মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

গন্ধে, বর্ণে, ছন্দে, রীতিতে ফুরফুরে কুম্ভনগর

শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য
প্রয়াগরাজ

 

পৌষী পূর্ণিমার যোগের স্নান হয়ে গিয়েছে নির্বিঘ্নে। সংখ্যাটা এক কোটি ছাড়িয়েছে। সারা কুম্ভনগর জুড়ে একটা ফুরফুরে আবহাওয়া। আমিও বিকেলের দিকে হালকা মেজাজে মানুষ দেখছি। ‘ওই………শক্তি………’ একটা আওয়াজে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখি দীপক। আমার ছোটবেলার স্কুলের সহপাঠী। ছোটবেলা থেকেই দীপক একটু ডেঁপো ছিল। ওর চুলের স্টাইলের জন্য অনেকবার মার খেয়েছে মাস্টারমশাইয়ের কাছে। পড়াশোনায় মাথা ভালো ছিল, কিন্তু একদম পড়তে চাইত না।

মাধ্যমিক দেওয়ার পর দীপক ব্যানার্জী আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেল। কারণ, ও বিয়ে করে ফেলেছে। সেই দীপক, কতদিন বাদে দেখা। শুনেছিলাম নাতি-নাতনি নিয়ে দীপকের এখন জমজমাট সংসার। ওর এলাকারই একটি জনপ্রিয় কালীমন্দিরের পূজারী এখন দীপক। আয় ওর ভালোই।

— আর বলিস নি, খুব বিপদে পড়েছি।
— কেন রে, কী হলো। গলায় রুদ্রাক্ষ সহ অনেক হার পরিহিত। তার সঙ্গে ধুতি পরা দীপকের দিকে আড়চোখে তাকালাম।
— ওরে মাথা আমার খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
— কী হলো তোর বলবি তো! হাতে ধরা একটা বাচ্চা মেয়েও রয়েছে।
— এই এর জন্য। উফ্‌, আমি কোথায় খুঁজি বলতো।
— হুম। একটু সন্দেহের সঙ্গে বললাম, কে এটা?
— ওরে এটা আমার নাতনি।
— তোর নাতনি!
— ইনি এখন ফুচকা খাবেন। নিয়ে আসার সময় বলেছিলাম, ভারতের সবচেয়ে বড় মেলা। কত জিনিসপত্র, কত খাওয়া। এখন না পারি কোনও জিনিস কিনে দিতে, না পারি ফুচকা খাওয়াতে।
— কতদূর খুঁজলি?
— হেঁটে পা ব্যথা হয়ে গিয়েছে। লেপ-কম্বল আর জামা-কাপড়ের দোকান। খাবার বলতে চা-বিস্কুট আর ফলের দোকান।
— হ্যাঁ রে মা, ফুচকা খাবি? আজ দাদুকে ছেড়ে দে। কাল আমি তোদের নিয়ে নদীর পশ্চিমপাড়ে গিয়ে ফুচকা খাওয়াব। নাতনি বলে কথা।

মনে পড়ে যাচ্ছে, আমার বাড়ির বিচ্ছু-মহাবিচ্ছুটার কথা। এ তো আমার বুড়িয়ারই বয়সী, ক্লাস সেভেন-এ পড়ে।

দীপকের সঙ্গে অনেক কথা হলো। ওর গুরুগিরির কথাও বলল। সেই কারণেই ওর এখানে আসা। তবে এখন গুরু হলে কী হবে, চ্যাংরামিতে ও আগের মতোই আছে।

মজা করে বললাম, হ্যাঁ রে হজ করলে তো হাজি হয়। কুম্ভে স্নান করে গিয়ে কি তুই কুম্ভকর্ণ হবি?

হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়িয়েছি নদীর ধারে। এখনও অনেক মানুষ এসে যাচ্ছেন। এই বিকেলেও অনেকে স্নান করছেন। অনেকে মাথা মুণ্ডন করছেন। সারাদিন ধরে বহু নাপিতদের দেখেছি। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এত নাপিত প্রয়াগরাজে নেই। বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন। তবে নির্দিষ্ট ঘাটের জন্য পাকাপাকি ভাবে নাপিতরা সারাবছর ধরে থাকেন। তাঁরা আছেন। এই কুম্ভের সময় তাঁরা সামলাতে পারবেন না বলে অন্যদের অনুমতি দেওয়া হয়। দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এঁরা অনেক বছর ধরে আসছেন। এঁদের পূর্বপুরুষরাও আসতেন। বাপ রে! বংশ পরম্পরায় আসা নাপিত। প্রয়াগে সবই পরম্পরা। কেন এত মানুষ এখানে মাথা মুণ্ডন করে জানতে গিয়ে বাংলা একটা প্রবাদ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন অধিকারীবাবু।

প্রয়াগে মুড়ায়ে মাথা
মরগে পাপী যথা তথা।

প্রয়াগে মস্তকমুণ্ডন করলে মহাপাপীর পাপ ক্ষয় হয়। তাঁর মৃত্যুকালীন ভয় যন্ত্রণা আর থাকে না, এটাই বিশ্বাস।

