রবিবার, মার্চ ২৪

পৌষী পূর্ণিমার যোগের মহাস্নান

শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য
প্রয়াগরাজ

সাধু দেখলেই যে সাথে সাথে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে নুইয়ে পড়ি, এমন নয়। বিশেষ করে যদি সেই সাধুবাবা নাঙ্গা সাধু হয়ে থাকে, তাহলে ভয়ে একটু এড়িয়ে থাকি। সাধুদের আখড়া থেকে এসে আবার একা বসে ভাবি, আরে সাধু হলে কী হবে, আসলে তো মানুষ। কিন্তু তালগোল পাকিয়ে ফেলি। সে বার হরিদ্বার কুম্ভমেলায় একটু বেশিদিন ছিলাম। অনেকদিন ধরে সাধু দেখব বলে। ছোটবেলায় দিদিমার কাছে শুনেছিলাম, এই কুম্ভমেলায় এমন সাধু আসেন, যাঁর পা স্পর্শ করলে শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। সে বার বিপ্লবকে নিয়ে আমি প্রায় ২০০ সাধুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলাম, কিন্তু কোনও বিদ্যুৎ খেলেনি।

গতকাল সন্ধ্যাতেও আমি আর ‘এই সময়’ কাগজের অশোক কুমার কুণ্ডু মানে অশোকদা দুজনে ঘুরছিলাম। অশোকদার এটা নিয়ে ১৫টা কুম্ভে আসা হলো। কুম্ভ নিয়ে অশোকদার অনেক পড়াশুনা। আমার নিজের অনেক কৌতূহল অশোকদা মিটিয়ে দেন। পঞ্চায়েতি মহানির্বানী আখড়ায় দু’জনে প্রবেশ করে এক নাঙ্গা ( প্রচলিত নাগা, এটি ঠিক নয় ) সাধুবাবার ডাকে আটকে গেলাম। ছাইভস্ম মাখা, বিশাল জটা, সৌম্যশান্ত চেহারা। ডাকটায় খুব আন্তরিকতা ছিল।

— কাঁহা সে আয়ে হ্যায়?
— কলকাতা।
— কলকাতা মে কাঁহা রহতে হ্যায়?
— সাইড মে। ভদ্রেশ্বর, হুগলি জিলা।
— অন্দর মে আ কে ব্যায়ঠো।

অশোক ইশারায় বলল, জুতো খুলি বসবি চল।

একগাল হেসে বললেন-

যো আনন্দ হ্যায় ফকিরি মে
ও আনন্দ নেহি হ্যায় আমিরি মে।।

মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, আপনি তো আমিরি ব্যাপারটাই বোঝেন না। তার আনন্দ কী করে বুঝবেন? ফকিরিটা আপনি বুঝতে পারেন। সংযত হলাম।

— আপ কা সন্ন্যাস নাম? অশোকদা জিজ্ঞাসা করলেন।
— দিগম্বর উদয়গিরি।
— গুরুজি কা নাম?
— গুরু ভরতগুরু মহারাজ।
— কউন মরহি?
— দশ মরহি।

কথা বলার সময় ভীষনভাবে বাংলা এসে যাচ্ছিল সন্ন্যাসীর। বারবার বলতে চাইছিলেন, বাংলা তো পুণ্যভূমি। কত সাধক জন্মগ্রহণ করেছেন ওখানে। এখন তো আর কোনও সাধককেই দেখি না বাংলায়।

কৌতূহল চাপতে না পেরে বলেই ফেলি, ‘আপনি বাঙালি?’ আবার একগাল হেসে বাংলায় বললেন, ‘হ্যাঁ রে, শরীরটা বাংলার। এটাকে অস্বীকার করি কী করে।’

ভাষা সম্পর্কের সব আগল খুলে দিল। গড়গড় করে বাংলায় আলোচনা শুরু হলো। শঙ্করাচার্য, দশনামী সম্প্রদায়, আখড়া, নাঙ্গা সন্ন্যাসী, শাহী স্নান, সাধুদের জীবন প্রণালী, সারা বছর কীভাবে কাটে, সব। যে প্রশ্নের উত্তর এতদিন ঠোঁটের গোড়ায় নিয়ে ঘুরছিলাম, তার সমীকরণের সমাধান সহজভাবে করে দিলেন। খুব দাদা বলে ডাকতে ইচ্ছা হচ্ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল আমার চেয়ে দু-চার বছরের বড় হবেন। ডাকা হলো না দাদা বলে।

