এইডস ও ক্যানসার মুক্তি, লন্ডনের অ্যাডমকে নবজীবন দিল ভারতীয় গবেষকের স্টেম-সেল থেরাপি

এইডস মুক্ত 'লন্ডন পেশেন্ট। ' সারল রক্তের ক্যানসারও। ভারতীয় গবেষকের চিকিৎসায় মারণ রোগমুক্তির নতুন দিশা বিশ্বে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: মারণ রোগকেও তাহলে জয় করা যায়! এইডসের কবল থেকেও সুস্থ শরীরে ফেরানো যায় রোগীকে! দু’দশকের লড়াই জিতল আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান। এইডস আক্রান্ত পৃথিবীর প্রায় কোটি মানুষকে রোগমুক্তির দিশা দেখালেন লন্ডনের চিকিৎসক-গবেষকরা। এইডস শুধু নয় চিকিৎসার আধুনিক পদ্ধতিতে সারল রক্তের ক্যানসারও। মারণ রোগের আস্ফালণ বন্ধ করল অস্থিমজ্জা (স্টেম সেল) প্রতিস্থাপণ। চার বছর টানা পর্যবেক্ষণে রেখে দেখা গেল ওই রোগী শুধু এইডস নয়, জয় করেছেন ক্যানসারকেও। ভাইরাসের ছিটেফোঁটাও বেঁচে নেই তাঁর শরীরে।

    অ্যাডাম ক্যাস্টিল্লেজো। বয়স ৪০ বছর। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় গোটা বিশ্ব তাঁকে চেনে ‘লন্ডন পেশেন্ট’ নামে। স্টেম শেল থেরাপিতে এইডস আক্রান্ত রোগীকে সুস্থ করা হয়েছে এমন গত বছরই প্রকাশিত হয়েছিল ‘নেচার’ পত্রিকায়। সাফল্যের কথা বলেছিলেন লন্ডনের চিকিৎসক-বিজ্ঞানীরা। সেই সময় রোগীর নাম. পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল। চিকিৎসায় সাড়া মেলার পরেও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল এতদিন। ভাইরাস ফের বেঁচে উঠছে কিনা তার জন্যই কড়া নজরদারিতে ছিলেন অ্যাডাম। দিন দুয়েক আগে লন্ডনের চিকিৎসকরা ঘোষণা করেন, সম্পূর্ণভাবে রোগমুক্তি হয়েছে অ্যাডাম ক্যাস্টিল্লেজার। তাঁর নাম ও পরিচয়ও সামনে আনা হয়।

    ২০০৩ সালে ধরা পড়ে এইচআইভি, ২০১২ তে ক্যানসার আক্রান্ত হন অ্যাডাম

    মারণ রোগের জোড়া ফলায় মৃত্যুর মেঘ ঘনিয়েছিল অ্যাডামের জীবনে। ভেনেজুয়েলার বাসিন্দা। ২০০৩ সালে এইচআইভি ধরা পড়ে। চিকিৎসা শুরু হয় অ্যাডামের। ২০১২ সালে দেখা যায় রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন অ্যাডাম। প্রাণ বাঁচাতে হাল ধরেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ও চিকিৎসক। এই টিমের নেতৃত্বে ছিলেন অনাবাসী ভারতীয় গবেষক ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র গুপ্ত। অ্যাডামকে এইচআইভি মুক্ত করার জন্য স্টেম-সেল থেরাপির সিদ্ধান্ত নেন গবেষক রবীন্দ্র। তবে এই অস্থিমজ্জা নিতে হত এমন এক ব্যক্তির শরীর তেকে যার জিনে এইডস বধের অস্ত্র আছে। গবেষক রবীন্দ্র জানিয়েছেন, ডোনারের শরীর থেকে অস্থিমজ্জা নিয়ে বিশেষ একধরনের স্টেম সেল বানানো হয় যা এইচআইভির সঙ্গে জমিয়ে লড়াই করে। কোষের মধ্যে ভাইরাসের প্রবেশ একেবারে বন্ধ করে দেয়। এইচআইভি শুধু নয়, ক্যানসার কোষের নখ-দাঁত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এই স্টেম-সেল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দেখা যায় রোগমুক্ত হতে শুরু করেছেন অ্যাডাম। মারণ ভাইরাস একটু একটু করে ধুযেমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে তাঁর শরীর থেকে।

     

