অ্যানাকোন্ডার মতো পেঁচিয়ে ধরছে হিংস্র ব্ল্যাক হোল, ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছে তারার শরীর, মহাজাগতিক-শিকার দেখল নাসা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    আদিম, বুনো এক শিকারপর্ব চলছে মহাকাশে। ওঁত পেতে থেকে শিকার ধরছে এক বিশাল অ্যানাকোন্ডা। তার জোরালো নিঃশ্বাসে দূর থেকে টেনে নিচ্ছে এক অসহায় নক্ষত্রকে। যথেষ্ট শক্তিশালী এবং ওজনে ভারী হলেও, অ্যানাকোন্ডার গ্রাস থেকে তার রেহাই নেই। পেঁচিয়ে ধরে তারার শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে দিচ্ছে সে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে সেই তারার দেহের বিভিন্ন অংশ। এই শিকারি খুবই হিংস্র। মুখের খাবার ছাড়তে রাজি নয়। বাঁচার মরিয়া চেষ্টা শিকারেরও। শেষবেলায় একটা মরণ কামড় বসাল যেন! উত্তাপে ঝলসে গেল চারপাশ। বিকট বিস্ফোরণে অন্ধকারের বুক চিরে আলো ছড়িয়ে পড়ল বিদ্যুৎ শিখার মতো।

    এই ক্ষুধার্ত অ্যানাকোন্ডা একটি রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। মহাকাশের এই অ্যানাকোন্ডার ভোজনপর্ব দেখল নাসার দু’টি টেলিস্কোপ– নিল গেহরেল্‌স সুইফ্‌ট অবজারভেটরি (NASA-Swift)‘ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট’ (টেস) (NASA-TESS)

    ক্যালিফোর্নিয়ার কারনেগি অবজ়ারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী থমাস হলোইন জানিয়েছেন, ভিন্ গ্রহের সন্ধানে মহাকাশে উঁকিঝুঁকি দেওয়া টেস (TESS) কয়েক মাস ধরে ব্ল্যাক হোলদের পাড়াতেও নজরদারি চালাচ্ছে। রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোল সে অনেক দেখেছে, তবে এমন ক্ষুধার্ত অ্যানাকোন্ডা এই প্রথম। মহাজাগতিক এই শিকারপর্বকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে, ASASSN-19bt। তারাকে পেঁচিয়ে ধরে গিলে ফেলছে একটি ভারী  Super massive ব্ল্যাক হোল। তার সর্পিল ফণার পাশে অসহায় বন্দি সেই নক্ষত্র। যদিও নাসার টেলিস্কোপে ধরা দিয়েছে সেই তারা আড়েবহরে আমাদের সৌরমণ্ডলের সূর্যের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ওজনদার।

    (বাঁ দিকে) নাসার ‘ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট’ (টেস), (ডান দিকে) নিল গেহরেল্‌স সুইফ্‌ট অবজারভেটরি (সুইফট)

    এত হিংস্র ব্ল্যাক হোল, এমন ভয়ানক শিকার আগে দেখা যায়নি

    ২৭ সেপ্টেম্বর অ্যাসট্রোফিজিক্যাল জার্নালে এই ব্ল্যাক হোল নিয়ে যাবতীয় গবেষণার কথা লেখেন থমাস হলোইন। ASASSN-19bt কে চাক্ষুষ দেখার জন্য, ‘অল-স্কাই অটোমেটেড সার্ভে ফর সুপারনোভা (ASAS-SN)’ নেটওয়ার্ক কাজ করছিল বিশ্বজুড়ে। প্রথম এই মহাজাগতিক ঘটনা ধরা পড়ে ২৯ জানুয়ারি। নাসার সুইফট্ টেলিস্কোপ ছাড়াও ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) ‘এক্সএমএম-নিউটন’ (XMM-Newton)লাস কামব্রেস অবজ়ারভেটরির গ্রাউন্ড-বেসড ১ মিটার টেলিস্কোপে ধরা পড়ে এই দৃশ্য।

    কোনও তারা বা নক্ষত্রের মৃত্যুর সময় যে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ হয় তাকে বলে সুপারনোভা। সুপারনোভার সময় তীব্র আলোর ছটা দেখা যায় মহাকাশে। কিন্তু সেই ছটার ঔজ্জ্বল্য বেশি দিন থাকে না। অল্প সময়েই তা ফিকে হতে শুরু করে। তার পর তা হারিয়ে যায়। এ বার যেটা সকলকে অবাক করে দিয়েছে, তা হল, সাধারণত সুপারনোভা হলে যতটা আলোর ছটা দেখা যায়, মহাকাশে অ্যানাকোন্ডার ভোজনপর্বে  তার চেয়ে ১০-১২ গুণ আলো ঠিকরে বেরিয়েছে। এবং এই আলোর দ্যুতি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