ভালবাসা প্রকাশের চোখদুটো আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এই প্রথম সাধুবাবাকে স্পর্শ না করেও অনুরণন হলো। চোখ আর মুখ দিয়ে আমায় বললেন, ‘এখনও তো দুদিন আছিস। আসিস আবার।’

ফিরে আসার সময় পিছন ফিরে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, ‘তুমি তো শুধু আমির নও, তুমি আমিরের আমির।’

মহানির্বানী আখড়ায় শুনলাম, কাল শাহী স্নান হবে না। অর্থাৎ কোনও জুলুস বা শোভাযাত্রা বেরাবে না। কুম্ভে সাধুদের রাজকীয় শোভাযাত্রা একটা বড় আকর্ষন।

বাড়ি থেকে বেরনোর আগে পঞ্জিকা, বই-পত্তর, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদি থেকে জেনেছিলাম, পৌষী পূর্ণিমায় শাহী স্নান হবে। একটি কুম্ভে অনেকগুলো তিথি মেনে স্নান হয়। দিগম্বর উদয়গিরি মহারাজের আলোচনা, শাহী স্নান না হওয়া, দশনামী সম্প্রদায়ের কৌতূহল, সব নিয়ে রাতে আবার বইপত্তর আর সারাদিনের লেখা নোট নিয়ে বসে যেগুলো বুঝতে পারলাম সেগুলো হলো-

সনাতন বৈদিক ধর্মের পুনঃপ্রবর্তক ছিলেন শিবাবতার শঙ্করাচার্য। তিনি শুধু তর্কশাস্ত্র নয়, গণিত ও জ্যোতিষেও ছিলেন মহাপণ্ডিত। বৃহস্পতি গ্রহের গতিছন্দে কুম্ভের কাল এমনভাবে নির্নয় করেছিলেন, যেন নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে তাঁর চারজন মঠবিশ এবং দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা মিলিত হতে পারেন ওই চারটি তীর্থে। এই মিলনমেলাই আজকের কুম্ভমেলা।

দশনামী সম্প্রদায় হলো সন্ন্যাসীদের পূর্বজীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবনের দশভাগ। সরস্বতী, পুরী, বন, তীর্থ, গিরি, পর্বত, ভারতী, অরণ্য, আশ্রম ও সাগর, এই দশ নামে বিভক্ত। প্রত্যেক সন্ন্যাসীর নামের শেষে এর একটি ব্যবহৃত হয়। এছাড়া পুরো সন্ন্যাসীদের সাতটি আখড়ায় ভাগ করেন। এগুলি হলো- মহানির্বানী, নিরঞ্জনী, জুনা, আবাহন, অটল, আনন্দ ও অগ্নি।

প্রতি আখড়ায় উপাস্য দেবতা আলাদা। এই সাতটি আখড়ায় শুধুমাত্র নাঙ্গা সন্ন্যাসী থাকেন। যে সমস্ত সন্ন্যাসীরা জীবনের সব ত্যাগ করে হিন্দুধর্মকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করেন, তাঁরাই নাঙ্গা সন্ন্যাসী ( আসলে নাঙ্গা মানে ফৌজ। যদিও এঁরা এখন অস্ত্র ছেড়ে শাস্ত্র চর্চা করেন )। সময়ের সাথে সাথে এখন আখড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই সাত আখড়া ছাড়া আর কোনও আখড়ায় নাঙ্গা সন্ন্যাসী নেই।

বৃহস্পতিবার মেষরাশি অবস্থানের সময়, রবি ও চন্দ্র মকর রাশিতে অবস্থানকালে অমাবস্যা তিথিতে প্রয়াগে কুম্ভযোগ হয়ে থাকে। তাহলে এ বার মৌনী অমাবস্যাই প্রধান যোগ। বাকি যোগে স্নানগুলো থাকলেও তাকে শাহী স্নানের মর্যাদা দেওয়াটা আখড়ারা ঠিক করেন। অতএব পৌষী পূর্ণিমায় শাহী স্নান না হওয়ার জট অনেকটা কেটে গেল।

