মুন্না বজরঙ্গি থেকে বিশ্বাস নেপালি—উত্তরপ্রদেশে মাফিয়া, গুণ্ডা গ্যাংয়ের অনেক মুখ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিন্দিবলয়ের রাজ্যগুলিতে রাজনীতির সঙ্গে মাফিয়ারাজের ককটেল নতুন কোনও ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে সেই ধারা। তার মধ্যে অবশ্যই উত্তরপ্রদেশ অন্যতম। লখনউয়ের কুর্সিতে মুখ বা দল বদলের সঙ্গে সঙ্গে জার্সি বদলে ফেলে পুলিশের খাতায় মোস্ট ওয়ান্টেডরা। তাদের কারও মাথার দাম ৫০ হাজার তো কারও পাঁচ লক্ষ টাকা।

নকশালদের কায়দায় বিকাশ দুবের পুলিশ হত্যার  ঘটনা এবং শুক্রবার সাতসকালে কানপুরের গ্যাংস্টারের এনকাউন্টার আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে উত্তরপ্রদেশে নেতা-মাফিয়াদের নেক্সাসের ছবিটা। ওয়ান শটারে হাত পাকিয়ে ‘জনতার বস’ বনে যাওয়া বিকাশ দুবেই প্রথম মাফিয়া নয়।  বিকাশ দুবেই প্রথম দুর্বৃত্ত নয়, যাকে এনকাউন্টারে মারল পুলিশ। গত আড়াই দশকে বালিয়া থেকে মুজফফর নগর, বারাণসী থেকে শাহারানপুর—একের পর এক গ্যাংস্টারের উত্থান হয়েছে উত্তরপ্রদেশে। তাদের কারও মৃত্যু হয়েছে এনকাউন্টারে তো কাউকে প্রতিপক্ষ মাফিয়া গুলি করে ঝাঁঝড়া করে দিয়েছে জেলের ভিতরেই। কেউ হয়তো এখন জেলে আবার কাউকে এখনও ছুঁতেই পারেনি পুলিশ। তবে অপরাধীদের বাড়বাড়ন্ত থামেনি।

মুন্না বজরঙ্গি

অভাবের তাড়নায় ১২ বছর বয়সে প্রথম বন্দুক ধরেছিল মুন্না বজরঙ্গি। তারপর আর তাকে রোখা যায়নি। বালিয়ার অখ্যাত গ্রাম থেকে সম্রাট হয়ে উঠেছিল প্রেমপ্রকাশ সিং ওরফে মুন্না। ডাকাতি দিয়ে কেরিয়ার শুরু করে হয়ে উঠেছিল জমি মাফিয়া। অনেকে বলেন, উত্তরপ্রদেশের তাবড় নেতারা সমঝে চলত তাকে। ভোট এলে বজরঙ্গি দেখবে নেতাদের, সারা বছর নেতারা দেখবে তাকে—এই ছিল মোদ্দা চুক্তি। খুন ও ধর্ষণের মামলায় ২০১৮ সালের ৭ জুলাই তাকে গ্রেফতার করে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। ৮ জুলাই আদালতের নির্দেশে বরেলি জেলে রাখা হয় তাকে। কিন্তু দু’চার ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ বরেলির জেল থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় মুন্না বজরঙ্গিকে। রাত সাড়ে নটায় তাকে ঢোকানো হয় বাগাপত জেলা সংশোধনাগারে। পাশের সেলেই বন্দি ছিল উত্তরপ্রদেশের আরএক কুখ্যাত দুষ্কৃতী সুনীল রাঠি। পরের দিন ঠিক সকাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ তোলপাড় পড়ে যায় জেলের ভিতর। জেলের মধ্যেই মুন্নাকে ১০টা গুলি করে খুন করে রাঠি ও তার শাগরেদরা। মুন্না বজরঙ্গিকে জেলের ভিতর খুনের তদন্ত করছে কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি সিবিআই।

বিশ্বাস নেপালি

বারাণসীর ঘিঞ্জি কপিলেশ্বর গলিতে বেড়ে উঠছিল অন্যসব শিশু-কিশোরদের মতোই। মহল্লার নামেই বাবা-মা নাম রেখেছিল কপিলেশ্বর। কিন্তু ছোট থেকে রগচটা ছেলেটা যে এমন কাণ্ড বাঁধিয়ে বসবে কে জানত! বারাণসীর ঐতিহাসিক গঙ্গার ঘাটে একদিন রক্তগঙ্গা বইয়ে দিল ছেলেটা। এক মধ্যবয়সী ব্যক্তির সঙ্গে বচসা থেকে হাতাহাতি। তারপর রাগ সামলাতে না পেরে পাশে বসে থাকা নাপিতের হাত থেকে ক্ষুর নিয়ে সোজা ওই লোকটির গলার নলি ধরে চিরে দেয়। ব্যস! ওই শুরু। তারপর কপিলেশ্বর শর্মা থেকে হয়ে ওঠে বিশ্বাস নেপালি। জেলে যাওয়া জলভাত হয়ে গিয়েছিল তার। অল্প সময়ের মধ্যেই বারাণসীর ত্রাস হয়ে ওঠে বিশ্বাস নেপালি। কপিলেশ্বর গলি-সহ আশপাশের এলাকার অলিখিত নাম হয়ে দাঁড়ায় ‘নেপালি কা মহল্লা!’ এ হেন বিশ্বাস নেপালি ২০১৬ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছনের একটি এলাকায় এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করে। তারপর থেকে অধরা সে। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের খাতায় মোস্ট ওয়ান্টেডদের তালিকায় অন্যতম নাম বিশ্বাস নেপালি।

