‘দেয়ালি পি’— রূপমের গানে সীমানা পেরোয় বাবা-ছেলের অনন্ত যন্ত্রণা-পথ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: গান কেমন হবে? ঠিক কোনখানে লুকিয়ে তার সৌন্দর্য? সুর তাল আর ছন্দের ঠিক কতটা মিশেল কোনও লিরিক্স-কে সুন্দর গান হিসেবে পৌঁছে দেয় শ্রোতার কাছে? তর্ক বা বিতর্কের শেষ নেই। শেষ নেই মতভেদেরও। পছন্দ আর অপছন্দের দ্বন্দ্বে প্রায়ই দিকভ্রান্ত হয়েছে শিল্পের সার্থকতা। কিন্তু একটা জায়গায় এসে সকলেই একমত হয়, মানুষের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারাটা ভাল গানের অন্যতম শর্ত। যে গান শুনে মানুষ নড়ে ওঠে, কেঁপে ওঠে, কেঁদে ওঠে, সে গানের আর যা-ই হোক, জনপ্রিয়তা নিয়ে সন্দেহ থাকে না।

    তাই এই জায়গা থেকেই আরও এক বার ‘দেয়ালিপি’-কে ভালবাসলেন শ্রোতারা। রূপম ইসলাম এর আগেও বহু বার বহু সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাঁর তৈরি করা অন্যতম ভাল এবং প্রিয় গানগুলির মধ্যে দেয়ালিপি একটি। সেই গানটির মিউজ়িক ভিডিও-ই সম্প্রতি প্রকাশ করা হল ফসিলসের আট নম্বর অ্যালবামো। আর তার পরেই আরও এক বার গানটি আঁকড়ে ধরে অঝোরে কাঁদলেন শ্রোতারা। হ্যাঁ, আপাত দৃষ্টিতে ‘রক’ গান হলেও, এ গানের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে কান্নার ডাক, যা এড়ানোর ক্ষমতা সংবেদী শ্রোতাদের নেই। দেয়ালিপির মিউজ়িক ভিডি প্রকাশের পরে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়েও এমনটাই বলছেন রূপমপ্রেমীরা।

    “আমরা আসলে যন্ত্রণা প্রজাতির ছেলে”…

    তাঁরা জানাচ্ছেন, যে কোনও শিল্পের সার্থকতা নিয়ে অনেকের মধ্যে মতভেদ আছে। বহু বিরাট মাপের শিল্পী তাঁদের নিজের জীবন জুড়ে কালজয়ী কাজ করলেও, তাঁদের শেষ জীবনে বলে গেছেন যে মানুষের বিনোদন ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি তাঁরা। ছুঁতে পারেননি মানুষের অনুভূতিকে। কিন্তু রূপম ইসলামের গান বারবারই মানুষের না-বলা কথাগুলো চিৎকার করে তুলে ধরেছে।

    দেয়ালিপি আসলে বাবা-ছেলের গল্প। বাবা-ছেলের সম্পর্কের গল্প। সম্পর্কের রাগ, অভিমান, ক্ষোভ, দুঃখ, যন্ত্রণা মিলেমিশে যাওয়া একাধিক অনুভূতির একাধিক গল্প। এই গানের ভিডিওটি তিন দিনে শ্যুট করা হয়েছে। একটি মাত্র ক্যামেরায়, কোনও অতিরিক্ত আলো ছাড়া এই শ্যুটিংটি হয়েছে। অথচ এত বড় ইউনিট নিয়ে কাজটি হয়েছে, যে তা এভাবে শ্যুট করা প্রায় অবিশ্বাস্য ঠেকে।

    দেখুন দেয়ালিপির ভিডিও।

    ১০টি আলাদা আলাদা গল্পকে তুলে ধরেছে এই ভিডিও। কিন্তু আলাদা গল্প হলেও, তারা সকলে মিলে হেঁটে চলেছে একই পথে। যন্ত্রণার পথে। বিচ্ছেদের পথে, বা হয়তো অনন্ত মিলনের পথে। থেকে থেকেই স্ক্রিনে ঝাপটা মেরেছে নানা ঝাঁকিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। কোথাও সমকামী ছেলেকে হিড়হিড় করে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাবা, কোথাও গিটার কেড়ে নিয়ে জোর করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ানো ছেলের ট্রাঙ্ক এসে পৌঁছচ্ছে বাবার পায়ে। কোথাও আবার মুখে সাদা-কালো রং মেখে একসঙ্গে মূকাভিনয় অভ্যেস করা বাবা-ছেলেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে অভাব এবং মৃত্যু।