    অভিনব স্টেম-সেল থেরাপিতে মারণ রোগ সারালেন ভারতীয় গবেষক

    কীভাবে সম্ভব হল এই পদ্ধতি? গবেষক রবীন্দ্র গুপ্ত বলেছেন, ‘‘কিউরেটিভ ট্রিটমেন্টে জীবনের ঝুঁকি থাকত। কারণ আইএচআইভি আক্রান্ত রোগীর শরীরে ক্যানসারও হানা দিয়েছিল। হেমাটোলজিক্যাল ম্যালিগন্যান্সিতে বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ ছিল।’’ তাই জিন থেরাপিতেই চমক ঘটানো হয়।

    গবেষক রবীন্দ্র বলেছেন, কোষে ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়া ঢুকতে গেলে তাদের কোনও বাহক বা রিসেপটরের দরকার হয় (Virus Receptor)। মানুষের শরীরের কোষ বা Host Cell এই এই বাহক খুঁজে নিয়ে কোষে জমিয়ে বসে ভাইরাসরা। প্রতিটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার জন্য আলাদা আলাদা রিসেপটর থাকে। একে অবলম্বন করেই একটু একটু করে কোষে আড়েবহড়ে বাড়তে থাকে জীবাণুরা।তাদের বংশ কয়েকগুণ বেড়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা শরীরে। আক্রান্ত হতে থাকে একের পর এক কোষ। এভাবেই ধীরে ধীরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়, যার অন্তিম পরিণতি মৃত্যু। এইচআইভি-১ (HIV 1) ভাইরাস স্ট্রেনের জন্য সাধারণত যে রিসেপটর বা বাহক কাজ করে তার নাম হল সিসিআর-৫ (CCR5) ।

    ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের ভাইরোলজিস্ট ডাক্তার রবীন্দ্র গুপ্ত।

    বিজ্ঞানী বলছেন, হোস্ট সেলের এই সিসিআর-৫ বাহকের জিনগত গঠনের বদল বা মিউটেশন হয় অনেক সময়। এইডস রোগীর শরীরে এই বাহক জিনের মিউটেশন হলে সে এইচআইভি-১ ভাইরাসের জন্য অপ্রিতিরোধ্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ভাইরাসকে আর চিনে উঠতে পারে না। কাজেই তার সঙ্গে জোটও বাঁধতে পারে না। আর ভাইরাস যদি বাহকের সঙ্গে জুটি না বাঁধে তাহলে তার আর কোষে ঢোকা সম্ভব হয় না। গবেষকরা বলছেন, তাই এমন ডোনার (দাতা) খুঁজতে হয় যার শরীরে এই বিশেষ জিন রয়েছে। সেই ব্যক্তির অস্থিমজ্জা থেকেই বানানো হয় এমন স্টেম-সেল যা এইচআইভির সঙ্গে লড়াই করতে পারে। অ্যাডামের শরীরেও এমনই স্টেম-সেল ঢোকানো হয়েছিল। অ্যাডামের শরীরের ৯৯ শতাংশ Immune Cells বদলে দেওয়া হয়েছিল ওই ডোনার সেল দিয়ে। যার কারণেই দেখা যায় নতুন করে আর ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারেনি তাঁর শরীরে।  রোগমুক্তি ঘটে ধীরে ধীরে। অ্যাডমকে ‘এইডস-ফ্রি’ ঘোষণা করেছেন কেমব্রিজের গবেষক-চিকিৎসকরা। রবীন্দ্র গুপ্ত বলেছেন, এর পরেও তাঁর শরীরে মারণ রোগের জীবাণু তেকে গেলে সেটা সুপ্ত অবস্থায় বা ঘুমিয়ে থাকবে, কোষকে আক্রান্ত করতে পারবে না কোনওভাবেই।

     

    স্টেম-সেল থেরাপিতেও এইডস-মুক্ত হয়েছিলেন বার্লিনের টিমোথি

    স্টেম-সেল থেরাপিতে প্রথম প্রাণ বেঁচেছিল মার্কিন বংশোদ্ভূত  বার্লিনের বাসিন্দা টিমোথি রে ব্রাউনের। তাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বার্লিন পেশেন্ট।’ ১৯৯৫ সালে এইডস আক্রান্ত হয়েছিলেন টিমোথি। একই ভাবে তাঁরও রক্তের ক্যানসার ধরা পড়ে। সেটা ২০০২ সালে। স্টেম-সেল থেরাপি করে সেবারও চমক দেখিয়েছিলেন বার্লিনের একটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা। এইডস ও ক্যানসার— মারণ রোগের জোড়া আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন টিমোথি। এখনও সুস্থ শরীরে বেঁচে আছেন তিনি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More