বুধবার, জানুয়ারি ২৯
TheWall
TheWall

কলকাতার কিশোরী ভুবন ভরাচ্ছে গানে, নিজের শহরেই বর্ণবিদ্বেষের শিকার

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

চৈতালী চক্রবর্তী

স্টেজের ওপর সবজে-নীল আলোর লুকোচুরি। অন্ধকার চিরে এক সুরেলা গলার ঝঙ্কারে এক মুঠো মিষ্টি হাসি যেন ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। উল্লাস করে উঠলেন দর্শকরা। লাল-সাদা বুটির আনারকলিতে মেয়েটি তখন গাইছে, “বাবা ম্যায় তেরি মালিকা, টুকরা হুঁ তেরে দিল কা..” দর্শকাসনে বাবার চোখে তখন বৃষ্টি। কখনও ‘দিলবারো’, ‘মিতওয়া’ আবার কখনও রশিদ খানের ‘আওগে যাব তুম হো সাজনা’..ক্লাসিকাল থেকে সেমি ক্লাসিকাল, ১৩ বছরের মেয়ের সুরের জাদুতে মাত অলকা ইয়াগনিক, জাভেদ আলি থেকে হিমেশ রেশমিয়া। ‘সুপারস্টার সিঙ্গার’-এর ১৬ জন প্রতিযোগির মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতেই যার নাম, কলকাতার সেই মেয়ে তপোলব্ধা সর্দার।

মহেশতলায় বাড়ি। ক্লাস এইটের তপোলব্ধার কাছে সুরই সঙ্গী। হারমোনিয়াম হাতে পেলে চারপাশ ভুলে যায় মেয়েটা। গানই যেন তার একমাত্র বন্ধু। সাত সুরের রামধনু তাকে ঘিরে থাকে সবসময়।

সুর-সাধনার শুরু তিনেই…

গানের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্ক জুড়েছে সেই তিন বছর বয়স থেকেই, জানালেন তপোলব্ধার বাবা দীপকবাবু। পেশায় স্কুল শিক্ষক। তপোলব্ধার মা মৌসুমী সর্দারও গায়িকা। বাড়িতে রীতিমতো গানের পরিবেশ। দীপকবাবু বললেন, “আমার স্ত্রীকে যখন গুরুজি গান শেখাতে আসতেন, তিন বছরের তপোলব্ধা গুটি গুটি পায়ে হারমোনিয়ামের কাছে গিয়ে বসে থাকত। তখনই বুঝি মায়ের মতো মেয়েও সঙ্গীত-প্রেমী।” সেই শুরু। তিন বছরেই সুরে হাতেখড়ি। প্রথম গুরু মা মৌসুমী দেবী। তারপর গানের স্কুলে পা। তপোলব্ধা তখন চারের শিশু। হারমোনিয়ামে তার কচি আঙুলগুলো যখন খেলা করত, অবাক হয়ে চেয়ে থাকতেন মা-বাবা দু’জনেই।

গানের টানে পড়াশোনাকে কখনও অবহেলা করেনি তপোলব্ধা। দীপকবাবুর কথায়, “ও পড়াশোনায় খুব ভালো। সুন্দর হাতের কাজ করতে পারে। আর গান তো কথাই নেই, ওর সবসময়ের সঙ্গী।” ব্যাডমিন্টন খেলতে ভালোবাসে তপোলব্ধা। তবে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘তোমার হবি কী?’ মেয়ে কিন্তু সাফ জবাব দেবে-‘গান’।


মা-বাবার সঙ্গে তপোলব্ধা। মা মৌসুমী দেবীও গায়িকা।

 ‘স্টারডম, ফ্ল্যাশলাইট পছন্দ করে না তপোলব্ধা..সুপারস্টার সিঙ্গারে যেতেই চায়নি

নিজের মতো করে, নিজের একটা জগৎ বানিয়ে নিয়েছে তেরোর মেয়েটি। যেখানে আছে তার পরিবার আর গান। সেখানে স্টারডম, নাম-ডাক, ফ্যাশন, গ্ল্যামারের জায়গা নেই। সুর তার কাছে সাধনা। বেহালার গানের শিক্ষিকা অনিতা ঘোষের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতিতে হাতেখড়ি।  পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কাছে ধ্রুপদী ঘরানায় প্রশিক্ষণ এখনও চলছে। পণ্ডিতজি যখন গেয়ে ওঠেন ‘আয়ে না বালম’, সেই সুরের সাঁকো বেয়ে ছুটে চলে কিশোরী মন। লতা মঙ্গেশকরের গানের কলি গুনগুন করতে করতেই তার দিন শুরু হয়।

