বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

চ্যালেঞ্জের ভোটে কোনও ঝুঁকি নয়, প্রায় অর্ধেক আসনেই প্রার্থী বদলালেন নেত্রী

শঙ্খদীপ দাস

দেওয়াল লিখন অনেক আগে থেকেই পরিষ্কার ছিল। এ বারের ভোট আগের সব ভোটের থেকে অন্যরকম। তাই আগের সূত্রও যে খাটবে না সেটাই দস্তুর। ফলে কোনও বিধায়ককে লোকসভা ভোটে প্রার্থী করা হবে না বলে অতীতে দিদি যে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেই ফর্মুলা যে তিনি নিজেই ভাঙবেন তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল ‘দ্য ওয়াল’

হলও তাই। মঙ্গলবার বিকেলে দলের লোকসভা ভোটের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বীকার করলেন, “এ বারের ভোট সত্যিকারেরই চ্যালেঞ্জ।” সে জন্য মোদী-অমিত শাহ জুটির ষড়যন্ত্রকে শাপ শাপান্তও করলেন দিদি। তার পর ৪২ টি আসনের জন্য যে প্রার্থী তালিকা পড়ে শোনালেন, তাতে দেখা গেল ১৭ টিই নতুন মুখ। সেই সঙ্গে নির্বাচন কেন্দ্র বদল হল মুনমুন সেনের। বিধায়কদের মধ্যে থেকে প্রার্থী হলেন, মহুয়া মৈত্র, আবু তাহের, অপূর্ব সরকার। মন্ত্রিসভা থেকে আনা হল পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় ও প্রতি মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরাকে। সেই সঙ্গে রাজ্যসভা সাংসদ মানস ভুইঞাঁকে প্রার্থী করা হল মেদিনীপুর লোকসভা কেন্দ্রে।

অর্থাৎ দ্য ওয়াল-এর পুর্বানুমানও ষোল আনা সত্যি প্রমাণিত হল। কারণ, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আগের সব ফর্মুলা ছুঁড়ে ফেলে বিধায়ক, মন্ত্রী এমনকি রাজ্যসভায় দলের সাংসদকেও টিকিট দেওয়ার কথা জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে ২৯৪টি আসনের মাত্র ১২টি আসনে প্রার্থী বদল করেছিলেন মমতা। শতাংশের বিচারে নগন্য। কিন্তু এ বার ৪২টিতে ১৭টি বদল। যা তৃণমূলের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এতো বিপুল সংখ্যায় প্রার্থী বদল করলেন তৃণমূলনেত্রী?

দিদি কেবল, পাঁচ জনের ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মেদিনীপুরে সাংসদ ছিলেন সন্ধ্যা রায়। তাঁকে পাশে বসিয়ে রেখে বলেছেন, “উনি মন দিয়ে লোকসভার কাজ করেছেন। তবে এখন বেশি ছোটাছুটি করা ওঁর পক্ষে মুশকিল। তা ছাড়া অন্য কিছু কাজও আছে।” আবার ঝাড়গ্রামের সাংসদ উমা সরেনকে দেখিয়ে বলেছেন, “ওঁকেও টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। উমা বাচ্চা মেয়ে। দলের হয়ে কাজ করতে চাইছে”। একই ভাবে যাদবপুর কেন্দ্রে প্রার্থী বদলের ব্যাপারে মমতা জানান, “সুগত বসু আমাকে জানিয়েছেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ভোটে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে তাঁকে অনুমতি দেয়নি।” এবং সবশেষে রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীর প্রসঙ্গে মমতা বলেন, “সুব্রতদা বলেছেন আমি দলের হয়ে কাজ করব। আমি আর ভোটে প্রার্থী হতে চাই না।”