প্রয়াগের মাহাত্ম্য হলো, প্রজাপতি ব্রহ্মা বেদ লাভের জন্য এই স্থানে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। তাই এর নাম প্রয়াগ। প্রয়াগ প্রজাপতির স্থান বলে তিন লোকে বিখ্যাত। ইহা স্মরণ করলেই সব পাপ ক্ষয় হয়। ইহার মৃত্তিকা দর্শনেই পাপমুক্তি ঘটে এবং এখানে অবগাহনমাত্রই সব পাপ মুক্ত হয়।

কুম্ভমেলা, যাকে ঘিরে বিশ্বে এত উন্মাদনা, যার জন্য সরকার এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, সেই মেলার মূল স্থল হলো গঙ্গার মাঝের বিস্তীর্ণ চর, যাকে ২০টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। মূলত, সাধু-সন্ন্যাসী ও আখড়ার জন্যই এই কুম্ভনগর। কুম্ভনগরে পৌষী পূর্ণিমার সকাল থেকে তেমন উন্মাদনা নেই। বিভিন্ন আখড়ায় স্থান পাওয়া ভক্তবৃন্দের দল পুণ্যের লোভে স্নানে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের নাগাল ছাড়া, না বোঝা এক দুর্ভেদ্য দুর্গের মধ্যে কুম্ভনগর। লাখ লাখ মানুষ কাতারে কাতারে ওখানে ঘুরে বেড়ান। সাধু দর্শন করেন, প্রণামী দেন, কিন্তু বাকি এর রহস্য থেকে অনেক দূরেই থাকেন। বোঝা হয়ে ওঠে না, কুম্ভমেলা সাধুদের তো বটেই, কিন্তু কতটা সাধারণ মানুষের।

ত্যাগে নৈকে অমৃততে মানওঃ

এও এক বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস সব হেলিয়ে দিয়ে উথাল পাথাল করে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, গৃহী-সন্ন্যাসী সকলে এক ধর্মের নামে এক ক্ষেত্রে, এক উদ্দেশ্যে মিলিত হন প্রয়াগ তীর্থে।

পৌষী পূর্ণিমার সকালবেলা কুম্ভনগর থেকে গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে এসে ধারনাটা পুরো পালটে গেল। মনে পড়ে গেল, মকর সংক্রান্তির দু’কোটি মানুষের স্রোত তো সাধুদের ছিল না, ছিল মানুষের। পৌষী পূর্ণিমায় শাহী স্নান না হলেও সেই স্রোত চলেছে সঙ্গমের রাস্তায়। তাঁদের প্রার্থনা, ‘হে মা গঙ্গা ও যমুনা, তুমি আমাদের পবিত্র করো, মলিন্য দূর করো। তোমার বারি স্পর্শে আমাদের শরীরের ৩২ হাজার রোমকূপ দিয়ে জাগরিত করো তোমার পবিত্রতা, তোমার উর্বরতা।

অমৃতকুম্ভের মানে আমার কাছে পালটে যাচ্ছে। মানুষের প্রথম ঘর বাঁধা তো নদীর ধারে। নদীতেই তো প্রথম প্রাণ, বেঁচে থাকার মন্ত্র। তাকে পরম্পরাগত সম্মান জানাতেই কি তবে এই স্নান? এই কোটি কোটি মানুষগুলোকে একটু ধর্মের খোঁচা দিয়ে ঘুরিয়ে নদীগুলোকে বাঁচানো যায় না? কুম্ভমেলার মতো আদর্শ জায়গা আর কোথায় আছে নদীকে বাঁচানোর জন্য। এই কোটি মানুষের স্রোতই কিন্তু পারবে। বড্ড মনে পড়ছে বাউলদের কথা। ওরা দেহটাকে ভাণ্ড ভাবে। সত্যিই তো, প্রতিটি দেহই তো ভাণ্ড বা কলস। তাকে পূর্ণ করো নদীমাতা। পূর্ণ করো ক্ষমতার ত্যাগে, বীরত্বে, ভালবাসায় ও অমৃতে। এতদিনে বুঝতে পারছি, হে নদী, তুমিই তাহলে অমৃতময় কুম্ভ বা কলস।

আরও পড়ুন 

পুণ্যস্নানের প্রস্তুতিতে কুম্ভনগর

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Shares

Comments are closed.