‘বন্ধু’ মশা উড়বে অ্যান্টিবডি নিয়ে, রক্ত খেলেও ছড়াবে না ডেঙ্গি, বিপ্লব আনবে নতুন গবেষণা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বুনো এডিস ইজিপ্টাই মশা কামড়ালেও হবে না ডেঙ্গি। যতই চোখ রাঙিয়ে হুল ফুটিয়ে চোঁ চোঁ করে রক্ত টেনে নিক, কিছুতেই ডেঙ্গি ভাইরাস মানুষের রক্তে পা ফেলতে পারবে না। ভিতর ভিতর যতই আস্ফালন করুক না কেন, মশার লালায় আর ছড়াবে না প্রাণঘাতী ডেঙ্গু জ্বর। না কোনও সায়েন্স ফিকশনের গল্প নয়, এমনটাই হতে চলেছে বাস্তব দুনিয়ায়। ডেঙ্গি রুখতে অভিনব পদক্ষেপ নিতে চলেচ্ছেন বিজ্ঞানীরা যা বায়োটেকনোলজির গবেষণায় বিপ্লব আনতে চলেছে।

বুনো স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশাকে কীভাবে মানুষের বন্ধু বানানো যায় তারই চেষ্টা করছেন সান দিয়েগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানীরা। মশা এবার নিজের রোগ নিজেই সারাবে। অর্থাৎ তার শরীরে ক্ষতিকর ডেঙ্গি ভাইরাস বাসা বাঁধলে, তাকে সমূলে বিনাশ করবে সে নিজেই। আসলে মশারা তো আর ভাইরাসের জন্ম দেয় না, তারা হল বাহক। বলা যেতে পারে নিজেদের শরীরে ভাইরাসকে লালনপালন করে। তাই মশা মারতে কামান না দেগে, বরং মশাদের স্বভাব-চরিত্র থুড়ি জিনেই যদি ভোলবদল করা যায়, তাহলেই কেল্লাফতে। ভাইরাসও মরবে আর মশাও রোগ ছড়ানোর বদনাম পাবে না।

তবে কাজটা মোটেও সহজ নয়। এর জন্য বিজ্ঞানীদের বিস্তর খাটাখাটনি আছে। মশার জিনে কিছু রদবদল দরকার। তার শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে অ্যান্টিবডি। অথবা পুরুষ মশার শরীরে অ্যান্টিবডি ঢুকিয়ে তার সঙ্গে মিলন ঘটানো হবে স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাইয়ের। তাতেই হইহই করে অ্যান্টিবডি চলে আসবে ভ্রুণের শরীরে। এবার বংশপরম্পরায় সেই অ্যান্টিবডিকেই কবচকুণ্ডল করে উড়ে বেড়াবে মশারা। এই অ্যান্টিবডির কাজ হবে মশার শরীর থেকে ডেঙ্গু ভাইরাসকে শিকড় সমেত উপড়ে ফেলা। যাতে এই মশা কামড়ালে ভাইরাস আর রোগ ছড়াতে না পারে।

গত ১৬ জানুয়ারি ‘প্লস প্যাথোজেনস’ (PLOS Pathogens) জার্নালে এই গবেষণার কথা জানিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (Genetically Modified)মশা বানানোর পরিকল্পনা ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ওমর আকবরির। তাঁরই ল্যাবোরেটরিতে চলছে এডিস মশাদের জিন নিয়ে কারসাজি। এই গবেষণায় ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে টেনেসের ভ্যান্ডারবিল্ট ইউভার্সিটি অব মেডিক্যাল সেন্টার। এখন দেখে নেওয়া যাক এই গবেষণার আসল উদ্দেশ্য কী।

কীভাবে স্ত্রী এডিস মশাদের আত্মীয় বানিয়ে ফেলে ডেঙ্গি ভাইরাসরা?

ডেঙ্গির বাহক মশা, কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ে ডেঙ্গু ভাইরাসরা (DENV)। এরা হল সিঙ্গল, পজিটিভ-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ ভাইরাস। ফ্ল্যাভিভিরিডি পরিবার ও ফ্ল্যাভিভাইরাস গণের এই ডেঙ্গি ভাইরাসের পরিবার অনেক বড়। এদের পাঁচ রকমের সেরোটাইপ আছে যারা প্রত্যেকেই ভয়ঙ্কর রোগ তৈরি করতে পারে। স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই (aedes aegypti) মশা এই ভাইরাসদের বাহক। এরা আবার ইযেলো ফিভার ভাইরাস, জিকা ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক।

স্ত্রী মশা পেটে এই ভাইরাস বহন করে। ভাইরাস আক্রান্ত শরীরের রক্ত খেলে সেখান থেকেও ভাইরাস বাসা বাঁধে মশার শরীরে। তবে, মশার উপরে এই ভাইরাসের ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে না। প্রায় ৮-১০ দিন পরে ভাইরাস মশার দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে ও মশার লালাগ্রন্থির মাধ্যমে লালাতে এসে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। ডেঙ্গি ভাইরাস বহনকারী মশা মানুষকে কামড়ালে লালার মধ্যে থাকা ভাইরাসরা চট করে ঢুকে যায় মানুষের রক্তে। সরাসরি ঢুকে পড়ে শ্বেত রক্তকোষে। সেই কোষগুলি যখন শরীরের ভিতর ঘুরেফিরে বেড়ায় তখন সেগুলির ভিতরে এই ভাইরাস প্রজনন চালিয়ে যায়। সংখ্যায় বাড়তে বাড়তে দেহের রোগ প্রতিরোধের দফারফা করে দেয়। যার প্রবাবেই সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা-সহ জ্বর, সঙ্গে বমি বমি ভাব, চোখের পিছনে ব্যথা এবং সারা শরীরে র‌্যাশ। ক্রনিক অসুখ আচে যাদের যেমন ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, অ্যানিমিয়া, টিবি আছে তাদের এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গি প্রাণঘাতী হতে পারে।

