সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

নিজের ইচ্ছামত হাঁটবেন সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী মানুষ, বিজ্ঞান দিল সুখবর

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাত্র দু’মাস আগের কথা। ফ্রান্সের এক ইউনিভার্সিটির ল্যাবে, হাত, পা-যুক্ত রোবটের মতো দেখতে একটি যন্ত্রের মধ্যে ঢুকে আছেন সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক মানুষ। মানুষটির মস্তিস্কের দু’দিকে স্থাপন করা হয়েছে দু’টি সেন্সর। মস্তিস্কে থাকা সেন্সর দুটি রেকর্ড করছে মস্তিস্কের প্রতিক্রিয়া ও মস্তিস্ক থেকে হাত ও পায়ে যেতে থাকা নির্দেশ।

মানুষটির মস্তিস্ক যা ভাবছে বা নির্দেশ দিচ্ছে, সেটা দ্রুতগতিতে বুঝে ফেলছে এক্সোস্কেলিটন নামে ওই যন্ত্রটির মগজ। তারপর মানুষটির ইচ্ছা অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক হাত ও পা, মানুষটির অবশ হাত ও পা দু’টিকে নিয়ে। সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামত রোবট এক্সোস্কেলিটন চালিয়ে হাঁটছেন, স্পাইন ইনজুরির ফলে সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে চার বছর বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটা। হাঁটছেন কোনও ব্যক্তির সাহায্য ছাড়াই।

এক্সোস্কেলিটনের  সাহায্যে হাঁটছেন সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী এক যুবক

ভাবছেন সায়েন্স ফিকশনের গল্প শুনছেন। না ঘটনাটি সত্যি। ১৩০ বছরের প্রচেষ্টার শেষে এই অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রোবটের সাহায্যে নয়। সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেমত ও যেদিকে তাঁর মন চেয়েছে সেদিকেই হেঁটেছেন মানুষটি। ইন্টারনেটে এই দৃশ্য দেখে সম্মোহিত হয়ে গেছে দুনিয়া। অনেকে বলছেন এটাই হয়ত পৃথিবীর সেরা আবিষ্কার।

মানুষটি ফ্রান্সের। নাম থিবোল্ট। চার বছর আগে এক নাইট ক্লাবের বারান্দা থেকে ৩৫ ফুট নীচে পড়ে গিয়েছিলেন থিবোল্ট। প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতরভাবে আহত হন। আঘাতের ফলে প্রথমে তাঁর কাঁধ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়, তারপর পুরো দেহ।

পরবর্তীকালে বিভিন্ন চিকিৎসার পর তাঁর বাইসেপ পেশি ও বাম কব্জি সক্রিয় হওয়ার ফলে বাম হাতে স্বয়ংক্রিয় হুইলচেয়ার চালাতে পারতেন থিবোল্ট। কিন্তু তিনি কল্পনাই করেননি জীবনে আবার হাঁটতে পারবেন। তাঁকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এক্সোস্কেলিটন।

থিবোল্টের মাথার দু’পাশের সেনসরিমোটর কর্টেক্সে এভাবেই খুলি কেটে লাগানো হয়েছিল সেন্সর দুটি

কী এই এক্সোস্কেলিটন!

এক্সোস্কেলিটনকে অনেকে বলেন‘। এক্সোস্কেলিটন হল চলার ক্ষমতাযুক্ত একটি রোবট ফ্রেম, যা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীকে পরিয়ে দেওয়া হয়। যে রোবট ফ্রেমটিকে চালায় ইলেকট্রিক মোটর, নিউম্যাটিকস সিস্টেম, বিভিন্ন লিভার, হাইড্রলিকস ও আরও কিছু  কম্পিউটার নির্ভর অত্যাধুনিক টেকনোলজি। যা পক্ষাঘাতে অবশ ও অকেজো অঙ্গকে চলতে সহায়তা করে কাঁধ,কোমর ও থাইকে সাপোর্ট দিয়ে। এমনকি এই এক্সোস্কেলিটন রোবট, নীচু হয়ে ভারী জিনিস তুলতেও রোগীকে সাহায্য করে।

থিবোল্টকে পরানো হয়েছিল এই এক্সোস্কেলিটন রোবট স্যুট

বিজ্ঞানীদের তৈরি আজকের এক্সোস্কেলিটন রোবট কিন্তু তাঁদের পূর্বসূরীদের ১৩০ বছরের নিরলস চেষ্টার ফসল। ১৮৯০ সালে গ্যাসকে সংকুচিত ও প্রসারিত করে হাঁটার যন্ত্র বানিয়েছিলেন রাশিয়ার নিকোলাস ইয়াগিন।  এরপর বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন পেডোমিটার, হার্ডিম্যান,পিটম্যান,লাইফস্যু্‌ট, সফট এক্সোস্যুট নামে এক্সোস্কেলিটন।

সবগুলিরই কোনও না কোনও সীমাবদ্ধতা ছিল, যা আজ প্রায় নব্বই শতাংশ কাটিয়ে উঠেছে ফ্রান্সের Centre Hospitalier Universitaire de Grenoble-এর তৈরি চার হাত-পা যুক্ত এক্সোস্কেলিটন।

