শনিবার, অক্টোবর ১৯

বাম ছাত্র আন্দোলনের নতুন মুখ ঐশী, মুঠো উঁচিয়ে বললেন: পড়তে পড়তেই লড়ব

শোভন চক্রবর্তী

ফোনের ও-পারে গলাটা ধরে আসছিল। সবে মাত্র গণনা শেষ করে বেরিয়েছেন। মুখে লেগে লাল আবির। প্রায় তিন দশক পর দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে এসএফআই-এর বাঙালি সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ঐশী ঘোষ। সঙ্ঘ পরিবারের ছাত্র সংগঠন তৃতীয় স্থানে। অনেকটা ব্যবধানে জেতার পরও স্রোতে ভাসতে চাইছেন না দুর্গাপুরের মেয়েটা। জোর গলায় অথচ সংযত হয়ে ঐশী বললেন, “আরও পড়ব। আরও লড়ব। আর সিরিয়াসলিই রাজনীতিটা করব।”

ক্লাস টেন পর্যন্ত দুর্গাপুরের কারমেল কনভেন্ট স্কুলে পড়াশুনা। উচ্চমাধ্যমিক ডিএভি স্কুল থেকে। তার পরে দুর্গাপুর থেকে সোজা নয়া দিল্লি। স্নাতকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার পর মাস্টার ডিগ্রিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। মেধাবী ঐশী এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়েই এমফিলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই শুরু ছাত্র রাজনীতি। কিন্তু বাড়ি থেকে এতটা দূরে মধ্যবিত্ত একটা বাঙালি বাড়ির মেয়ে এ ভাবে রাজনীতি করছেন, বাড়িতে বকাঝকা? হেসে ফেললেন ঐশী। বাড়িতে আছেন বাবা, মা আর বোন। বাবা ডিভিসি-র কর্মচারী। মা গৃহবধূ। ঐশী বললেন, “না না! বাবা, মা, বোন সব সময় পাশে ছিল। এখনও আছে। সব সময় সাহস দিয়েছে লড়াই করার।”

সারা দেশে বিপর্যয়ের মুখে বাম আন্দোলন। ঐশী যে রাজ্যের মেয়ে, স্বাধীনতার পরে এই প্রথম বছর, সেই বাংলা থেকে কোনও সাংসদ নেই। তবু ঐশীর কথায় মরুভূমিতে মরূদ্যান খোঁজার জেদ। বললেন, “জেএনইউ-এ বাম ছাত্র জোটের এই জয় আসলে প্রতীকী। গোটা দেশের বাম মনোভাবাপন্ন মানুষের মধ্যে আমদের জয় আশা সঞ্চার করবে। আরও এক বার প্রমাণিত হল, মানি-মাসলের কাছে মেধা হারে না।”

দিল্লি মানে রাজধানী, যেখান থেকে দেশ চলে। যেখান থেকে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা ঠিক করেন কোন পথে চলবে কালকের ভারত। সেই গেরুয়া শিবিরের খাস তালুকে কী ভাবে পারল বাম ছাত্র জোট? ঐশী বললেন, “আমরা ছাত্রদের দাবি নিয়ে ছাত্রদের কাছে গিয়েছি। একই সঙ্গে বলার চেষ্টা করেছি, কী ভাবে ইতিহাস বদলানোর ব্লুপ্রিন্ট আঁকা হচ্ছে। কী ভাবে দেশপ্রেমের জিগির তুলে আসল সমস্যাগুলিকে অন্ধকারে পাঠানোর চেষ্টা করছে সরকার। ভোটের ফলে স্পষ্ট, রাজধানীর উৎকর্ষ কোন দিকে।”প্রায় তিন দশক আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসএফআই-এর হয়ে দাঁড়িয়ে বাঙালি সভাপতি হয়েছিলেন সুরজিৎ মজুমদার। বছর সাতেক আগে সুচেতা দে নামের এক বাঙালি ছাত্রী সভাপতি হয়েছিলেন, তবে তিনি আইসার। এ সব কথার মাঝেই আরও একটা মিছিলের প্রস্তুতি শুরু করেছে জেএনইউ-এর ছাত্ররা। পাশ থেকে ভেসে আসছে মাইকের আওয়াজ।

এমনিতে এ দেশের বাম গণ-আন্দোলনকে নেতৃত্ব সাপ্লাই দিয়েছে ছাত্র আন্দোলনই। প্রকাশ কারাট, সীতারাম ইয়েচুরি, বৃন্দা কারাট থেকে শ্যামলী গুপ্ত– বহু নজির রয়েছে। নবনির্বাচিত সভাপতিকে জিজ্ঞেস করা হয়, কী করবে ঐশী ঘোষ? পষ্টাপষ্টি জানিয়ে দিলেন, “আমাকে আমার সংগঠন শিখিয়েছে স্টাডি অ্যান্ড স্ট্রাগল। পড়তে পড়তে লড়তে। সেটাই আপাতত করে যাব। বাকিটা ভবিষ্যৎই বলবে।”

পাশ থেকে ভেসে আসছে “এল পুয়েব্রো ইউনিডো, জামাস এরা ভেনসিডো, ডি পিপল ইউনাইটেড, শ্যাল অলওয়েস বি ভিক্টোরিয়াস।” সব শেষে ঐশী বললেন, “ঐক্যবদ্ধ মানুষের জয় সুনিশ্চিত।” বলেই মিলিয়ে গেলেন মিছিলে। স্লোগানে….

Comments are closed.