তবে তৃণমূলের শীর্ষ নেতারাই বলছেন, এতো বিপুল সংখ্যায় প্রার্থী বদলের কারণ স্বাভাবিক ভাবেই প্রকাশ্যে দিদির পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আসল কারণ একেবারেই অন্য। তাঁদের কথায়, সুব্রত বক্সী যে লোকসভায় আর প্রার্থী হতে চান না তা নেত্রীকে বহু আগে থেকেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে বাদ দিয়ে প্রার্থী বদলের কারণ মূলত একটাই— যাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে স্থানীয় ভাবে বিপুল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছিল। এঁদের অনেকেই নিজের নির্বাচন কেন্দ্রে যেতেন না বললেই চলে। স্থানীয় সংগঠন ও নিচু তলার কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের বিচ্ছিন্নতা এতটাই বেশি ছিল যে দিদি বুঝতে পারছিলেন, এঁদের ফের প্রার্থী করলে ডাহা হারতে পারেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গত দুটি লোকসভা ভোটে বাংলায় রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল একেবারেই ভিন্ন। ২০০৯ সালের ভোটের সময়ে বামেরা অনেকটাই জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছিল। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের ভাবমূর্তি তখন উজ্জ্বল। তাদের সঙ্গে জোট করার ফলে সংখ্যালঘু ভোটের সিংহ ভাগই কংগ্রেস-তৃণমূলের উপর আস্থা রেখেছিল। তাতেই সোনা ফলেছিল। আবার ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের সময় রাজ্যে শক্তপোক্ত বিরোধী বলে কেউই ছিল না। বামেরা দুর্বল, কংগ্রেসের তথৈবচ অবস্থা, আর বিজেপি হম্বিতম্বি করলেও বুথ স্তরে সংগঠন নেই। এই ত্রহ্যস্পর্শে ৩৪ টি আসন জিতে নিয়েছিল তৃণমূল।

কিন্তু এ বার মোদী-অমিত শাহরা বাংলায় সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছেন। যেহেতু বাম ও কংগ্রেস রাজ্য রাজনীতিতে অনেকটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে, তাই বিরোধী রাজনীতির পরিসর প্রায় দখল করে নিয়েছে বিজেপি। ভোটে এক রকম মেরুকরণ হয়ে গিয়েছে—তৃণমূল বনাম বিজেপি।

বস্তুত সেই কারণেই এ বার প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলেছেন মমতা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সমীক্ষা চালিয়ে, গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে বার বার দেখা হয়েছে কাকে প্রার্থী করলে কোনও আসন জেতার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ উইনেবিলিটি বা জেতার ক্ষমতা বিচার করেই প্রার্থী করা হয়েছে।

তৃণমূলের তালিকা থেকে এও পরিষ্কার, চেষ্টা চরিত্র করেও বেশ কয়েকটি আসনে সর্বসম্মত কোনও স্থানীয় প্রার্থী পাওয়া যায়নি। যেমন বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্র। সেখানে শম্পা দরিপাকে প্রার্থী করার ব্যাপারে গোড়ায় ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তীব্র আপত্তি করেন জেলা সভাপতি অরূপ খাঁ। যাদবপুরেও কোনও সর্বসম্মত স্থানীয় প্রার্থী পাওয়া যায়নি। তাই অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তীকে প্রার্থী করেছেন দিদি। একই কারণে বসিরহাট আসনে প্রার্থী করা হয়েছে অভিনেত্রী নুসরত জাহানকে।

তৃণমূলের অনেকের মতে, আসানসোলে মুনমুন সেনকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তও তাৎপর্যপূর্ণ। ওই আসনে এক সময়ে বিজেপি-র বিক্ষুব্ধ সাংসদ শত্রুঘ্ন সিনহাকে প্রার্থী করার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তৃণমূল সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, শ্রম মন্ত্রী মলয় ঘটক বা আসানসোল পুরসভার চেয়ারম্যান জিতেন্দ্র তিওয়ারির মধ্যে কোনও একজনকে প্রার্থী করলে অন্তর্কলহের জন্য হারের মুখ দেখতে হতে পারে। শেষমেশ আর কাউকে না পেয়ে মুনমুনকেই প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেন দিদি।

Shares

Comments are closed.