শনিবার, মার্চ ২৩

মনের ব্যথা বাদ দিয়ে অন্য সব ব্যথা কমানোর দাওয়াই

ব্যথা নিয়ে জেরবার প্রায় সকলেই। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ থেকে মানসিক টানাপোড়েন। শরীরের প্রতিটি কোণায় বিভিন্ন ব্যথা আমাদের জানিয়ে দেয় আমরা ভালো নেই। এই ব্যথা কেন হয়, কী করতে হবে ব্যথা হলে, তা জানতে আমরা কথা বললাম বিশিষ্ট চিকিৎসক ‘ফিজিক্যাল মেডিসিন’ বিশেষজ্ঞ মৌলিমাধব ঘটকের সঙ্গে। জেনে নিন কী বললেন ডাক্তারবাবু।

দ্য ওয়াল: ব্যথা কী, কেন হয়?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: ব্যথা কোনও অসুখ নয়, অসুখের সিম্পটম মাত্র। সাময়িকভাবে ব্যথা সারাতে ফিজিওথেরাপি বা ওষুধের সাহায্য নিলেই হয়। তবে অনেকদিন ধরে কোনও ব্যথা হলে, যেমন হাঁটুর ব্যথা কোমরের ব্যথা এমনকী কিডনির ক্যানসারে পিঠের নিচের দিকে ব্যথা হলে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। তখন ইঞ্জেকশন এমনকি অপারেশনও করতে হতে পারে। ব্যথা নানা কারণেই হতে পারে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাসল, টিস্যু বা নার্ভের কারণে ব্যথা হতেই পারে।

দ্য ওয়াল: ব্যথা কত রকমের হতে পারে?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: শরীরের যে কোনও গাঁটে ব্যথা হতে পারে। অর্থাৎ হাঁটু , কব্জি, কনুই, গোড়ালি যে কোনও জায়গায়। একে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় ‘ডিজেনারেটিভ আর্থ্রারাইটিস’। এছাড়া ‘জয়েন্ট পেইনে’ ‘ক্রনিক ইনফ্লেমেটরি পেইন’ও হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রদাহ হয়, ঠিক ব্যথা নয়। ‘মাসল পেইনে’র ক্ষেত্রে যে কোনও চোট বা ধাক্কা গুঁতো থেকে হয় ব্যথা। এই ব্যথা সাধারণত অনেকক্ষণ একটানা কোনও কাজ করলে, কম্পিউটারে বসে বা পরপর একটানা কেউ ক্লাস নিয়ে গেলে, বোর্ডে লিখতে লিখতে হাতের উপর চাপ পড়ে, একটানা কোনও খেলার সঙ্গে যুক্ত থাকলে পেশিতে টান পড়ে, ব্যথা হয়। এছাড়াও ‘ইন্টারনাল’ সমস্যা থাকলে ব্যথা হতে পারে। গলব্লাডারে স্টোন থাকলে পেটে পিঠে ব্যথা, ফুসফুসে স্প্যজম থাকলে পিঠ কাঁধে ব্যথা, মাথায় টিউমার থাকলে বা মাইগ্রেন বা সাইনাসের সমস্যা থাকলে ব্যথা থাকে। হার্টে ইসকিমিয়া থাকলে ব্যথা হয় বুকের বাঁদিকে, বা বাঁ হাতে টানা ব্যথা হতে পারে। এক এক ক্ষেত্রে এক একরকম চিকিৎসা চলে। তবে ইন্টারনাল সমস্যা থাকলে সেই চিকিৎসা আলাদা হয়।

দ্য ওয়াল: পেন ম্যানেজমেন্ট কী ও কেন করতে হয়?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: মাসল এবং জয়েন্টের পুরো ট্রিটমেন্টকেই একসঙ্গে পেন ম্যানেজমেন্ট বলে। প্রথমে ওষুধ দিয়ে সারিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হবে। তারপর লাইফস্টাইল দেখে নিয়ে মেশিনারি ট্রিটমেন্ট করতে হবে। অর্থাৎ তখন অপারেশন করতে হতে পারে।

দ্য ওয়াল: ঘাড় বা কোমরের ব্যথা চিরস্থায়ী হতে পারে কী?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: সাধারণত কোমর ও ঘাড়ের ব্যথার সঙ্গে মেরুদণ্ডের সম্পর্ক আছে। মেরুদণ্ডের সমস্যা থেকেই এই জাতীয় ব্যথা হয়। স্পন্ডাইলোসিস , স্পন্ডেলাইটিস হলে ব্যথা সারাজীবনের সঙ্গী। এক্সারসাইজ ছাড়া উপায় থাকে না। ব্যথা পুরোটা সারে না তবে আয়ত্তে থাকে। অ্যাঙ্কাইলোসিঙ স্পন্ডিলাইটিস সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছরে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছেলেদের হয়। এটা ব্যথার থেকেও প্রদাহ বেশি হয়। কিছুটা বংশগত সমস্যাও হয় এই রোগে। এটা যেমন কম বয়সে হয় তেমনি ৱয়স্কদের ডিজেনারেটিভ স্পন্ডাইলোসিস হতে পারে। ঘাড় পিঠে ব্যথা, হাঁটুর ব্যথা এক্ষেত্রে সমস্যা। সাধারণত হাড় ক্ষয় হতে থাকে বলে এই সমস্যা হয়।  এক্ষেত্রে থেরাপি করতে হয়। এক্সারসাইজ করতে হয়।

