চন্দ্রযান নিয়ে উৎকন্ঠা, তারই মধ্যে আকাশে আলোর ছটা দেখতে পেল নাসা, রহস্য নাকি কোনও সংকেত?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    আকাশ জুড়ে আলোর ছটা। সাদা সাদা ধোঁয়া মেঘ যেন সাপের মতো কুণ্ডলী পাকাচ্ছে। তারই মাঝে নীল-সবজে আলোর ছটা। একবার জ্বলে উঠছে, পরক্ষণেই মিলিয়ে যাচ্ছে। নীল-সবুজ আলোকে সঙ্গ দিয়ে ঝলসে উঠছে আরও লাখ লাখ, কোটি কোটি ফ্ল্যাশ লাইট। আতসবাজির মতো তৈরি হচ্ছে আলোর মালা, যেন ঝাঁকে ঝাঁকে তারারা খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে মহাকাশে। বিচিত্র এই আলোর ছটা ধরা পড়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার নিউক্লিয়ার স্পেকট্রোস্কোপিক টেলিস্কোপ অ্যারে (নিউস্টার)অবজ়ারভেটরিতে।

    তারাদের পরিবারে বহুদিন ধরেই নজরদারি চালাচ্ছে নাসার নিউস্টার অবজ়ারভেটরি। মহাকাশে নিত্য নতুন তারাদের ঠিকানা বা গ্যালাক্সির খোঁজ দেওয়াই এর কাজ। নীল-সবজে রহস্যময় আলোর এই গ্যালাক্সির সন্ধান মিলেছে খুব সম্প্রতি। পৃথিবী থেকে ২২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে থাকা এই গ্যালাক্সির নাম দেওয়া হয়েছে এনজিসি ৬৯৪৬ (NGC 6946)। জ্য়োতির্বিজ্ঞানীদের ভাষায় Fireworks Galaxy।  দিন কয়েক আগেই ‘অ্যাসট্রোফিজিকাল জার্নাল’-এ এনজিসি ৬৯৪৬ গ্যালাক্সির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।


    নিউস্টারের চোখে ধরা পড়া FireWorks Galaxy এর নানা মুহূর্ত (ছবি সৌজন্যে: নাসা)

    ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (Caltech) জ্যোতির্বিজ্ঞানী হান্না আর্নশ এই গ্যালাক্সির বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন। তিনিই বলেন, “মহাশূন্যে প্রতি নিয়ত কোটি কোটি তারার জন্ম হচ্ছে, আবার তাদের মৃত্যুও হচ্ছে। মৃত তারাদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে অতল শূন্যে। পৃথিবীর মাথার উপর বাটির মতো উপুর করা এই মহাকাশে এক অদ্ভুত জীবনচক্র চলছে। নতুন এই ছায়াপথে প্রতি দশ দিন অন্তর অন্তর ঝলসে উঠেছে নীল-সবুজ আলো। আবার তারা লুকিয়ে পড়ছে গহীন অন্ধকারে। কী রহস্য খেলা করছে ওই ছায়াপথে?

    নিউক্লিয়ার স্পেকট্রোস্কোপিক টেলিস্কোপ অ্যারে  (নিউস্টার) অবজ়ারভেটরি

    নক্ষত্রপুঞ্জে নীল-সবুজের খেলা, কোনও সিগন্যাল নয় তো?

    নাসার নিউস্টার অবজ়ারভেটরিতে ধরা দিয়েছে, কোটি কোটি তারার সমষ্টি ওই গ্যালাক্সিতে আচমকাই আতসবাজির মতো ঝলসে উঠছে দুটি নীল আলোর বল। উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠে তাদের রঙ আবার ফিকে হচ্ছে কয়েক মুহূর্তের জন্য। গ্যালাক্সিরই নীচের দিকে ভেসে বেড়াচ্ছে এক সবুজ আলোর ছটা। কখনও বলের মতো, আবার কখনও ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘের মতো তার গঠন। সেও এক অদ্ভুত মায়ামাখা রূপকথার পরিবেশ তৈরি করছে গ্যালাক্সির অন্দরে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সুবজ আলোর বল প্রথমে নিউস্টারের চোখে ধরা পড়েনি। নীল আলো দেখা দেওয়ার দশ দিন পড়ে এই সবুজ গোলা ধরা দেয় নিউস্টারের লেন্সে। হান্না জানিয়েছেন, নীল-সবুজের এই লুকোচুরি চলছে গত এক সপ্তাহ ধরে। কখনও তারা ভেসে উঠছে আগুনের গোলার মতো, আবার কখনও ফিকে হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ছায়াপথের মাঝে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কথায়, “নিউস্টার সাধারণত গ্যালাক্সির ভিতরে ঘটে চলা প্রতি সেকেন্ডের পরিবর্তন সামনে আনে। এই বিচিত্র আলোর কারসাজি ধরতে নিউস্টারের একটু বেশিই সময় লেগেছিল। হঠাৎ করে জ্বলে উঠে কোন গোপন কথাটা জানান দিতে চাইছে ওই সবুজ আলো। কোনও সিগন্যাল নয় তো?”