অধিকারীবাবু বহু বছর ধরে ভারত সেবাশ্রম সংঘের স্বেচ্ছাসেবক হয়ে বর্ধমান থেকে আসছেন।

অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছি। একটু চায়ের প্রয়োজন। লাল চা হবে না। যদিও বা করে দেয়, দানা চায়ে ঘোলাটে গাঢ় এমন একটি বস্তু হাতে এসে পড়ে, তার চেয়ে দুধ চা খাওয়া ভাল।

বেঞ্চে বসে আমার মতো অনেকেই চা পানে মশগুল। সবাই বেশ ফুরফুরে। আসলে স্নানটাই তো আসল। সেটা যখন হয়ে গিয়েছে, তখন আর এটা দর্শন-ওটা দর্শনের তাড়া নেই।

পাশে বসা বৃদ্ধ মানুষের গোঁফ জোড়াটা বেশ। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে বেশ লাগছে। কথা-বার্তায় আলাপ জমে উঠল। উনি কবীরপন্থী। বাড়ি গোরখপুর জেলায়। নাম বিনোদ দাস, বয়স ৬৮, খেতিবাড়ি করেন। কবীরের বিভিন্ন ধর্মসভায় নিয়মিত শুনতে যান। ওনাদের গ্রামের কবীরপন্থীদের যে দল আছে, সেখানকার কয়েকজন মিলে এসেছেন একটা গামছা আর একটা কম্বল কাঁধে ফেলে। বেশ ভালো কথা বলেন। — সুবে সে রাত তক গঙ্গা মাইয়া কা প্রসাদি হর জায়গা মে মিলতা হ্যায়। শোনে কে লিয়ে ভি বহুত আখাড়া হ্যায়। আপনা কম্বল লেকে লেট যাও।

বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর কবীরপন্থী মানুষটা জীবন সম্বন্ধে যা বললেন, তা শুনে ওনার দিকে চেয়ে রইলাম।

হাস বোল খাপা
না হো কিসি সে
দুনিয়া কা দুনিরীতি নাফা
না হো কিসি সে।।

হিন্দিতে যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তার বাংলা করলে দাঁড়ায়- এই জগতের অন্য নাম দুনিয়া অর্থাৎ দুই নিয়া। দুই মানে দ্বন্দ্ব। ভালো-মন্দ, আলো-আঁধার এখানে থাকবেই। কারও কথায় ক্ষুব্ধ হবে না। যে ভুল করল, তার জমার ঘর শূণ্য। আনন্দে থাকো, শান্তিতে থাকো। আকাশের চাঁদের মতো অকৃপণ ভাবে আলো ও ভালো বিতরণ করে যাও, যে ভুল করল সে অজ্ঞান। এই ভেবে ব্যথা ভুলে যাও।

রামকৃষ্ণ মিশনের বইয়ের স্টলে আলাপ হলো মহারাষ্ট্রের কোলাপুর থেকে আসা দিলীপ পাঙ্গের সঙ্গে। এম.কম, এল.এল.এম, এফ.সি.এস ডিগ্রি নিয়ে তিনি এখন একটি বড় কোম্পানির সেক্রেটারি। প্রতি বছর নিয়ম করে কুম্ভে আসেন। রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্য। নিয়মিতভাবে ১৭ বছর ধরে বেলুড় মঠ ও কল্পতরু উৎসবে যাচ্ছেন। কুম্ভের মানুষ নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই, যতটা বিশ্বাস আছে তিথি মেনে কুম্ভস্নানে। বিবেকানন্দ নিয়ে চর্চা করেন, কিন্তু বাকি আখড়া ঘুরে দেখা বা অন্যান্য কিছুতে উৎসাহ নেই। বললেন, একটাতেই তিনি বিশ্বাসী।

মিশনের এখানে যাঁরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন, তাঁরা সকলেই বেশ প্রতিষ্ঠিত। খুব সাধারণ মানুষ এখানে নেই। প্রতি ভোরে ও সন্ধ্যায় এনারা রাস্তার ধারে অস্থায়ী মন্দিরে যান, প্রার্থনা করেন। বাকি সময় মন্দিরটি ফাঁকা থাকে। মন্দিরের মধ্যে বসে প্রতিদিন বিবেকানন্দ দেখেন মূর্খ-দরিদ্র-চন্ডাল ভারতবাসী লাখো লাখো হেঁটে যাচ্ছেন। মোটা দড়ির ব্যারিকেডটা পেরিয়ে কেউ এদিকে আসতে পারছেন না।

মায়ে ব্যাটার সংসার বাবলুদের। মায়ের পায়ে বাতের ব্যথা, ভালো করে হাঁটতে পারেন না। বাবলু গোন্দলপাড়া জুটমিলে একটা কাজ জুটিয়েছিল, সেটা এখন বন্ধ। বাবলুর কাঁধে ব্যাগ, আর এক হাতে মাকে ধরে নিয়ে চলেছে। চলতে চলতেই মায়ের জোরে আওয়াজ বা-ব-লু। বাবলু ব্যাগ মাটিতে নামিয়ে বসে পরে মায়ের পা ম্যাসাজ করে।

