রবিবার, আগস্ট ২৫

জ্যান্ত কুমির ধরেন, মানুষের প্রাণ বাঁচান, পঞ্জাবের ‘ক্রোকোডাইল ডান্ডি’ সর্দারজি যেন অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ আরউইন

চৈতালী চক্রবর্তী

২০১০ সাল। ভরা বর্ষায় চাষের জমি গুলো জলে ভাসছে। সরু খালগুলো জলে টইটম্বুর। জ্যোতিসর গ্রামের নরওয়ানা ক্যানালের জল যেন খরস্রোতা নদী। জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছেন এক প্রৌঢ়। হাত-পা ছুঁড়ে তাঁর কাতর আকুতি মেঘের গর্জনে চাপা পড়ে গেছে। জল বেয়ে প্রৌঢ়ের পিছনে ধাওয়া করছে একটা বিরাট কুমির। দৈর্ঘ্যে প্রায় সাড়ে আট ফুট। ক্যানালের একটু দূরে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চিৎকার করছেন গ্রামবাসীরা। চোখের সামনে মর্মান্তিক মৃত্যু দেখার অপেক্ষা। আচমকাই সকলকে অবাক করে ক্যানালে ঝাঁপ দিলেন একজন। মাছের মতো তীরবেগে সাঁতরে ছুঁয়ে ফেললেন প্রৌঢ়কে। বাঁচিয়ে টেনে তুললেন পাড়ে। ফের দিলেন ঝাঁপ। এ বার লক্ষ্য সেই ‘করাল কুম্ভীর।’ তাকেও কায়দা করে বাগে এনে, টেনে তুললেন পাশের জমিতে। মুখ বেঁধে কাঁধে চাপিয়ে হাঁটা দিলেন বন দফতরের অফিসের দিকে।

সিনেমার গল্প নয়। বাস্তবে এমনটাই হয়ে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। হরিয়ানার কুরুক্ষেত্রে। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর শপথ নিয়ে দৌড়ে চলেছেন এক সর্দারজি। মিলখা সিংয়ের মতোই তাঁর গতি। প্রগত সিং সান্ধু। তাঁর আরও একটা পরিচয় রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ‘ক্রোকোডাইল হান্টার’ স্টিভ আরউইনের মতোই ক্ষিপ্র তাঁর গতি। খাল, বিলের জলে ঝাঁপ দিয়ে অবলীলায় ধরে ফেলেন ৮-১০ ফুটের বড় বড় কুমির। কখনও বাঁশে বেঁধে, আবার কখনও কাঁধে ফেলেই কুমিরদের নিরাপদে পৌঁছে দেন তাদের সংরক্ষণ কেন্দ্রে। প্রগত সিং সান্ধু তাই পঞ্জাবের ‘ক্রোকোডাইল ডান্ডি।’


‘ক্রোকোডাইল ডান্ডি’ প্রগত সিং সান্ধু

সালটা ২০০৫ হবে। ঠিক মনে পড়ে না সর্দারজির। ডুবন্ত মানুষকে জীবনের আলো দেখানোর জার্নিটা শুরু হয় তখন থেকেই। বলেছেন, ‘‘হরিয়ানায় অজস্র খাল বিল, জলাশয় রয়েছে। বর্ষার সময় এই খালের জল মেশে চাষের জমিতে। ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বহু মানুষ স্রোতে ভেসে যান। তাঁদের সকলকে উদ্ধার করার দায়িত্ব আমি নিয়েছি। নিজে থেকেই।’’ প্রগত সিং সান্ধু অভিজ্ঞ ডুবুরি। সরকারি ভাতার কর্মচারী নন। প্রশাসনের হয়ে কাজ করেন না। সখের ডুবুরি। প্রাণ বাঁচানোটা তাঁর নেশা, পেশা নয়। গত ১৫ বছরে হরিয়ানার একাধিক খাল, বিল, জলাশয় থেকে মানুষ বাঁচিয়েছেন নয় নয় করেও ১৬৫৮। এটা সর্দারজির গুনতিতে। আরও কত ঘটনা ভুলেই গেছেন তিনি। আর কুমির?  সর্দারজির কথায়, ৯-১০টা হবে। বেশি হলেও কম নয়।

কুরুক্ষেত্রের দাবখেরি গ্রামে একটেরে ছোট্ট বাড়ি। লাগোয়া কিছু জমিজমা আছে। আর একটা খাটাল। মোষের দুধ বেচেই সংসার চলে। জমি চষেও কিছু আয় হয়। পেট চালানোর রাস্তা এগুলোই। বাকি সময়টা উৎসর্গ করেছেন জনসাধারণের জন্য। হিংস্র কুমিরদের জন্যও বটে।

কুরুক্ষেত্র থেকে সাত কিলোমিটার পথে পড়ে জ্যোতিসর গ্রাম। এখানকার তিনটি বড় জলাশয় হল নরওয়ানা খান, সাতলুজ যমুনা খাল এবং সরস্বতী ড্রেন। এই খালগুলোতে কুমিরের আনাগোনা কিছু নতুন নয়। আর বর্ষার জলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে খাল বেয়ে কুমির ঢুকে পড়ে গ্রামে। তার একটা কারণও রয়েছে। কুরুক্ষেত্র থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরত্বেই রয়েছে ‘ভোর সদন ক্রোকোডাইল ব্রিডিং সেন্টার।’ কুরুক্ষেত্র-পেহোয়া রোড ধরে সেখানে যেতে হয়। সর্দারজির কথায়, ‘‘এই ব্রিডিং সেন্টার থেকে মাঝে মধ্যেই খাল বেয়ে কুমির ঢুকে পড়ে গ্রামে।  বহু মানুষের প্রাণ গেছে কুমিরের আক্রমণে। তা ছাড়া, খাল বিলের জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন অনেকে। কাজেই প্রশাসনের উপর ভরসা না করে গ্রামেই একজন দক্ষ ডুবুরি থাকা প্রয়োজন, তাই না!’’

