সোমবার, মে ২৭

সারা শরীরে পেরেক গাঁথা, টুকরো টুকরো করে ভাঙা পা! পুলিশি নির্যাতনে নিহত দুই অভিযুক্ত

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারের জেলে ফের পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হল দুই বিচারাধীন বন্দির। অভিযোগ, চরম অত্যাচার করে তাদের মেরে ফেলেছে পুলিশ।

সূত্রের খবর, একটি ডাকাতি ও খুনের মামলায় বিহারের পূর্ব ছাম্পারান জেলার ছাকিয়া এলাকার সীতামাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে তাসলিম আনসারি ও গুফরান আলম নামের ৩২ ও ৩০ বছরের দুই যুবককে। এর পরে জবানবন্দি আদায়ের চেষ্টায় তাদের উপরে ব্যাপক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। জানা গেছে, পুলিশের হাতে আটক হওয়ার ২০ ঘণ্টার মধ্যেই তারা মারা যায়।

সূত্রের খবর, পুলিশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রশাসনের তরফেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গুফরান ও তাসলিমের পরিবার জানিয়েছে, জেল থেকেই ছেলেদের মৃত্যুর খবর পেয়েছিলেন তাঁরা। সেই সঙ্গেই কিছু ছবি ও ভিডিও ক্লিপও হাতে আসে তাঁদের। সমাহিত করার আগে যখন মৃতদেহ দু’টি ধোয়া হয়, তখনই তোলা হয়েছিল ছবি ও ভিডিওগুলি। দেখা যায়, চামড়ায় পেরেক গেঁথে রয়েছে তাদের। ওই ছবি ও ভিডিও-সহ পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয় পুলিশের কাছে। জানা গিয়েছে, পাঁচ পুলিশকর্মীকে সাসপেন্ড করেছে প্রশাসন। পরে দেহ হাতে পাওয়ার পরে বীভৎস নির্যাতনের ছাপ দেখে চমকে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা।

বিহারের ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ, গুপ্তেশ্বর পাণ্ডে বন্দিমৃত্যুর কথা স্বীকার করে বলেন, “আমরা ওসি-সহ পাঁচ জন পুলিশ অফিসারকে সাসপেন্ড করেছি। পুলিশ সুপারকেও শো কজ় করা হয়েছে। সকলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলবে।” যদিও নিহত বন্দিদের পরিবারের তরফে দায়ের করা এফআইআর-এ কোনও নির্দিষ্ট পুলিশের নাম নেই।

নিহত গুফরানের বাবা মুন্নাভর আলি বলেন, “বুধবার গভীর রাতে ছাকিয়া থানা থেকে পাঁচ জন পুলিশ এসে গুফরানকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। জানিয়েছিল, একটি অপরাধমূলক ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আমরা কিছু বলার বা বোঝার আগেই ওরা ছেলেকে তুলে নিয়ে চলে গেল। পরে গ্রামেরই আর এক বাসিন্দা তাসলিম আনসারিকেও তোলে ওরা।”

কিন্তু মুন্নাভর আলির দাবি, তিনি তার পরেই রাত তিনটের সময় তাঁর ভাই সানাওয়ার আলি ও আরও কয়েক জন গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ছাকিয়া থানায় গিয়ে দেখেন, সেখানে গুফরান ও তাসলিম নেই। “আমরা বাড়ি ফিরে আসি। কী করব, বুঝতে না পেরে, কয়েক ঘণ্টা পরে ফের যাই থানায়। এক জন স্থানীয় পুলিশকর্মীর মাধ্যমে জানতে পারি, ছাকিয়া থানায় নয়, ওকে দুমরা থানায় নিয়ে গিয়েছে। দুমরায় পোঁছে গুফরানকে দেখতে পাই আমরা। ও তখনই প্রায় আধমরা, কথা বলতে পারছিল না। বলল, পুলিশ ভীষণ মেরেছে, ওর পা ভেঙে দিয়েছে মেরে।”– বলেন গুফরানের বাবা। তিনি আরও জানান, গুফরানের পাঁচ বছরের ও তিন বছরের দু’টি সন্তান রয়েছে।

বিকেসল পাঁচটায় গুফরান ও তাসলিমের পরিবার একসঙ্গে ফের যান দুমরা থানায়। তাঁরা দেখেন, সেখানে ওরা নেই। খবর নিয়ে জানতে পারেন, সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে তাঁদের ছেলেরা। গুফরানের শ্বশুরমশাই মহম্মদ আয়ুব আলম বলেন, “হাসপাতালে গিয়ে শুনলাম, ওরা মারা গেছে। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ আনা হয়েছে এখানে। আমাদের দেহ দেখতেও দেওয়া হয়নি! পরের দিন দেহ হাতে পাই আমরা।”

পরিবারের দাবি, ওদের দু’পা ক্ষতবিক্ষত ছিল। একাধিক টুকরোতে ভেঙে গিয়েছিল। উরুতে, কব্জিতে, পায়ের তলায় লোহার পেরেক গাঁথা ছিল। কতটা অমানুষিক নির্যাতন চলেছে, তা ওদের দেহ দেখেই বোঝা গিয়েছে।

পারিবারিক সূত্রের খবর, গুফরান কাতারে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন। এক বছর আগেই দেশে ফিরেছেন তিনি। তাঁর দুই ভাইও একই কাজ করেন দোহায়। কয়েক দিনের মধ্যেই গুফরানও ফের দোহা ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। “ও বলেছিল, এই বছর ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে তার পরে কাজে ফিরবে। সেটাই কাল হল। এখানে থেকে যে এই পরিণতি হবে, কে জানত!”– কান্নায় ভেঙে পড়েন মুন্নাভর আলি।

তাসলিম আনসারির ভাইও সৌদি আরবে একই কাজ করেন। তাসলিমও গুফরানের সঙ্গেই সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু সে সুযোগ হল না। তাসলিমের বাবা মোলাজিম আনসারি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। দিন আনি, দিন খাই। কোনও ঝামেলায় থাকি না। কোনও রকমে দিন চলে। মাঝরাতে এসে ওরা ছেলেকে নিয়ে চলে গেল, কিছু করার আগেই সব শেষ!”
কান্নায় ভেঙে পড়েন তাসলিমের মা। বলেন, “আমাদের রেশন কার্ডও নেই। ইন্দিরা আবাসের আওতায় কোনও বাড়িও হয়নি এত দিনে। আমার ছেলে কোনও কিছুতেই থাকত না। আর ও যদি কোনও অপরাধ করেও থাকে, তা হলে তো আদালতে তো তার বিচার হবে। পুলিশ কী করে এভাবে পিটিয়ে মারতে পারে! এটাই কি আইন? এই আইনের কথাই কি আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেন?”

পুরো বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো বিব্রত, বিহারের নিতিশ কুমার সরকার। রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সরকার– এই নিয়ে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল বিরোধীদের তরফে। এরই জের ধরে কয়েক দিন আগে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার নিজে পুলিশের ডিজি গুপ্তেশ্বর পান্ডেকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে সে ব্যাপারে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে সরকার।

Shares

Comments are closed.