বুধবার, মার্চ ২০

পুণ্যস্নানের প্রস্তুতিতে কুম্ভনগর

শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য
প্রয়াগরাজ

রাতে আশ্রয় পেয়েছি কুম্ভনগরের সেক্টর ১৫, শঙ্করাচার্য মার্গের রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রমে। এ বারে মিশনের এই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন প্রয়াগরাজ মানে এলাহাবাদের সুঠিগঞ্জের রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম। আমাদের থাকার তাঁবু নামে পরিচিত বড় প্যান্ডেলে ৫০ জন একসঙ্গে রয়েছি। মাটিতে খড় বিছিয়ে কম্বল পাতা। আর গায়ে দেওয়ার দুটো করে কম্বল। পাশাপাশি শুয়ে একদল অচেনা মানুষ। এখন ক’দিন এক পরিবারের লোক।

রাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। হঠাৎ ঝমঝম শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। আমাদের তাঁবুর ঠিক মাথার উপর দিয়ে মস্ত মেল ট্রেন চলেছে ঝমঝম শব্দ করে। এতকাল লখনউ বা দিল্লি যাওয়ার সময় গঙ্গা দেখতে ট্রেনে বসে এই পথ কতবার পেরিয়েছি। আজ ট্রেন উপর দিয়ে চলেছে, আর আমি শুয়ে ট্রেনের তলায়। সারারাত ধরে প্রহরে প্রহরে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে জানান দিয়ে যাচ্ছে, আমি শুয়ে আছি গঙ্গার চরে, এক অস্থায়ী নগরে। যে নগর ময়দানবের তৈরি নয়। এ নগর ভক্তমানবের কুম্ভনগর।

কুম্ভনগরকে যে ভাবে তৈরি করে যত রকম সুবিধা দেওয়া হয়েছে, এই সুবিধা আমাদের ওখানে নগরে নেই। কয়েক স্কোয়্যার কিলোমিটার এলাকা নিয়ে, বড় রাস্তা প্রায় ১৬ ফুটের, মাঝারি রাস্তা প্রায় ১২ ফুটের ও ছোট রাস্তা প্রায় ১০ ফুটের করে পুরো এলাকাতে ভাগ করা হয়েছে। এলাকাগুলিকে কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। মনে পড়ে যাচ্ছে সল্টলেকের বিভিন্ন সেক্টরের কথা। সল্টলেকে গেলে সেক্টর থেকে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে, মানুষের দেখা পেয়ে খুঁজে পাওয়া মুশকিল, আর এখানে মানুষের পরিপূর্ণতায় সবসময় সচল। এই সেক্টরের সংখ্যা কুড়ি ছাড়িয়ে গিয়েছে।

প্রতি সেক্টরে একটি করে সেক্টর অফিস, পুলিশ চৌকি, ফায়ার ব্রিগেড, পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা, প্রচুর শৌচালয়, প্রয়াগরাজ নগর নিগমের অফিস রয়েছে। প্রচুর ঝাড়ুদার নিয়োগ করে রাস্তা সাফ-সুতরো রয়েছে। নদীর চরে অস্থায়ী নগরে চরের বালি উড়ে যাতে না অসুবিধা হয়, তার জন্য সব সবসময় জলের গাড়ি রাস্তায় জল ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে একে নগর আখ্যা ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে না। সার্থক নাম কুম্ভনগর। সার্থক দিব্য কুম্ভ ২০১৯।

তাঁবুর এক কোণে রয়েছেন উত্তর ২৪ পরগণার ইছাপুর থেকে আশা পশুপতি ভট্টাচার্য্য। খুব সরল ও সোজাসাপ্টা মানুষ। পরিবারের পূর্বপুরুষরা শাস্ত্রচর্চা করতেন। বাড়িতে অনেক পুঁথি ছিল। পরে ওঁনারা রামকৃষ্ণ মিশনকে দিয়ে দিয়েছেন।

জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কেন কুম্ভে এসেছেন?” উত্তরে বললেন, “এই যে এত ভক্ত মানুষ এসেছেন পবিত্র হৃদয় নিয়ে। সবাই কিন্তু ভগবানের নামে এখানে এসেছেন।” ফের জিজ্ঞাসা করি, “আপনিও কি ভগবানের নামে এসেছেন?” বলেন, “হ্যাঁ, তাই। সকাল থেকে সারারাত ধরে সারাক্ষণ ধরে দেখুন, ভগবানের নাম হচ্ছে। চারিদিকে এই যে পবিত্রতার ঢেউ, সেই জলেই অবগাহন করতে আসা।”

পশুপতিবাবু আর সকলের মতো কেন্দ্রীয় সরকারের ভালো চাকরি করে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা-সহ পরিবারের অন্যান্যদের নিয়ে দিন কাটাতেন। কাল হলো চাকরির প্রমোশন পাওয়ার পরে। যে পদের তিনি অধিকারি হলেন, তাতে প্রতিনিয়ত তাঁকে ঘুষ নিতেই হবে। তিনি কিছুতেই এই কাজে রাজি হলেন না। এরপর নানান অত্যাচারের চাপে চাকরি রাখার জন্য তিনি ঘুষ নিতে বাধ্য হলেন। একটি শর্ত আরোপ করলেন তিনি, ঘুষ তাঁকে চেকে দিতে হবে এবং তাঁর নাম লেখা যাবে না।

এই শর্ত মঞ্জুর হলো। প্রতি মাসে তিনি ঘুষের চেকটি রামকৃষ্ণ মিশনে দিয়ে আসতেন। তাঁর কথায়, ‘টাকাটা তবু মানুষের কাজে লাগুক।’ এইভাবে মহারাজদের নজরে পড়ে যাওয়াতে তাঁরা পশুপতিবাবুর অবসর গ্রহণের পর আশ্রমের কাজের জন্য তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছেন। খুব আনন্দে আছেন সত্তর পেরনো এই মানুষটি।

সকাল সকাল কুম্ভনগরে ঘুরতে বেরিয়েছি। বিভিন্ন সেক্টরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সব আখড়াতেই খুব ব্যস্ততা। পুজা-পাঠ, দান-ধ্যান সব চলছে। বহু আখড়ায় সাধুদের ভ্রমণ চলছে। বিভিন্ন ক্যাম্প অফিস ঘুরে নিজের কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করছি। সেক্টর পাঁচের ক্যাম্প অফিসের পাণ্ডেজির সঙ্গে আলাপ বেশ জমে উঠল। কলকাতা থেকে এসেছি শুনে চা এনে খাওয়ালেন। কথায় কথায় জানতে পারলাম, তিনি উত্তরপ্রদেশ সরকারের সরকারি কর্মচারী। অনেকগুলো কুম্ভ ও অর্ধকুম্ভ সামলেছেন। প্রতি বছর এলাহাবাদের মাঘী মেলার দায়িত্বও সামাল দেন। এখানে এই যে এত খাওয়া দেওয়া ও ব্যবস্থাপনা কীভাবে চলে, তার একটা আভাস তিনি দিলেন। বারবার বললেন, “ইয়ে একদম সেহি হিসাব নেহি হ্যায়, পরন্তু এক ধারণা আপকো মিল জায়েগা।” সরকার থেকে ন্যায্য মূল্যে খাবার-দাবার ও অন্যান্য হিসাব যা দিলেন তা হলো, এই মেলার জন্য বরাদ্দ হয়- গম ৪৩০০ মেট্রিক টন, চাল ২৫০০ মেট্রিক টন, চিনি ২২০০ মেট্রিক টন, ময়দা ১৫০০ মেট্রিক টন, সুজি ১২০০ মেট্রিক টন, আটা ২৫০০ মেট্রিক টন, বনস্পতি ১৫০০ মেট্রিক টন, লবন ৭০০ মেট্রিক টন, কেরোসিন ৭ লক্ষ লিটার, দুধ ৩৫ হাজার লিটার, বৈদ্যুতিক লাইন ৫৯৫ কিলোমিটার ও ল্যাম্প পোস্টের সংখ্যা ৪৮০০।

তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কী তথ্য নেবেন বাঙালিবাবু?” বললাম, “না, না, থাক। মাথা ঝিমঝিম করছে।” শুনে এক গাল হেসে বললেন, “মাঝে মাঝে চলে আসবেন, গল্প হবে। মনে রাখবেন এটা সঠিক কাঁটা ধরে হিসাব দিলাম না। এটা একটা আন্দাজ মতো বললাম।”

আবার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে সব দেখছি। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল হিসাবগুলো। ব্যবসার সাথে মেলার একটা সম্পর্ক ছিল। গ্রামের জিনিস কেনাবেচাতে মেলা বা হাট বসত। কুম্ভমেলায় এই যে এত মানুষের জমায়েত, এত বেচাকেনা, এত খরচ, আদান-প্রদান, এর সাথে কি ব্যবসার টাকা খাটানোর কোনও যোগ আছে? ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। গঙ্গাসাগরে একদিনের মেলায় কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। এখানে তিন মাসের মেলায় কত কোটিতে যাবে ভাবছি। মকর সংক্রান্তির স্নানে সরকারি হিসাব ২ কোটির মত। তিন মাসে কত কোটিতে যাবে, এখুনি বলা যাবে না। তবে মাথাপিছু তীর্থযাত্রীর একটা খরচ ধরলে, তাকে কয়েক কোটি তীর্থযাত্রীর গুণিতকে ধরলে, মাথা ঝিমঝিম নয়, মাথাটা হ্যাং হয়ে যাবে বলে ছেড়ে দিলাম।

প্রয়াগের মাটির মাহাত্ম্য অনেক। ক’দিন এই মাটিতেই থাকা-খাওয়া-শোয়া, এই মাটিতেই লুটোপুটি। কত প্রাচীনকাল থেকে কত মানুষ ও মহাত্মার পদধূলিতে এই মাটি রঞ্জিত। মহাভারতে আছে-

গঙ্গায়াশ্চ নরশ্রেষ্ঠ! সরস্বত্যাশ্চ সঙ্গমে।

স্নাত্বাহশ্বমেধং প্রাপ্নোতি স্বর্গলোকঞ্চ গচ্ছতি।।

অর্থাৎ ‘গঙ্গা ও সরস্বতী সঙ্গমে স্নান করিয়া অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল পাইবে এবং স্বর্গে যাইবে।’ সমুদ্রমন্থন ও অমৃত কলসের কাহিনী তো বহু আলোচিত, তাই সে ইতিহাসে গেলাম না। ৩৭৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ৪১৪ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময়কালে ফাহিয়েন এসেছিলেন। তাঁর লেখায় প্রয়াগের উল্লেখ আছে। ৬৪৪ খ্রীষ্টাব্দে হিউয়েন সাং-এর লেখায় হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে মেলার উল্লেখ পাওয়া যায় প্রয়াগে। এলাহাবাদে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী নদীর মিলনস্থল। সরস্বতী এখানে অন্তঃসলিলা। এলাহাবাদের আগে নাম ছিল ত্রিবেণী। ১৫৭৫ খ্রীষ্টাব্দে আকবর এখানে আসেন। স্থানটি পছন্দ হওয়ায় ১৫৮৪ খ্রীষ্টাব্দে এখানে দুর্গ তৈরি করেন। ত্রিবেণীর পরিবর্তে নাম রাখেন ইলাহাবাস, আরবি ও সংস্কৃত মিশিয়ে। ইলাহাবাস অর্থাৎ আল্লাহর আলয়। পরবর্তীকালে ইংরেজরা ইলাহাবাস থেকে ইলাহাবাদ করেছেন। উত্তরপ্রদেশের পঞ্চম মহানগর এখন প্রয়াগরাজ।