    তারায়-তারায় যুদ্ধ চলছে
    , জন্ম-মৃত্যুর খেলা ছায়াপথে

    গ্যালাক্সি সাধারণত হয় একটা জমাট বাঁধা গ্যাসের স্রোতের মতো। এর চেহারা হয় বড়সড় দৈত্যের মতো। এই দৈত্যের শরীরে বাসা বেঁধে থাকে কোটি কোটি নক্ষত্র। মহাকাশবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই গ্যালাক্সিতে এমন কিছু নক্ষত্র রয়েছে যাদের আকার ও ভর সূর্যের চেয়েও বহুগুণ বড়। এই বিশালাকয় তারাদের মধ্যে যুদ্ধ চলছে অবিরত। একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে, সংঘাতে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। বিকট বিস্ফোরণে গনগনে লাভার স্রোতের মতো ধোঁয়া ও মৃত তারাদের শরীরের ছিন্নভিন্ন অংশ ছিটকে আসে বাইরে। মহাজাগতিক এই বিস্ফোরণ বা তারায়-তারায় সংঘর্ষকে বলে সুপারনোভা (Supernova)।  এই প্রলয় যেমন মৃত্যু ঘটায়, তেমনি জন্ম দেয় নতুন নক্ষত্রের।

    মহাকাশবিজ্ঞানীরা বলেন, গ্যালাক্সির ভিতরে যে মহাজাগতিক ঝড় বয়ে চলেছে তার শক্তি কয়েক হাজার পরমাণু বা হাইড্রজেন বোমার সমান। এনজিসি ৬৯৪৬ গ্যালাক্সির ভিতরেও এই মহাজাগতিক বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে কোটি কোটি বছর ধরে। এই বিস্ফোরণের জেরে সেকেন্ডে কয়েক হাজার কিলোমিটার বেগে নির্গত হচ্ছে তরঙ্গ। যার প্রতিফলন ওই আতসবাজির মতো আলোর মালা। আমাদের মিল্কি ওয়ে বা আকাশগঙ্গার মতোই এই গ্যালাক্সিও আলোকজ্জ্বল।

    সন্দীপ চক্রবর্তী

    এই প্রসঙ্গে  কলকাতার ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের ডিরেক্টর, বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বলেন, ‘‘প্রচণ্ড শক্তিশালী এক্স রে, গামা নির্গত হচ্ছে গ্যালাক্সি থেকে। যার স্থায়িত্বকাল ১০ দিন। এই এক্স রে সোর্সকেই বলা হচ্ছে আলট্রালুমিনাস এক্স-রে সোর্স বা ইউএলএক্স ৪ (ULX 4)।’’ তাঁর মতে এর কারণ হতে পারে দু’টো— প্রথমত ওই ছায়াপথের মাঝে থাকা কোনও ব্ল্যাক হোল (৫০ বা ৫০০ সোলার মাসের)তার চারপাশের বস্তুকে প্রবল অভিকর্ষজ বলের টানে টেনে নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নিউট্রন স্টারের প্রভাব কাজ কারতে পারে। এটা কী? সন্দীপ বাবুর কথায়, আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলির জন্ম হয়েছে আন্তঃমহাকাশীয় গ্যাসীয় বস্তুর সঙ্কোচনের ফলে। এ সব গ্যাসীয় বস্তুর প্রধান উপাদান মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। এই সব গ্যাস নিজ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সঙ্কুচিত হতে থাকে। আর সঙ্কুচিত হতে থাকলে এদের ঘনত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফলে উৎপর্ণ হয় প্রচণ্ড তাপ। নক্ষত্রগুলির ভিতরে তখন সঙ্কোচন ও প্রসারণ চলতে থাকে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ তাপ ও আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়।

    প্রচণ্ড অভিকর্ষজ বলের টানে ব্ল্যাক হোল সবকিছুকে টেনে নেয় নিজের ভিতরে।

    ব্ল্যাক হোল গিলে খাচ্ছে গ্যালাক্সিকে নীল-সবুজ আলোর উৎস কী?

