উপসর্গ না থাকায় চেনা যাচ্ছে না অনেক করোনা রোগীকেই, কীভাবে বিপদ বাড়ছে জানালেন বিশেষজ্ঞ

উপসর্গ নেই বা সামান্য উপসর্গ রয়েছে এই রোগীরাই চিন্তার কারণ। বিশেষজ্ঞ বোঝালেন কীভাবে নিশ্চুপে ভাইরাস বাসা বাঁধছে শরীরে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সঞ্জীব আচার্য

    কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

    করোনার সংক্রমণ রয়েছে অথচ উপসর্গ নেই, এরকম রোগীদের থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি, এমনটাই বলেছেন দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীরা। উপসর্গ নেই অর্থাৎ সংক্রমণ বাইরে ফুটে ওঠার কোনও লক্ষণ নেই। অথচ ভাইরাস রয়েছে শরীরে। এমন রোগীদের বলা হয় ‘সাইলেন্ট কেরিয়ার’ বা ‘অ্যাসিম্পটোমেটিক কেরিয়ার’। এমন কোভিড রোগীদের থেকেই সামাজিক স্তরে বা গোষ্ঠী স্তরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

    ইউরোপ ও আমেরিকায় এমন‘অ্যাসিম্পটোমেটিক কেরিয়ার’বা উপসর্গহীন করোনা রোগীদের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। শুধু তাই নয়, এমন রোগীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেও থেকে যাচ্ছে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে (NEJM) এমনই একটি সমীক্ষার রিপোর্ট সামনে এসেছিল। যেখানে সিয়াটেলের একটি নার্সিংহোমের ডাক্তাররা বলেছিলেন, নার্সিংহোম ও তার সংলগ্ন এলাকায় বাসিন্দাদের অধিকাংশের মধ্যেই কোনও উপসর্গ নেই। অথচ তাঁরা কোভিড পজিটিভ। শুরুতে এই রোগীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে র‍্যাপিড টেস্টে তাঁদের কিছুজনকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। বাকিদের মধ্যে কয়েকজনের সংক্রমণের উপসর্গ অনেক পরে সামনে আসে। তখন টেস্ট করিয়ে দেখা যায় ভাইরাস বহুদিনই বাসা বেঁধেছে শরীরে। সংক্রমণও ক্রমশই গভীর থেকে গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে।

    উপসর্গহীন রোগী যেমন রয়েছে তেমনি সাধারণ সর্দি-জ্বরের লক্ষণ ফুটে ওঠা রোগীরাও রয়েছেন। এই ‘মাইল্ড-সিম্পটম’আশঙ্কার আরও একটা কারণ।  ‘ইমারজিং ইনফেকশিয়াস ডিজিজ’(EID) মেডিক্যাল জার্নালে গবেষকরা বলেছিলেন, উহানের এমনই একজন ডাক্তার যাঁর উপসর্গ ছিল খুবই সাধারণ, তাঁর সংস্পর্শে এসে পাঁচটি পরিবার সংক্রামিত হয়েছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, সংক্রামিতেরাও ছিল উপসর্গহীন।

    করোনাভাইরাস রয়েছে শরীরে অথচ উপসর্গ নেই এই ব্যাপারটা ঠিক কী?

    তার জন্য জানতে হবে এই উপসর্গহীন রোগী কারা।

    উপসর্গ নেই বা সামান্য উপসর্গ রয়েছে এই রোগীরাই চিন্তার কারণ

    যে কোনও ভাইরাস বা সংক্রামক জীবাণু যদি শরীরে ঢোকে এবং দেহকোষকে সংক্রমিত করা শুরু করে, তাহলে শরীরেও একটা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যেমন যদি ফ্লু ভাইরাস হয় তাহলে সর্দি-কাশি, জ্বর বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হবেন রোগী। এই উপসর্গ দেখেই বোঝা যাবে কী ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়েছে রোগীর শরীরে। চিকিৎসাও শুরু হবে তেমনভাবেই। সার্স বা মার্স ভাইরাসের সংক্রমণের সময়েও নির্দিষ্ট কিছু উপসর্গ দেখা গিয়েছিল রোগীদের মধ্যে। কিন্তু এই মারণ ভাইরাস সার্স-কভ-২ এমনভাবে নিজের জিনের গঠন বদলে ফেলেছে এবং মানুষের থেকে মানুষে সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য এমন কৌশল আয়ত্ত করেছে যে এই ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণের বাহ্যিক প্রকাশ অনেক ক্ষেত্রেই কম বা একেবারেই নেই।

    অ্যাসিম্পটোমেটিক কীভাবে হচ্ছে? শুরুতে দেখা গিয়েছিল সার্স-কভ-২ আরএনএ ভাইরাসের সংক্রমণে ‘সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম’-এ আক্রান্ত হচ্ছেন রোগী। এই সিন্ড্রোমে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে, সেই সঙ্গে রোগীর শরীরের তাপমাত্রাও বাড়তে থাকে। হাঁচি, কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বমিভাব এগুলো সাধারণ বাহ্যিক উপসর্গ। আবার এই ভাইরাসের প্রভাবে ‘অ্যাকিউট লাঙ ইনজুরি’ ও ‘অ্যাকিউট রেসপিরেটারি ডিস্ট্রেস সিন্ড্রোম’-এও আক্রান্ত হন রোগী। যেখানে পুরো শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়াই থেমে যেতে শুরু করে। কিন্তু যদি দেখা যায় কোনও এইসব কোনও লক্ষণই ফুটে ওঠেনি রোগীর মধ্যে, যেমন জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা শরীরে তীব্র প্রদাহ, বমিভাব কিছুই নেই, তাহলে তাকে বলা হবে উপসর্গহীন বাহক বা অ্যাসিম্পটোমেটিক। রোগ আছে অথচ প্রকাশ নেই। সরকারি তথ্য বলছে, ভারতে এমন অ্যাসিম্পটোমেটিক রোগীর সংখ্যা ৭০ শতাংশেরও বেশি।