    “বাবা আর ছেলে হেঁটে যায় সিটবেল্ট খুলে, হাতের আড়ালে নিষিদ্ধ সিগারেট জ্বালে…”

    রেললাইনের মতোই কখনও সমান্তরাল ভাবে, এগিয়ে যাচ্ছে বিচ্ছিন্ন গল্পগুলো। আবার রেললাইনের মতোই ছুঁয়ে ফেলছে একে অপরকে। ফের নিজের ছন্দে মিলিয়ে যাচ্ছে নিজেদের পথে। এত আধুনিক ভাবে গল্প বলা বাংলা গানের মিউজ়িক ভিডিও-য় আগে দেখা যায়নি বলেই জানাচ্ছেন অনেকে।

    রূপমের লেখা এই গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর লেখা ‘বিশ্বরূপম’ বইটিতে। সেখানে গানটির একটি ভূমিকাও ছিল। ভূমিকাটা তুলে দেওয়া হল বই থেকে।

    “এবারের অসীম ক্লান্তির আমেরিকা সফরে (২০১৫, ৭ রাজ্যে ৮টি অনুষ্ঠান) আমার আইপ্যাডে ছিল ‘বয়হুড’ ছবিটা। ‘বয়হুড’ অভিযানের গল্প বলে আর গল্প বলতে বলতেই আশ্চর্য সহজভাবে জীবনের বদলে যাওয়া সমীকরণগুলােকে ব্যাখ্যা করে। বিভিন্ন প্রবৃত্তি থেকে বেছে বেছে রত্ন সংগ্রহ করে এক শিশুর চরিত্র তৈরির গল্পে ওই নেটিভ আমেরিকান ‘ছাইগাদায় হিসু’ প্রথাটির চিত্রায়ন আমার কাছে অদ্ভুত এক চুম্বক। ওর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ঔদ্ধত্য আছে যা এই ছবির বাবার মধ্যেও আছে তার অল্টারনেটিভ জীবনদর্শনে— যা আস্তে আস্তে ছেলের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। একটা প্রায় অনুচ্চারিত প্রতিবাদ আছে প্রতিষ্ঠিত গতানুগতিকের বিরুদ্ধে। সেখান থেকে শুরু হওয়া আমার এই গানেও ঢুকিয়ে দিচ্ছি একটা জবাব। রক মিউজিককে ব্রাত্য করে রাখা, নিচু নজরে দেখা তথাকথিত উন্নাসিক বাঙালি, যারা রকশিল্পীকে মদ আর নেশার সংস্রবের বাইরে ভাবতে রাজি না, রকশিল্পীকে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে কদর্য অপমান করাই যাদের জীবনের মোক্ষ ও লক্ষ্য— তাদের সেই আবর্জনা মনের ছাইগাদায় বর্ষিত হােক আমার এই নতুন গানের ধারাস্নান (অল্টারনেটিভ শাশ্বত পেচ্ছাপ)।

    অবশ্য এই গানের তৈরি হওয়ার অন্য প্রেক্ষিতও আছে। সফরের শেষ দিনে আমি পৌঁছে ছিলাম একটা হস্তান্তরিত মালিকানার বাড়ির সামনে। শহরটা সিয়াটেল, আর বাড়িটা কুখ্যাত। এই বাড়ির আউট হাউসেই পাওয়া গেছিল কার্ট কোবেনের গুলি খাওয়া পচনধরা লাশ।

    কোনও স্মৃতিফলকের বালাই নেই আশেপাশের কোথাও। আছে শুধু মুক্ত ঘাসজমিতে রােদ পােহানাে দুটো কাঠের বেঞ্চ। তীর্থযাত্রীরা এই বেঞ্চদুটিকেই শহীদ বেদি বানিয়ে ছেড়েছেন। কী আর করবেন? বিভিন্ন রঙের মার্কার পেন দিয়ে তাঁরা বেঞ্চ দুটিতে লিখে রেখেছেন শােকবার্তা বা গ্রাঞ্জের উদযাপন।

    বাড়িটার সামনে পৌঁছতেই ‘বয়হুড’ ছবিটা আমার জীবনের গল্পের সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত চেহারা নিল। স্পষ্ট বুঝলাম— একটা গান আসছে। একটা গান পাচ্ছে।”