    নীল-সবুজ আলোর এই অদ্ভুত রহস্য নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী মত, নিউট্রন স্টারের প্রভাব সম্ভবত নয়। এখানে কাজ করছে ব্ল্যাক হোলের ক্রিয়া। এনজিসি ৬৯৪৬ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে কোনও রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। যার অস্তিত্ব নিউস্টার অবজ়ারভেটরিতে ধরা পড়েনি বটে, তবে ধারণা এই ব্ল্যাক হোলই গিলে নিচ্ছে শত শত তারাকে।

    ব্ল্যাক হোল এমনই একটি মহাজাগতিক বস্তু যে সবসময় খাই খাই করছে। এর অভিকর্ষজ বল অত্যন্ত শক্তিশালী। চার পাশে থাকা কোনও গ্যালাক্সির যে নক্ষত্র, আর গ্যাসের মেঘকে নিজের দিকে টেনে আনতে পারে। তারপর সেগুলোকে টপাটপ গিলে ফেলে। ব্ল্যাক হোলের ভিতরে এই নক্ষত্রেরা তলিয়ে যাওয়ার সময় প্রচণ্ড বেগে একে অপরকে ধাক্কা মারে। এই সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয় এক্স-রে। যা আমরা দেখতে পাই না। তবে সেগুলিও তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ

    তারা গিলে খাচ্ছে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর

    সন্দীপ বাবুর মতে, এই আলট্রালুমিনাস এক্স রে সোর্সের কারণ নিউট্রন স্টারের পালস নয়, বরং খুব ভারী কোনও ব্ল্যাক হোল। এই জাতীয় ব্ল্যাক হোল য়খন কোনও তারাকে গিলে খায়, সেই তারার শরীর ক্রমে লম্বা হতে থাকে। ফলে প্রচণ্ড বেগে এক্স রে নির্গত হয়। যতক্ষণ এই থাবার প্রক্রিয়া চলে, ততক্ষণ এই তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ বেরিয়ে আসতে থাকে গ্যালাক্সি থেকে এবং মহাশূন্যে ভেসে বেড়ায়। খাওয়া শেষ হয়ে গেলে, এক্স রে নির্গমনও বন্ধ হয়ে যায়। তখন আলোর দপদপানি নিভে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে যেহেতু ১০ দিন অন্তর এই নীল-সবুজ আলোর ভেল্কি দেখা যাচ্ছে, সেহেতু ধরে নেওয়া যেতেই পারে শুধু একটি তারাকে নয়, গ্যালাক্সির ভিতরে থাকা আরও অনেক তারাই ব্ল্যাক হোলের শিকারে পরিণত হচ্ছে।

    এই গ্যালাক্সিতেও তেমনই কিছু একটা ঘটে চলেছে। যার কারণে, ব্ল্যাক হোলের চার পাশের ওই এলাকায় অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হচ্ছে। সেখান থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে এক ধরনের আলো। তবে সন্দীপ বাবুর মতে একটি তারাকে খেতে কৃষ্ণগহ্বরের প্রায় ৬ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। এই গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে সেই সময়টা ১০ দিনে ঠেকেছে। কাজেই মনে করা হচ্ছে খুব কম ভরের কোনও তারা বা সুপার লাইট জাতীয় কিছু দিয়েই ভোজ সেরেছে ব্ল্যাক হোল আর সেই জন্যই এই বিচিত্র আলোর ছটা।

    জ্যোতির্বিজ্ঞানীর মতো, এই আলোর উৎস এবং তার ক্ষণস্থায়ী হওয়ার কারণ অঙ্ক কষে যধি বার করা যায়, তাহলে ব্রহ্মাণ্ডের অনেক অনেক রহস্যময় দিকের পর্দা খুলে যাবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More