ডেঙ্গি ভাইরাস সেরোটাইপ ৪

ডেঙ্গি হেমারেজিক ফিভার হলে তার ফল আরও মারাত্মক। এই রোগের প্রধান লক্ষণ হল, রক্তের মধ্যে প্লেটলেট বা অনুচক্রিকার সংখ্যা কমে যাওয়া এবং রক্তের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেওয়া। যার ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং চামড়ায় ছোট ছোট রক্তের দাগের মত র‌্যাশ হয়।

আরও পড়ুন: ‘বন্ধু’ ব্যাকটেরিয়া চোঁ চোঁ করে টানছে কার্বন-ডাই অক্সাইড, গপাগপ খাচ্ছে দূষিত গ্যাস, উল্লাস বিজ্ঞানীদের

ডেঙ্গি মশার শরীরে ঢুকে ‘কারগো’ অ্যান্টিবডি

বিজ্ঞানী ওমর আকবরি

বিজ্ঞানী ওমর আকবরির কথায়, স্ত্রী মশার জিনের ভোল বদলে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে কারগো অ্যান্টিবডি। সেটা কী?  বিজ্ঞানীরা বলছেন, গবেষণায় দেখা গেছে ডেঙ্গি ভাইরাসরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় 1C19 অ্যান্টিবডিকে। তাই মানুষের শরীরে ঢুকলে এই অ্যান্টিবডিকেই নিশানা বানায় তারা। 1C19 অ্যান্টিবডি মানুষের শরীরেই তৈরি হয় অথবা টিকার মাধ্যমে আসে। এই অ্যান্টিবডি ডেঙ্গি ভাইরাসের চাররকম সেরোটাইপকে কাবু করতে পারে। বিজ্ঞানী ওমর বলছেন, স্ত্রী এডিস মশাদের শরীরে এই অ্যান্টিবডি ইনজেক্ট করতে পারলে, ভাইরাসরা আর বংশবিস্তার করতে পারবে না। তাদের ক্ষমতাও কমে যাবে। সংখ্যা বাড়তে না পারলে মশার লালাগ্রন্থিতেও আসর জমাতে পারবে না ডেঙ্গি ভাইরাসরা। ফলে মশা যখন কামড়াবে ভাইরাস আর মানুষের শরীরে ঢুকতে পারবে না।

রও পড়ুন: প্রাণঘাতী এই ব্যাকটেরিয়ারা বিপদ বুঝলেই ‘চিৎকার’ করে, বার্তা পাঠায় পরিবারকে, তাজ্জব বিজ্ঞানীরা

জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা হবে বন্ধু

1C19 অ্যান্টিবডি থেকে তৈরি করা হবে জিন ভেক্টর বা ট্রান্সজিন OA984। এই ট্রান্সজিনের সঙ্গে হিমাগ্লুটিনিন এপিটোপ ট্যাগ করে জিন অ্যানালিসিস করা হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন ট্যাগ করা এবং না করা দু’রকম জিন ভেক্টরই ইনজেক্ট করা হবে মশার লার্ভার শরীরে।

বিজ্ঞানীরা ট্রান্সজেনিক পুরুষ মশার সঙ্গে ডেঙ্গি ভাইরাস আক্রান্ত স্ত্রী মশার মিলন ঘটিয়ে পর্যায়ক্রমে হোমোজাইগাস ও হেটারোজাইগাস তৈরি করেও দেখেছেন, অপত্যের মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। এই অ্যান্টি-ডেঙ্গি ভাইরাস ট্রান্সজিন 1C19 অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা ডেঙ্গি ভাইরাসকে সবংশে ধ্বংস করে।

আরও পড়ুন: ব্যাঙের কোষ থেকে তৈরি মাংসল জীব, মানব শরীরে ঢুকে রোগ সারাবে, রুখবে প্লাস্টিক দূষণ

এর আগে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এমন জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা তৈরি করেছিলেন যার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেঁচে থাকতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিলের মতো কয়েকটি দেশে সাময়িকভাবে ম্যালেরিয়া ও জিকা ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওষুধ, রেডিয়েশন অনেক ভাবেই মশার প্রজনন ক্ষমতা কমানো যায়।  কৃত্রিমভাবে উলব্যাকিয়া ব্যাক্টিরিয়া এডিসের শরীরে ঢোকানো সম্ভব। তবে এইসব প্রক্রিয়াই আংশিক কার্যকরী হয়েছে। বিজ্ঞানী ওমর আকবরি বলছেন, মশার শরীরে অ্যান্টিবডি ঢোকানোর প্রক্রিয়ায় যদি সফলতা মেলে, তাহলে জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে নয়া মাইলফলক তৈরি হবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More