    আরও পড়ুন: গপ গপ করে তারা গিলছে রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোল, দিনে তিন বার ভূরিভোজ, অবাক হয়ে দেখল নাসা

    এক লক্ষ বছরে একবার দেখা যায় এমন তারার মৃত্যু

    পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৭ কোটি আলোকবর্ষ দূরে 2MASX গ্যালাক্সির কেন্দ্রে জমিয়ে বসে রয়েছে ওই অ্যানাকোন্ডা ব্ল্যাক হোল। নাসার সুইফট্ অবজ়ারভেটরির প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর এস বার্ডলে কেনকো জানিয়েছেন, এই গ্যালাক্সির আয়তন আমাদের ছায়াপথ (Milky Way)-এর মতোই। তবে যে তারার মৃত্যু হচ্ছে তার আয়তন সূর্যের থেকে ৬০ লক্ষ গুণ বেশি। মহাকাশবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি গ্যালাক্সির গ্যাসীয় স্তরে ভেসে বেড়ায় কোটি কোটি নক্ষত্র। বিশালাকার সেইসব তারাদের মধ্যে অবিরত ধাক্কাধাক্কি, মারামারি চলে। যার ফলে ভয়ানক বিস্ফোরণ হয়, যাকে বলে  সুপারনোভা (Supernova)।  এই প্রলয় যেমন মৃত্যু ঘটায়, তেমনই জন্ম দেয় নতুন নক্ষত্রের। আবার এমনও দেখা যায়, গ্যালাক্সির ভিতর লুকিয়ে থাকা কোনও ভারী ব্ল্যাক হোল তার প্রবল অভিকর্ষজ বলের ক্রিয়ায় তারাদের নিজের দিকে টেনে নিতে থাকে। ব্ল্যাক হোলের ভিতরে এই নক্ষত্রেরা তলিয়ে যাওয়ার সময় প্রচণ্ড বেগে একে অপরকে ধাক্কা মারে। এই সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয় এক্স-রে। যা আমরা দেখতে পাই না। তবে সেগুলিও তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ। এই রশ্মির বিকিরণ প্রচণ্ড তাপমাত্রা ও আলোর ছটা তৈরি করে।

    জ্যোতির্বিজ্ঞানী থমাস হলোইন জানিয়েছেন, নাসার সুইফট্ অবজ়ারভেটরি দেখেছে এই গ্যালাক্সির ব্ল্যাক হোলটি তারাদের টেনে নিচ্ছে সর্পিল গতিতে। ফলে একটা সময় তাপমাত্রা আচমকাই কমে যাচ্ছে।  যাকে বলা হয় Tidal Disruption। দেখা গেছে অ্যানাকোন্ডার একটা বিরাট টানে তাপমাত্রা কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ ৭১,৫০০ ডিগ্রি থেকে ৩৫,৫০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। ফলে এক্স-রে নির্গমনও হয়েছে খুব ধীর গতিতে এবং কম মাত্রায়। তবে আলট্রাভায়োলেট রশ্মি বেরিয়েছে গনগন করে। যার কারণেই অমন সর্পিল গতিতে আলোর ছটা ও বিস্ফোরণ দেখা গেছে।

    নাসা জানিয়েছে, এমন বিরল মহাজাগতিক ঘটনা দশ হাজার থেকে এক লক্ষ বছরে একবার হয়।

    নাসার গড্ডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার (Goddard Space Flight Center) এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী প্যাডি বয়েডের কথায়, “মহাকাশে ASASSN-19bt গ্যালাক্সি এবং তার ভিতরে এমন বিরল ঘটনা আগে দেখেনি নাসার TESS। এই ব্ল্যাক হোলের কীর্তিকলাপ এ বার ভালো করে লেন্সবন্দি করা হবে। ” তিনি জানিয়েছেন, এই ব্ল্যাক হোলের চারপাশে অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হচ্ছে। সেখান থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে এক ধরনের আলো। একটি তারাকে খেতে কৃষ্ণগহ্বরের প্রায় ৬ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। এই তারাটিকে এমন পেঁচিয়ে ধরে খেয়েই চলেছে ওই অ্যানাকোন্ডা ব্ল্যাক হোল। তাই মহাশূন্যে বিস্ফোরণ ঘটেই চলেছে।

    আরও পড়ুন:

    ডিস্কো ডান্সার ব্ল্যাক হোল! এরা তারা গেলে না, মেহফিল সাজায়, তাল মেলাল নাসা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More