    মাইল্ড-সিম্পটম কী? সাধারণ বা খুব কম উপসর্গ দেখা দেওয়া। যেমন হালকা সর্দি-জ্বর যা হামেশাই হয়ে থাকে, শুকনো কাশি ইত্যাদি দেখা গেলে মনেই হবে না করোনার মতো মারণ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। তাই সাবধান হওয়ার দরকারও পড়বে না। এমন মাইল্ড-সিম্পটম দেখা দেওয়া কোভিড রোগীরাও বিপদের বাইরে নন। অনেকক্ষেত্রে আবার প্রি-সিম্পটম দেখা দেয়, যেমন মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল জানিয়েছিল, বমিভাব, ভুল বকা, মাথাঘোরা এমনকি হাতে-পায়ে জ্বালাপোড়া র‍্যাশ বা ক্ষত দেখা দিলেও বুঝতে হবে ভাইরাস ঢুকে গেছে শরীরে।

    উপসর্গহীন রোগীদের চিহ্নিত করতে বিশেষ পরীক্ষা করেছিল সিয়াটেলের নার্সিংহোম

    গত মার্চ মাস থেকে এই পরীক্ষা চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটেলে। কিং কাউন্টির একটি নার্সিংহোমে রোগীদের সংক্রমণ পরীক্ষা শুরু হয়। উপসর্গহীন রোগীদের খোঁজ মেলার পর থেকেই এমন র‍্যান্ডম টেস্টিং শুরু হয় কিং কাউন্টিতে। দেখা যায় হাসপাতাল সংলগ্ন বসতি এলাকায় ৮৯ জন বাসিন্দার মধ্যে ৫৭ জন (৬৪%) কোভিড পজিটিভ। তাঁদের মধ্যে ২৭ জনেরই কোনও উপসর্গ নেই। কোয়ারেন্টাইনে পর্যবেক্ষণে রাখার পরে দেখা যায় তাঁদের ২৪ জনের মধ্যে ধীরে ধীরে উপসর্গ ফুটে উঠছে। তবে সেটা খুবই মৃদু।

    উপসর্গ ধরা পড়েছে যাঁদের, তাঁদের অবস্থা আবার সঙ্কটাপন্ন। প্রচণ্ড জ্বর, তীব্র শ্বাসকষ্ট, সেই সঙ্গে প্রবল কাশি, গলা ব্যথা।

    ইমারজিং ইনফেকশিয়াস ডিজিজ-এর একটি রিপোর্ট বলেছিল, ৩৯ বছরের একজন নেফ্রোলজিস্ট ভাইরাস আক্রান্ত হন জানুয়ারিতে। তখন শুকনো কাশি ছাড়া কোনও উপসর্গ ছিল না। ৭ ফেব্রুয়ারি প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। ১০ ফেব্রুয়ারি ধরা পড়ে তিনি করোনা আক্রান্ত। ডাক্তাররা বলেছেন, মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের বেঁচে থাকার সময় বা ইনকিউবেশন পিরিয়ড হতে পারে কম করে পাঁচদিন এবং বেশি ৭-১৪ দিন। আবার দেখা গেছে কোনও কোনও ক্ষেত্রে ইনকিউবেশন পিরিয়ড ৩৭ দিনেরও বেশি।

    সান ফ্রান্সিসকোর ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক মোনিকা গান্ধী, দেবোরা ইয়কো, ডায়ান হ্যাভলির বলেছেন, এই উপসর্গহীন রোগীরা বিপজ্জনক। কারণ এঁরা নিজেরাই বুঝতে পারেন না কখন সংক্রামিত হয়েছেন এবং রোগ ধরা না পড়ায় সংক্রমণ ছড়াতে থাকে ব্যাপক হারে। আশপাশের মানুষজনের মধ্যে কে সংক্রমিত আর কে সংক্রমিত নয়, সেটাই যদি আলাদা করে বোঝা না যায় তাহলে সতর্ক হওয়ার সময়টুকুও মেলে না। ভাইরাস কখন শরীরে ঢুকে পড়বে সেটা আঁচ করাও যাবে না। গবেষকরা বলছেন, উপসর্গহীন রোগীর থেকে সংক্রামিতেরাও বেশিরভাগই উপসর্গহীন। ফলে নিশ্চুপে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে এক শরীর থেকে অন্য শরীরে। সংক্রমণ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে যেমন ফুসফুস, লিভার, কিডনি বা হার্টে ছড়িয়ে পড়ছে ভাইরাস তখনই ধরা পড়ছে উপসর্গ। আচমকা হার্টঅ্যাটাক, কিডনির রোগ, ফুসফুসের সংক্রমণ বা খাদ্যনালীর সংক্রমণ ধরা পড়ছে। কিন্তু ততদিনে ভাইরাস এমনভাবে কোষগুলোকে কব্জা করে ফেলছে যে শরীর আর তার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না। ফলে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট বা অন্যান্য সম্ভাব্য থেরাপির প্রয়োগেও রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More