হাসপাতাল থেকে ‘থিবোল্ট’ গিয়েছিলেন CHUG-এর ল্যাবরেটরিতে 

দুর্ঘটনার পর দু’ বছর হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল পেশায় অপটিশিয়ান থিবোল্টকে। সেখানেই তিনি খবর পান এক্সোস্কেলিটন নামক যন্ত্রটির। ২০১৭ সালে তিনি ফ্রান্সের Centre Hospitalier Universitaire de Grenoble –এর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের তৈরি এক্সোস্কেলিটনের ট্রায়ালে নাম লেখান।

নিউরোসার্জন প্রফেসর স্টেফান চাবার্ডেসের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় প্রস্তুতি। প্রথমে থিবোল্টের মস্তিস্কে স্থাপন করা হয় সেন্সর। সেই সেন্সরের সাহায্যে তিনি হাত পায়ের সাহায্য ছাড়াই কম্পিউটার গেম খেলতে পারছেন কিনা দেখা হয়। আমরা কম্পিউটার গেম খেলি মস্তিস্ক ও হাতের সাহায্যে। জয় স্টিক দিয়ে। থিবোল্ট কম্পিউটার গেম খেলছিলেন জয় স্টিকের সাহায্য ছাড়াই। কেবলমাত্র চিন্তাশক্তি দিয়ে। তাঁর দুই হাতের কাজ সেন্সরের সাহায্যে করে দিচ্ছিল মস্তিস্ক।

কেবলমাত্র মস্তিস্কের সেন্সরের সাহায্যে কম্পিউটার গেম খেলে সফল হওয়ার পর হলে তাঁকে অত্যাধুনিক ও মস্তিস্কচালিত এক্সোস্কেলিটনে প্রবেশ করানো হয়, যা থিবোল্ট নিজে চালান মস্তিস্কের সাহায্যে।

থিবোল্টকে পরানো হচ্ছে এক্সোস্কেলিটন স্যুট

প্রথম দিকের এক্সপেরিমেন্টগুলির সময় থিবোল্টের মুভমেন্ট ও এক্সোস্কেলিটন আদৌ নিঁখুত ছিল না। ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীরা কাটিয়ে ওঠেন তাঁদের ত্রুটি। থিবোল্ট কাটিয়ে ওঠেন মস্তিস্ক দিয়ে রোবট এক্সোস্কেলিটন নিয়ন্ত্রণে তাঁর দিক থেকে হওয়া ত্রুটি।

সফল ভাবে একা হাঁটতে পেরে ভীষণ উচ্ছসিত থিবোল্ট। তিনি বলেছিলেন, ““হাঁটার সময় আমার নিজেকে মনে হচ্ছিল চাঁদের বুকে নামা প্রথম মানুষ। আমি ভুলে গিয়েছিলাম কীভাবে দাঁড়াতে হয়। আমি ভুলে গিয়েছিলাম ঘরের অনেকের চেয়ে আমি লম্বা।”

উচ্ছসিত থিবোল্ট

দ্রুত কমছে এক্সোস্কেলিটনের দাম 

এখন বাজারে থাকা এক্সোস্কেলিটনের দাম পড়ছে প্রায়  ৮০০০০ ডলার। ওজন প্রায় ২২ কেজি। Phoenix  কোম্পানি তাদের তৈরি  Xsuit বিক্রি করছে ৩০০০০ ডলারে। ওজন ১৩ কেজি। দাম এখনও সাধারণ ভারতীয়দের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে আশার কথা দ্রুত কমছে দাম। পৃথিবীতে চল্লিশটি গবেষক দল কাজ করছেন, আরও  কম খরচে এক্সোস্কেলিটন বাজারে আনার জন্য।

বাজারে আসতে চলেছে আরও আধুনিক এস্কোস্কেলিটন স্যুট

২০২৫ সালের মধ্যেই ২ বিলিয়ন ডলারের বাজার ধরার উদ্দেশ্য়ে নেমেছে বিভিন্ন কোম্পানি। এদের মধ্যে আছে হন্ডা মোটর, টয়োটা মোটর, লকহেড মার্টিন, প্যানাসোনিক কর্পোরেশনের মতো ইলেকট্রনিক্স জগতের রাঘব বোয়ালরা। এছাড়াও বাজার ধরার লড়াইয়ে আছে আছে Cyberdyne Inc, Ekso Bionics, Hocoma AG,  Parker Hannifin Corporation, Rewalk Robotics Ltd, Rex Bionics Ltd এর মতো নামী সংস্থাগুলিও।

তবে এক্সোস্কেলিটন পরে পক্ষাঘাতের রোগী বাসে ট্রামে উঠবেন এমন আশা এই মুহূর্তে  না করাই উচিত হবে। তবে রোগী ঘরের ভেতরে হাঁটবেন। সবসময় পরের মুখাপেক্ষী হতে হবে না তাঁকে। নিজের বেশিরভাগ কাজ নিজেই করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা, জীবন্ত শবদেহ হয়ে বেঁচে থাকার গ্লানি তাঁকে আর স্পর্শ করতে পারবে না।

Comments are closed.