শুক্রবার, আগস্ট ২৩

পাত পেড়ে খেয়েছিলেন অমিত, দিদি বললেন শুধু খেলে হবে না, ঘুমোতেও হবে

শোভন চক্রবর্তী

রাজু মহালিকে মনে আছে?

নকশালবাড়িতে এই আদিবাসী পরিবারের দাওয়াতে বসেই তো মুগডাল, পটল ভাজা, ধোঁকার ডানলা দিয়ে কলাপাতায় ভাত খেয়েছিলেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। সঙ্গে দিলীপ ঘোষ। সেটা ২০১৭-র ২৫ এপ্রিল। সে বার ভবানীপুরের এক বুথকর্মীর বাড়িতেও মধ্যাহ্নভোজ সেরেছিলেন শাহ। যে পাতে ভাত খেয়েছিলেন অমিত শাহ, দু’বছর তিন মাস পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজের দলকে হাঁটাতে চাইলেন অনেকটা সেই পথেই।

সোমবার নজরুল মঞ্চে দলের জেলা সভাপতি ও বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিক বৈঠক করেন তৃণমূলনেত্রী। সেখানেই তিনি জানান, এ বার থেকে জনসংযোগে দলের জনপ্রতিনিধিরা গ্রামে গ্রামে যাবেন। কথা বলবেন দলের কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে। শুধু সেটা করেই চলে এলে হবে না। কোনও এক বুথকর্মীর বাড়িতে বসে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করবেন। রাতে থাকতে হবে সেখানেই। তারপর গ্রাম বা পাড়া ছাড়ার আগে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা উত্তোলন করে তারপর আসবেন।

একেবারে কর্পোরেট কায়দার সাংবাদিক সম্মেলন। যদিও দিদি বলেছেন, এটা কর্পোরেট নয়। তৃণমূলের আধুনিকীকরণ। সনাতন কংগ্রেসি রাজনীতিতে এই রেওয়াজ অনেক পুরনো। আরএসএস-এর নেতারাও গ্রামে গ্রামে মানুষের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন। অতীতে দেখা গিয়েছে বাম ট্রেড ইউনিয়ন বা কৃষক নেতারাও রাত কাটিয়েছেন কোনও কারখানার শ্রমিক বস্তিতে অথবা কোনও ক্ষেতমজুর মহল্লায়। কিন্তু এ সবই ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। কোনও ঢক্কানিনাদ না করে। কেউ জানতেও পারত না। এখন অবশ্য অমিত শাহ পাত পেড়ে বসলে তাক করা থাকে এক ঝাঁক ক্যামেরা। দেখা গিয়েছে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী মহারাষ্ট্রের বিদর্ভে কলাবতীর বাড়িতে গিয়ে পাত পেড়ে খেয়েছিলেন। এ বার সেই পথেই জনপ্রতিনিধিদের হাঁটাতে চাইলেন দিদি। সৌজন্যে প্রশান্ত কিশোর।

টার্গেট বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আগামী ১০০ দিনের মধ্যে এক হাজার জনপ্রতিনিধি ১০ হাজার গ্রামে যাবেন। দিদি এ-ও বলে দিয়েছেন, “কেউ ইচ্ছে মতো যেতে পারবেন না। কাকে, কী ভাবে কোথায় পাঠানো হবে, তা স্টেট হেডকোয়ার্টার ঠিক করবে।” তাঁর কথায়, “শহরে-প্রান্তরে, গ্রাম-গ্রামান্তরে, জেলা-জেলাস্তরে জনসংযোগের নতুন মাধ্যম শুরু হল।”

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলার গ্রামে রাত কাটানো শুরু করেছিলেন আরএসএস থেকে উঠে আসা বিজেপি নেতারা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস মেঘওয়ালকে দেখা গিয়েছে কেশিয়াড়িতে রাত কাটাতে, অরবিন্দ মেননকে দেখা গিয়েছে জলপাইগুড়ির গ্রামে গিয়ে থাকতে। নকশালবাড়ি থেকে যা শুরু করেছিলেন অমিত শাহ। এ বার সেই রাস্তাতে তৃণমূল। দিদি জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও জনপ্রতিনিধি তাঁর কেন্দ্রের বাইরে যাবেন না। নিজের কেন্দ্রেই তাঁকে এই কাজ করতে হবে।

বিজেপি আরএসএস না হয় বাংলায় ক্ষমতায় নেই। কিন্তু আট বছর রাজত্ব করার পর বাংলায় আবার নতুন করে জনসংযোগ শুরু করতে হচ্ছে কেন?

লোকসভার ফলে স্পষ্ট, গ্রাম-গ্রামান্তরে জনবিচ্ছিন্ন তৃণমূল। অনেক জায়গায় দলের নিচু স্তর থেকে মাঝারি নেতাদের মানুষের সঙ্গে তো যোগাযোগ নেই-ই, তার উপর আবার দলের কর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই।  বিপর্যয়ের পর তাই পিকে-র শরণাপন্ন হয়েছে দল। চোদ্দর ভোটে মোদীর পালে হাওয়া লাগানো ভোট কৌশলীও যেন একই কায়দায় তৃণমূলের পালে হাওয়া ফেরাতে চাইছেন। যদিও মমতা এ দিন বলেছেন, “ইলেকশন এখনও পৌনে দু’বছর বাকি। তাই এটা কোনও ভোটের প্রচার নয়। এটা জনসংযোগের নতুন মাধ্যম।”

তৃণমূলের নেতাদের বুথকর্মীর বাড়িতে খাওয়া এবং রাতে থাকার এই কৌশল শুনে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিজেপি। বঙ্গ বিজেপি-র অন্যতম সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, “তৃণমূলের নেতারা তাঁদের কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে থাকবেন, খাবেন, এতে আমাদের কী বলার থাকতে পারে!  কিন্তু এমন অনেক গ্রাম রয়েছে, যেখানে থাকা খাওয়ার জায়গাই পাবেন না তৃণমূল নেতারা। এটাই দুঃখের।”

আরও পড়ার জন্য ক্লিক করুন www.thewall.in-এ

Comments are closed.