    “পেছনে দাঁড়িয়ে ওস্কায় ভবঘুরে পিতা”…

    বয়হুড সিনেমার সেই বিখ্যাত গল্পাংশের থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই গান। যেখানে এক জন ভবঘুরে বাবা তাঁর  ছেলেকে নিয়ে মাঝেমাঝে ক্যাম্পে যায়। ভোরবেলা দু’জনে আদিম আমেরিকান প্রথা নকল করে, প্রস্রাব করে উনুনের আগুন নেভায়।

    এই প্রস্রাবের কথাই বারবার উঠে এসেছে গানে। আর গানটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে বাবা-ছেলের চিরকালীন, অনন্ত যাত্রাপথ। সে পথে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাচের মতো যন্ত্রণা। সে পথ আচমকা বাঁক খেয়ে ধাক্কা মারে ছেলের মৃত্যুদৃশ্যে। এ অসহায়তায় ছেলে বাবাকে মনে করিয়ে দ্যায়, বাবার মৃতদেহ সে যেমন কাঁধে নিয়েছিল এক দিন, এবার বাবার পালা!

    “আমি মারা গেলে বাবা তুলে নিক মৃতদেহ/ যেমন একদিন আমি তার মৃতদেহ কাঁধে”…

    অনেকেই বলছেন, বাবা-ছেলের সম্পর্ক এ গানের মুখ্য উপজীব্য হলেও, এ গান আদতে জন্ম নিয়েছে যন্ত্রণায়, ক্ষোভে, অপমানে। জন্ম নিয়েছে কষ্ট পাওয়া বাবার অভিজ্ঞতায়। গানের প্রথম দৃশ্যেই তাই ধরা পড়ে নিজের ছেলে রূপের জন্মদিনে বাবা রূপম ইসলামের উপস্থিত থাকতে না পারার যন্ত্রণা। অথচ এই একই যন্ত্রণা ছুঁয়ে যায় আরও বহু বাবা-ছেলেকে। আর রূপম-ভক্তরা বলছেন, ঠিক এইখানেই রূপম ইসলামের গানের সার্থকতা। শুধু এক জন সুরকার, গীতিকার বা রকস্টার হিসেবে নয়। এক জন দার্শনিক, এক জন সহমর্মী, এক জন বন্ধু, এক জন পিতা, হয়তো বা এক জন সন্তান হিসেবেও তিনি একই রকম ভাবে হাত ধরে থাকেন শ্রোতাদের।

    “বাবা ডান হাত নিবিড় করে ধরো আমার”…

    এ গান শোনার পরে অনেক বাবা-ই হয়তো রাতের ঘুমে আর একটু বেশি করে ছেলেকে জড়িয়ে ধরবেন, ঘুমন্ত ছেলের কানে মুখ রেখে কথা দেবেন, ছেলের অবুঝ আবেগগুলো বোঝার চেষ্টা করবেন তিনি। চেষ্টা করবেন ভাগ করে নেওয়ার। আবার কোনও ছেলের শুকিয়ে যাওয়া অভিমান-ক্ষতর মুখ হয়তো আরও একটু খুলে যাবে এ গান শুনে। আরও এক বার শুরু হওয়া রক্তক্ষরণ হয়তো চাইবে, একটি বার বাবার স্পর্শ ছুঁয়ে যাক তাকে।

    ঠিক যেমন এ ভিডিও প্রকাশের পরে ফেসবুকে একটি স্টোটাস দিয়েছেন রূপম নিজেই, যেখানে দৃশ্যতই বাবাকে তুমুল মিস করছেন তিনি। দেখুন সেই পোস্ট।

    সত্যি সত্যি চোখে জল নিয়ে রেকর্ড করা গান #DewaliPee । শুকনো চোখে এ গান রেকর্ড যদি কেউ করে, অন্যায় করবে। এ গান যন্ত্রণার…

    Rupam Islam এতে পোস্ট করেছেন রবিবার, 23 জুন, 2019

    রূপমের এই গানের ভিডিও নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তেজনা তুঙ্গে। তবে এ উত্তেজনায় সত্যিই মিশে আছে বহু মানুষের চোখের জল। দুনিয়ার অন্যতম প্রিয় ও ভালবাসার সম্পর্কের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ব্যথা, যন্ত্রণাদের যেন একটি গানেই বেঁধে ফেলেছেন রকস্টার রূপম।

    আরও পড়ুন…

    আমার গান শোনার পরেও খারাপ লাগা অসম্ভব!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More