মঙ্গলবার, আদালতে দিল্লি পুলিশ জানাল, তদন্তে স্পষ্ট, মৃত্যুর আগে চূড়ান্ত মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন সুনন্দা পুষ্কর। ভিসেরার (দেহাংশ) পরীক্ষায় তাঁর প্রতিটি দেহাংশে শুধু বিষই পাওয়া যায়নি, সুনন্দার শরীরের অন্তত ১৫টি জায়গায় ছিল আঘাতের দগদগে চিহ্ন।

২০১৪-র ১৭ জানুয়ারি দিল্লির এক হোটেলে উদ্ধার হয় ৫২ বছর বয়সী সুনন্দার দেহ। ময়না-তদন্তে পাকস্থলীতে বিষ মেলে। ওয়াশিংটনে এফবিআইয়ের কাছে ভিসেরার নমুনা পাঠানো হয়। পাকস্থলী, প্লীহা, লিভার, কিডনি ও মূত্রের নমুনা পরীক্ষা করে রিপোর্ট পাঠায় এফবিআই। রিপোর্টে বলা হয়, প্রত্যেকটি দেহাংশেই বিষ মিলেছে। বিষক্রিয়াই অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ।

গত বছর সুনন্দা মামলার চার্জশিট পেশ করে দিল্লি পুলিশ। তাতে একমাত্র অভিযুক্ত হিসাবে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা সাংসদ শশীর নাম করা হয়। ৩ হাজার পাতার চার্জশিটে পুলিশের দাবি ছিল, সুনন্দাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া ছাড়াও তাঁর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেছিলেন শশী। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে, মঙ্গলবার বিচারক অজয় কুমার কুহার বলেন, সুনন্দার হাত, গলা, পা-সহ শরীরের নানা জায়গায় ১৫টি ক্ষতের চিহ্ন ছিল। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, মৃত্যুর আগে তাঁর উপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। সুনন্দা পুষ্কর অস্বাভাবিক মৃ্ত্যু মামলায় বর্তমানে শশী তারুর জামিনে থাকলেও, তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮-এ ও ৩০৬ ধারায় মামলা দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ।

সুনন্দাকে বিষ দিয়ে খুন করানো হয়েছে, এই দাবি অবশ্য আজকের নয়। গত বছর সুনন্দার মৃত্যুর পাঁচ সপ্তাহ পরেই বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী অভিযোগ করেছিলেন, সুনন্দা নাকি তারুরের সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পেরেছিলেন এবং তা ফাঁস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যা প্রকাশ্যে এলে তারুরের রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে যেত। সেই কারণে পেশাদার খুনিদের দিয়ে তারুরই সুনন্দাকে খুন করিয়েছেন, এমন মারাত্মক অভিযোগও সুব্রহ্মণ্যমই এনেছিলেন। এমনকী পোলোনিয়াম নামে একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বিষ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছিলেন।

অন্যদিকে, সুনন্দার মৃত্যুর কারণ নিয়ে তাঁর আত্মীয়স্বজনের মুখে শোনা গিয়েছিল ভিন্ন সুর। তাঁর আইনজীবী অতুল শ্রীবাস্তব আদালতে জানিয়েছেন, মৃত্যুর কিছু দিন আগে পাকিস্তানি সাংবাদিক মেহর তরারের সঙ্গে শশী তারুরের ‘সম্পর্ক’ নিয়ে খুবই বিচলিত ছিলেন সুনন্দা। শশীর টুইটার অ্যাকাউন্টে ঢুকে মেহরের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্যও হয়েছিল। এই ঘটনার সঙ্গেই সুনন্দার মৃত্যুর যোগ রয়েছে। কারণ মৃত্যুর আগে চূড়ান্ত মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি।

সুনন্দার বন্ধু সাংবাদিক নলিনী সিং তাঁর বয়ানেও শশী-মেহর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। নলিনী বলেছেন, ‘‘মৃত্যুর আগের দিন সুনন্দা আমাকে ফোন করেছিল। খুব কাঁদছিল, মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিল। শশী ও মেহরের প্রতি তাঁর রাগ ছিল সপ্তমে, প্রতিশোধ নিতে চাইছিল।’’ নলিনী আরও বলেন, ‘‘সুনন্দা আমাকে বলেছিল, ও শশীকে আইপিএলের সময়ে অনেক সাহায্য করেছিল। তাঁর স্বামী ও মেহরের কিছু মেসেজও পড়ে ফেলছিল। কিন্তু, বাড়িতে গিয়ে ওদের মুখোমুখি হওয়ার বদলে, লীলা হোটেলে চলে গিয়েছিল।’’

এর আগে আইপিএল-এ কোচি টিম কেনা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন শশী-সুনন্দা। তার জেরে সাময়িক ভাবে মন্ত্রিত্ব খোয়াতেও হয়েছিল তারুরকে। পরে নতুন করে আইপিএল-এ বেটিং কেলেঙ্কারির আবহে শশী-সুনন্দা নতুন করে ঝামেলায় পড়তে পারতেন কি না, সেই সন্দেহও রয়েছে কোনও কোনও শিবিরে। সুনন্দার মৃত্যুর পিছনে ওই ঘটনার ভূমিকাও তাই আতস কাচের নীচে থাকছে।

Comments are closed.