দীপকবাবুর কথায়, “কলকাতায় যখন সুপারস্টার সিঙ্গারের অডিশন হচ্ছিল, মেয়ে যেতেই চায়নি। বড় বড় মানুষজনের সামনে নিজেকে মেলে ধরতে এখনও ভয় পায় তপোলব্ধা। পরে আমরা অনেক বুঝিয়ে রাজি করাই।” অডিশনের প্রথম তিন রাউন্ডেই বিচারকদের মন জিতে নেয় তপোলব্ধা। পরে মুম্বই থেকে ফোনে জানানো হয়, এই মেয়ে সোনির সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের রিয়্যালিটি শোয়ের টিকিট পেয়ে গেছে। সে দিন যে আনন্দের অনুভূতি হয়েছিল সেটা বোঝাতে গিয়ে দীপকবাবু বলেন, “কী যে গর্ব হয়েছিল সে দিন বোঝাতে পারব না। আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের মেয়ে গান গাইবে খ্যাতনামা বিচারকদের সামনে। ওর গান শুনবে গোটা দেশ”..কথাটা শেষ করতে পারেননি তপোলব্ধার বাবা, ফোনের ওপারে হয়তো গলা ধরে এসেছিল তাঁর।

তপোলব্ধার সুর পৌঁছে গেছে এ আর রহমানের দরজায়…

লেখক, বর্তমানে ডিরেক্টর হরিন্দর সিক্কা তপোলব্ধাকে তাঁর পরবর্তী ছবির প্লে-ব্যাকের জন্য বেছে নিয়েছেন। হরিন্দরের ‘কলিং সেহমত’ উপন্যাস নিয়ে মেঘনা গুলজারের ‘রাজি’ সিনেমা ইতিমধ্যেই বক্সঅফিস হিট।

হরিন্দর সিক্কার সঙ্গে তপোলব্ধা

হরিন্দর জানিয়েছেন, তাঁর পরবর্তী ছবিও নারীশক্তিকে কেন্দ্র করে। সম্ভবত এই ছবিতেই গান গাইতে পারে তপোলব্ধা। দীপকবাবু জানিয়েছেন, মেয়ের গানের সিডি পৌঁছে গেছে এ আর রহমানের কাছে। সোনি চ্যানেল কর্তৃপক্ষের এই ব্যাপারে বিশেষ সহযোগিতা রয়েছে। সকলেই চায় এই মেয়ের নাম ছড়িয়ে পড়ুক দেশের আনাচ কানাচে।

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি…

সেই কোন যুগে গতানুগতিক সৌন্দর্যধারণাকে নস্যাৎ করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই কথা বলে গিয়েছিলেন। কালো রঙের প্রতি বিতৃষ্ণা, চাপা বর্ণবিদ্বেষ এখনও সমাজের অন্তরালে বয়ে চলেছে অন্তঃসলিলা হয়ে। শ্যামাঙ্গী তপোলব্ধাকেও তার গায়ের রঙের জন্য আকছার বাঁকা কথা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ সহ্য করতে হয়। “ এ মা! এই মেয়ে কী কালো” রাস্তাঘাটে, স্কুলে, বাজারে-দোকানে গায়ের রঙ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রতিদিন কেঁদে ওঠে কিশোরী মন। দীপকবাবু বললেন, “এই তো ক’দিন আগেই বাইকে করে যাচ্ছিলাম। পাশ থেকে কয়েকজন বলে উঠল, দেখ মেয়েটা কী কালো! বাড়ি ফিরে মেয়ের সে কী কান্নাকাটি।”

এই কারণেই আর পাঁচজনের থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে তপোলব্ধা। সুপারস্টার সিঙ্গারের মঞ্চে ওঠার ভয়ের কারণও এই গায়ের রঙ। পাছে যদি কেউ ঠাট্টা করে বসে। “অলকাজি আমার মেয়েকে বুঝিয়েছেন, কৃষ্ণও তো কালো! কিন্তু রঙ নিয়ে এই হীনমন্যতা ও কাটিয়ে উঠতে পারছে না। ভিতরে ভিতরে অবসাদে ভুগছে, ” বলেছেন দীপকবাবু।

চামড়ার রঙ নয়, মনের রঙেই তোমার পরিচয় হোক। এ যুগের বহু শ্যামাই গায়ের রঙ নিয়ে চিন্তামুক্ত। তাঁরা ভেঙে বেরোতে পেরেছেন ফর্সার মিথ। পরোয়া না করে মিশে যেতে চেয়েছেন অনাকাঙ্ক্ষিত সেই রঙে।  কালো-র আঁধারে আর বেশি দিন তাঁদের দমিয়ে রাখা যাবে না। সৌন্দর্যের দিনবদলের দিন এসে গিয়েছে, তপোলব্ধা তুমি এগিয়ে যাও!

Share.

Comments are closed.