গ্রাম লাগোয়া এক খালের জলে নিদের দাদুকে ভেসে যেতে দেখেছিলেন প্রগত সিং সান্ধু। তখন তাঁর কিশোর বয়স। জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টিতে খালের জল ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। চাষের জমি দেখতে গিয়ে জলে পড়ে যান দাদু। সাঁতার জানলেও প্রবল স্রোতে নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি। খালের জল ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাঁকে। বাঁচার জন্য জলের উপরে দাদুর ভেসে থাকা হাতটা মনে পড়লে আজও যন্ত্রণায় দুমড়ে মুচড়ে যান প্রগত। ডুবন্ত মানুষকে দেখলে তাই নিজেকে স্থির রাখতে পারেন না। সে যত বিপদসঙ্কুল পথই হোক, বা পরিবারের পিছু টানই হোক। মানবিকতার মোচড় হারিয়ে দেয় ব্যক্তিগত স্বার্থকে।

লম্বা, শক্ত সমর্থ, পেটাই চেহারা সর্দারজির। তাঁর সাহসের গল্প বলেন হরিয়ানার লোকজন। ‘ক্রোকোডাইল ডান্ডি’ নামটা এমনি এমনি হয়নি, বলেছেন গ্রামবাসীদেরই একজন। ওই খরস্রোতা খালের জলে ঝাঁপ দিয়ে কুমির ধরা কী চারটি খানি কথা! কুমির সঙ্গে সর্দারজিকে যাঁরা জলে যুদ্ধ করতে দেখেছেন তাঁরাই জানেন গোটা ব্যাপারটা। কারণ গ্রামবাসীদের দাবি, সেই সব কুমির-অভিযান ভাষায় ব্যাখ্যা করার মতো নয়। একটুও আঘাত না করে, দাঁতের খোঁচা আর বিশাল লেজের ঝাপটা না খেয়ে কুমিরদের জ্যান্ত জল থেকে তুলে আনাটা বোধহয় সর্দারজি ছাড়া আর কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। ডাঙায় তুলে সেগুলোর মুখ, লেজ বেঁধে কাঁধে চাপিয়ে একাই নিয়ে যান বন দফতরের অফিসে। কুমির-কাঁধে হাসি মুখের সর্দারজিকে দেখে কয়েকবার ভিরমিও খেয়েছিলেন বন দফতরের কর্মীরা। অবাক হয়েছিলেন কুমির সংরক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষিত কর্মীরাও। এখন ব্যাপারটা গা সওয়া হয়ে গিয়েছে।

ডুবন্তকে উদ্ধার করেছেন সর্দারজি। প্রশংসায় পুলিশ।

সর্দারজির কথায়, ‘‘মানুষের প্রাণ বাঁচানোটা যতটা জরুরি, এই বন্যপ্রাণেও ততটাই। ওরা হিংস্র হলেও, বুঝতে পারে আমি ওদের ক্ষতি করব না। শুধু ওদের উদ্ধার করছি। তাই হয়তো এত বছরে আমার কোনও ক্ষতি করেনি ওরা।’’

ডাইভিংটা শিখেছেন নিজে থেকেই। আলাদা করে কোনও প্রশিক্ষণ নেই। পুলিশ সুপার আস্থা মোদী জানিয়েছেন, শুধু মানুষ বাঁচানো নয়, জলের ভেতরে আটকে থাকা শবদেহও উদ্ধার করেন প্রগত সিং। পুলিশের হয়েও কাজ করেছেন। যদিও প্রশাসনের অধীনে চাকরি করার ইচ্ছা নেই তাঁর। পুলিশের সুপারের কথায়, ‘‘পেশাগত ডুবুরিকে দিয়ে শব তোলাতে গেলে অনেক টাকা দরকার হয়। এক একজন ডুবুরি প্রায় দেড় লাখ টাকা দাম চান মৃতের পরিবারের কাছ থেকে। কিন্তু, সর্দারজি বিনা পয়সায় এই কাজ করে দেন। আমরা জোর করলেও এক পয়সাও কখনও নেননি। আশ্চর্য ব্যতিক্রমী মানুষ!’’ তবে বর্তমানে সরকারি উদ্যোগেই তাঁকে ডুবুরির বিশেষ পোশাক ও বাকি সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার আস্থা মোদী।

গত বছর একটি পথ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন সর্দারজি আর তাঁর স্ত্রী। তবে তাতে মানুষ-বাঁচানোর কাজে ভাটা পড়েনি। বর্তমানে গ্রামেই একটি স্কুল খুলে ২০০-২৫০ জন বাচ্চাকে ডুবুরির প্রশিক্ষণ দেন সর্দারজি প্রগত। নিজেকে বাঁচানো এবং অপরের প্রাণ রক্ষা করার কৌশল শেখান মেয়েদের। সেই দলে আছে তাঁর তিন মেয়েও।

দুর্ঘটনার পরে পায়ে সামান্য চোট রয়েছে সর্দারজির। অতটা সাবলীল ভাবে এখন আর সাঁতার কাটে পারেন না। তাতেও কর্তব্যে ফাঁকি নেই। বলেছেন, ‘‘আমি শিখ। মানুষের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়াই আমার ধর্ম। যো বোলে সো নিহাল সৎ শ্রী অকাল।’’

আরও পড়ুন:

আত্মহত্যা রোখাই তাঁর কাজ, ১৫ বছরে বাঁচিয়েছেন ১০৭ জনকে, হায়দরাবাদের যুবককে চিনুন

Comments are closed.