— হয়েছে, হয়েছে রে বাবা।
— যেতে পারবে তো।

আবার দুজনে উঠে দাঁড়ায়। আবার হাঁটতে থাকে। ঠিক এইভাবে থেমে থেমে চলে বাবলুদের সংসার। বাতের ব্যথার মতো মিলের লক আউট মাঝে মাঝে বাবলুকেও আটকে দেয়। আবার ধার-দেনা নামক মলম দিয়ে বাবলু সচল রাখে সংসারকে। মায়ের পায়ের ব্যথা আর জুটমিলের সচলাবস্থার জন্যই প্রয়াগে ডুব দিতে আসা।

জগদ্দলের বিষ্টু গড়াই-এর সাথে পরিচয় হলো। বেশ মজার মানুষ।

— দাদা, আপনার কুম্ভে আসা কেন?
এদিক ওদিক দেখে নিয়ে বলল— গাঁজা খেতে। খুব মস্তি বুঝলেন।
— আর কিছু নয়।
— হ্যাঁ আছে। চরস কেনার পয়সা নেই। একটা মটর দানার মতো চরসের দাম ২৮০০ টাকা। কোথায় পাব বলুন তো। এখানে বাবাজিদের দয়ায় জুটে যায়।
— এসবের জন্য এখানে।
— দাদা নামের শেষে কী আছে বলুন তো? গড়াই। শান্তিতে এসব খেয়ে গড়ানোর জায়গা আর আমি পাইনি।

সব মানুষেরই আশ্রয় এই অমৃতকুম্ভ। অমৃতের অন্য নাম অম্ব। অম্বকে যে ধারণ করে সে কুম্ভ। হাজার হাজার বছর পূর্বে প্রাজ্ঞ ঋষিদের পরিকল্পনায় বৌদ্ধিক বলসম্পন্ন দেবতা জাতি ও শারীরিক বলসম্পন্ন অসুর জাতি সংসার সমুদ্রকে মন্থন করেছিলেন নাগরূপী জ্ঞানের রজ্জু দিয়ে। মানুষের মুক্তির পথ জ্ঞানের সন্ধানে।

কুম্ভমেলা সম্বন্ধে ভাবতে গিয়ে একটা বইয়ের কথা মনে পড়ছে। বাৎস্যায়নের কামসূত্র। ভারতবর্ষের সংস্কৃতিকে জানার অপরিহার্য গ্রন্থ। তাতে লেখা ছিল, মানুষের জীবনের তিনটি কর্তব্য, ধর্ম, অর্থ ও কাম। এখানে এসে দেখলাম সেই সংস্কৃতি কেমনভাবে প্রযোজ্য এখানে। শেষ থেকে একটা একটা করে ত্যাগ করছে মানুষরা। তিনটি ছাড়লেইও তো দেবত্ব। কাম ছেড়ে দেওয়া বহু মানুষের ভিড় এখানে, বয়সের হিসাব তাই বলে। অর্থ পুরোপুরি ছাড়তে না পারলেও দানের মধ্যে দিয়ে ত্যাগের প্রচেষ্টা চলছে। আর ধর্ম- সে তো শুধু হিন্দুধর্মের কথা নয়, মানবধর্মের প্রতিপালন, যতদিন প্রাণ ততদিন তো করতেই হবে।

ভাণ্ড মানে এখানে এসে মনে হলো, এটা উদরের কথা বলা হয়েছে। পুজায় কলসি ভর্তি করা হয় জল দিয়ে, তাকে উদর হিসেবে ধরা হয়। সকালে এক নাঙ্গা সাধুবাবার সঙ্গে গল্প করছিলাম। তিনি বললেন, উদরই সব রে। পুরো পৃথিবীর মাথাটা আকাশ, আমরা বাস করি উদরে, আর পাতাল হলো পা বুঝলি।

আমি বললাম, আমার উত্তর পেয়ে গিয়েছি। সেই উদরের জন্যই বিহারের গরিব এতো শ্রমিক রাস্তা তৈরি করছে, হাজার হাজার আখড়ায় রান্না আর বাসন মাজছে কত নিরন্ন মানুষ, রোদে চামড়া কালো হয়ে যাওয়া হাজার হাজার ভিখারি…….

আরে সেই জন্যই তো আমি নাঙ্গা মানে ফৌজ। বাংলায় সত্তরের দশকে তাই তো অস্ত্র ধরেছিলাম। এই পূর্বাশ্রম বলে ফেলছি। তুই ঠিকই বলেছিস, উদরটাই কুম্ভ। একগাল হেসে বললেন, সব গণ্ডগোল করে দিবি। তুই ভাগ শালা।

আরও পড়ুন 

পৌষী পূর্ণিমার যোগের মহাস্নান

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Shares

Comments are closed.