শাহবুদ্দিন

কচু কাটতে কাটতে ডাকাত হওয়া বলতে যা বোঝায়, গাজিপুরের শাহবুদ্দিন যেন তার আদর্শ উদাহরণ। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের রিপোর্ট বলছে, সাইকেল চুরি দিয়ে শুরু হয়েছিল তার অপরাধ জগতে আসা। তারপর আস্তে আস্তে দল গড়ে গোটা উত্তরপ্রদেশে মোটরসাইকেল চুরির জাল বিছিয়েছিল শাহবুদ্দিন। তখন বয়স খুব বেশি হলে ১৮। সেই মোটর সাইকেল চুরির চক্র থেকে ব্যাঙ্ক ডাকাতি, এটিএম লুঠ—শাহবুদ্দিন ছিল মাস্টারমাইন্ড। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ছাড়তে থাকে শাহবুদ্দিন। নিজের বাহিনী আর অস্ত্রের আস্ফালনে ক্রমশ জমিয়া মাফিয়া হিসেবে তুলে ধরে নিজেকে। অনেকের মতে, তার মাথায় ছিল সমাজবাদী পার্টির ছাতা। সপা র বিধায়ক মোক্তার আনসারির ঘনিষ্ঠ ছিল শাহবুদ্দিন। গত ১৫ বছর ধরে পুলিশের খাতায় ফেরার শাহবুদ্দিন। তার নাম রয়েছে মোস্ট ওয়ান্ডদের তালিকায়।

সুনীল যাদব

উত্তরপ্রদেশের যে কয়েকজন মাফিয়ে নিজে হাতে নৃশংস কায়দায় একের পর এক খুনখারাপি করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম সুনীল যাদব। বারাণসীর চোলাপুর থেকে শুরু করে ক্রমশ নিজের এলাকা বাড়িয়ে যাচ্ছিল সুনীল। শোনা যায়, বিজেপির আশীর্বাদ ধন্য হয়েই একের পর এক অপরাধ করে বেরিয়েছিলএই দুষ্কৃতী। একাধিক খুন, ধর্ষণে অভিযুক্ত সুনীল ২০০১১ সালে নৃশংস হত্যা করে এক পরিবারের চার জনকে। গুলি করে মারার পর চপার দিয়ে টুকরো করেছিল ওই পরিবারের স্বামী, স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানের দেহ। ওই মামলাতেই তাকে হরিয়ানা থেকে গ্রেফতার করে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। রাখা হয়েছিল বারাণসী জেলে। কিন্তু জেলের মধ্যেই ডেপুটি জেলার অনিল ত্যাগীকে গুলি করে খুন করে সুনীল। তারপর পালিয়ে যায় জেল থেকে। সেই থেকে তাকে খুঁজছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ।

আফতাব আলম থেকে মনু গুজ্জর, রমেশ ঠাকুর থেকে মুক্তার শেখরা রয়েছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেডদের তালিকায়। অনেকে বলেন, এদের পুলিশ খুঁজে না পেলেও এরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। প্রত্যেকেই তাদের অপরাধমূলক কাজকারবার চালিয়ে যাচ্ছে। রক্ষাকবচ কোনও না কোনও ঝাণ্ডা। সেই ধারাতেই বিকাশ দুবে একটা নাম মাত্র। আর কিছুই নয়।

উত্তরপ্রদেশের লোকে বলে, যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। কংগ্রস, বসপা, সপা, বিজেপি — সব জমানাতেই গুণ্ডারা কমবেশি দুধে ভাতে ছিল। অতীতে সপা সরকারের অবসান ঘটাতে একবার মায়াবতী স্লোগান তুলেছিলেন.. চড় গুণ্ডো কি ছাতি পর/ মোহর লাগা দো হাতি পর। ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন গুণ্ডা দমন চালিয়েওছিলেন বহেনজি। কিন্তু সেটা কিছুদিনই.. উল্টে বসপাও জন্ম দিয়েছিল বাহুবলী নেতার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More