দ্য ওয়াল: সাধারণত ব্যথা কাদের বেশি হয় কেন হয়?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: মহিলারা বেশি ব্যথায় ভোগেন। কারণটা একেবারেই হর্মোনাল। মেনোপজের সময়ে হাড়ের জয়েন্টগুলোয় ক্ষয় বেশি হয়। তাই মহিলারা ব্যথায় কষ্ট পান। ডিজেনারেটিভ অস্টিও আর্থ্রারাইটিস হয় এক্ষেত্রে।

দ্য ওয়াল: মানসিক ও শারীরিক চাপের ব্যথা কতটা আলাদা?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: শারীরিক ব্যথাগুলোর কথা বললাম আগে, তবে মানসিক ব্যথা বলতে যা বোঝায় তাতে শরীরের উপরেও প্রভাব পড়ে। ডিপ্রেশনে চলে গেলে শরীরের কোষে কোষে রোজই একধরনের ব্যথা হয়। অ্যান্টি ডিপ্রেশনের ওষুধ দিতে হয় তখন। তাতে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়। আসলে মানসিক ব্যথা হলে তাতে সাইকোসোম্যাটিক ট্রিটমেন্ট চলতে পারে। যে কোনও মানসিক ব্যথাই ক্রনিক হতে পারে। তাই ব্যথা মানসিক হলেও অবহেলা করা ঠিক না।

দ্য ওয়াল: যাঁরা দাঁড়িয়ে কাজ করেন বা অ্যাথলিট, ডান্সার, যে কোনও খেলার সাথে যুক্ত তাঁদের ব্যথা কতটা বেশি হতে পারে?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: একটানা যে কোনও কাজই সমস্যার। আজকাল অনেকেই বিভিন্ন দোকানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করেন। সবসময়েই আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজের পর ৫ থেকে ১০ মিনিট রেস্ট নিন। সেটা আপনারা যদি রান্না করেন তাহলে একটানা খুন্তি নাড়বেন না। নাচ বা খেলা হলেও একই নিয়ম।

ব্যথায় গরম শেঁক না ঠাণ্ডা—কী বলছেন ডাক্তারবাবু শুনুন

দ্য ওয়াল: শিশুদের কখনও ব্যথা হতে পারে, কী করবেন মা বাবারা ?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: শিশুদের রিউম্যাটিক আর্থ্রারাইটিস হয়। গলায় ইন্ফেকশন এর উপসর্গ। তাই সেটা দেখলে মা বাবারা ফেলে রাখবেন না। এছাড়া রিউম্যটয়েড আর্থ্রারাইটিসে শিশুদের গাঁটে গাঁটে ব্যথা হয়। ফুলে যায় গাঁটগুলো। ১০-১২ থেকে ২০ ২২ পর্যন্ত থাকতে পারে এই ব্যথা। গরম শেঁক দিলে আরাম পাওয়া য়ায়। আর স্যাঁতসেঁতে জায়গার বদলে গরম জায়গায় থাকলে আরাম পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ওষুধ দিলে সেরে যায় এই সমস্যাও।

দ্য ওয়াল: দেহের ওজন কতটা ভাইটাল ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে এক্ষেত্রে ?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: অন্য সব অসুখের মতোই এক্ষেত্রেও খুব গুরুত্বপূর্ণ দেহের ওজন। বেশি হলে তা হাঁটু বইতে বইতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ব্যথার সমস্যা বাড়ে। তাই ওজন নিযন্ত্রণে রাখতেই হবে। রোজ এক্সারসাইজ করলেও হাড় ক্ষয়ের সমস্যা থাকলে ফিজিওথেরাপিস্টের সঙ্গে কথা না বলে জোর করে কিছু করবেন না। মুঠো মুঠো পেনকিলারও খাবেন না। আপনার শরীরের ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডাক্তারের পরামর্শেই পেনকিলার খান।

দ্য ওয়াল: কোনও ঘরোয়া টোটকাতে ব্যথা সারে কী?

ডঃ মৌলিমাধব ঘটক: না মেডিক্যাল সায়েন্সে এরকম কিছুর প্রমাণ নেই এখনও। চূণ হলুদ বা ইত্যাদি অনেকেই বলেন তবে তা আমরা সাজেস্ট করি না। ঠিক সময়ে ডাক্তারের কাছে যান , পরামর্শ নিন-ব্যথা কমানোর চেষ্টা করুন। সুস্থ থাকুন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Shares

Comments are closed.