হাঁটা ছাড়া ঘোরার কোনও উপায় নেই। মাথার উপর রোদ চড়া হচ্ছে। পথও অনেক। হাঁটতে হাঁটতে কুম্ভনগর থেকে নদী পেরিয়ে মূল শহরের দিকে এসেছি। কুম্ভমেলার মূল পরিচালন অফিস প্যারেড গ্রাউন্ডের কাছে। সেখানেই যাব কিছু তথ্যের খোঁজে। টোটো, রিকশা, কেউ নদীর পাড় থেকে যেতে চাইছে না। কিছুদূর রোদে হাঁটার পর একটি কমবয়সী ছেলে দেখি রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বললাম, “যাবে ভাই?” বলল, “যেতে পারি, রাস্তা কিন্তু চিনি না।” বললাম, “বেশ চলো, আমি চিনিয়ে নিয়ে যাব। ভাড়া কত দেব?” উত্তর, “আমি জানি না। বুঝে দেবেন।” জিজ্ঞাসা করলাম, “বাড়ি কোথায়?” উত্তর এল, “আড়া জেলা, বিহার।” নাম জিজ্ঞাসা করায় বলল, “ধর্মেন্দ্র চৌহান।”

তারপর গড়গড় করে বলে চলল, “এই তিনমাস এখানে ভালো রোজগার। তাই এখানেই চলে আসি প্রতিবছর। রিকশা এখান থেকে ভাড়ায় নিই। মালিককে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বাকি টাকা আমার। নদীর পাড়ে প্লাস্টিকের তাঁবুতে চলে যায় এই তিনমাস।”

সার দিয়ে মানুষ কুম্ভনগরে আসছে। ছেলে কাঁধে করে, মেয়ের হাত ধরে, পোঁটলা নিয়ে পুরুষ মানুষ, একগলা ঘোমটায় তাঁর স্ত্রীর হাতটাও পুরুষ মানুষের বাহুতে ধরা। পরম নিশ্চিন্তের বিশ্বাস সে হাত ধরায়। দলে দলে রঙিন কাপড় পরা সিমেন্টের ছোট বস্তায় জিনিস নিয়ে বুড়োবুড়ির দল, সাথে গেরুয়াধারী তাদের গুরুদেব। দলে দলে সাধু-মহাত্মার দল হাঁটতে হাঁটতে চলেছে আশ্রয়ের সন্ধানে। তার পাশেই দামি গাড়িতে জানলার কাঁচ তুলে দেবতার মতো স্বাচ্ছন্দে আরেক সাধুবাবা। একই গেরুয়া, কত তফাৎ।

সারাদিন ঘুরে একটা কথা বারবার মনে হচ্ছে, সত্যি কি সমুদ্রমন্থন শেষ হয়েছে? দেবতা ও অসুরদের মতো নাগরাজ বাসুকিকে ধরে আজও টেনে চলেছে উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ, বড়লোক-গরিবলোক, শিক্ষিত-মূর্খ সহ হাজারো দল। দেববৈদ্য ধন্বন্তরির থেকে যেমন অমৃতকুম্ভ নিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের নির্দেশে তাঁর পুত্র জয়ন্ত পালিয়েছিলেন আর নিজেরা ভাগ করে নিয়েছিলেন। ঠিক তেমনই আজও অসুররূপী হয়ে দেবতাদের অমৃত নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন নিম্নবর্ণ, গরিবলোক, অশিক্ষিত প্রমুখরা। আর অমৃতরূপ সমস্ত সুযোগ সুবিধা পেয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছেন উচ্চবর্ণ, বড়লোক, শিক্ষিত প্রমুখেরা। তাই কি আজও স্বাধীনতার পরেও বঞ্চিত ভারতবাসীর কপালে অশিক্ষা, অস্বাস্থ্য, দারিদ্র সহ হাজারো বঞ্চনা। কুম্ভমেলায় ঘুরতে ঘুরতে তাই বারবার মনে হচ্ছে, সত্যি এক ভারতদর্শন, যেখানে এখনও সমুদ্রমন্থন চলছে, আর এখানে মন্থনদণ্ড হয়ে দেখা দিয়েছে মন্দার পর্বতের পরিবর্তে ভোটবাক্স আর মন্দারকে ধারণ করেছে বিষ্ণুর বদলে ক্ষমতা।

আরও পড়ুন

প্রাণের স্রোত চলেছে প্রয়াগপানে

Shares

Comments are closed.