বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৫
TheWall
TheWall

কৃত্রিম হৃদযন্ত্র নিয়ে সুস্থ টানা ১০ বছর, দেশে রেকর্ড করলেন সন্তোষ, সাফল্য কলকাতার কার্ডিওলজিস্টের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিব্যি চলছিল সে। আচমকাই ছন্দপতন আর তার পর এক দিন বিকল হয়ে যাওয়া। হৃদযন্ত্রের এমন পরিণতিতে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল সন্তোষ দুগারের। সালটা ২০০৯। বেঁচে থাকাটাই যখন তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, হাল ধরেছিলেন কলকাতার ইন্টার ভেনসোনাল কার্ডিওলজিস্ট প্রকাশ কুমার হাজরা। কলকাতার হাসপাতালেই বুকে কৃত্রিম হৃদযন্ত্র বসে সন্তোষ বাবুর। তার পর কেটে গেছে ১০টা বছর। হৃদযন্ত্রও বিকল হয়নি, সন্তোষবাবুর শরীরও ভাঙেনি। টানা ১০ বছর কৃত্রিম হৃদযন্ত্র বুকে নিয়ে সুস্থ ভাবে বেঁচে থেকে রেকর্ড করে ফেললেন কলকাতার সন্তোষ দুগার।

হৃদস্পন্দনের গতিতে অসঙ্গতি ধরা পড়লে হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে জুড়ে দিতে হয় কৃত্রিম হৃদযন্ত্র। স্পন্দন উৎপাদনকারী যন্ত্রের সঙ্গে হৃৎপিণ্ডের সংযোগ রক্ষার জন্য থাকে একাধিক তার বা লিড। ডাক্তাররা বলেন, যন্ত্রটি বসানোর পরে নিয়ম মেনে চললে, সুস্থ জীবনযাপন করা যায়। হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট বা হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন সম্ভব না হলে, কৃত্রিম হৃদযন্ত্র বসিয়ে হার্ট সচল রাখা যায় অনেক বছর। সাধারণত, লেফট ভেন্ট্রিকুলার অ্যাসিস্ট ডিভাইস (LVAD)সবচেয়ে বেশি দিন কার্যক্ষম থাকে। কার্ডিওলজিস্টরা বলেন, এই যন্ত্র ঠিক ভাবে কাজ করলে এবং রোগী নিয়মিত চেকআপের মধ্যে থাকলে, তার মেয়াদ থাকে ৫-৭ বছর। সন্তোষ বাবু সেখানে কাটিয়ে দিয়েছেন ১০ বছর। যেটা রেকর্ড তো বটেই, কলকাতার কার্ডিওলজিস্টদের কাছেও অনেক বড় সাফল্য।

কী হয়েছিল সন্তোষবাবুর? হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিল। একদিন আচমকাই হার্ট তার স্বাভাবিক ছন্দ হারায়। ফলে হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন জরুরি হয়ে পড়ে। কার্ডিওলজিস্টরা বলেন, এই ট্রান্সপ্লান্টের জন্য প্রথমে এমন রোগী খুঁজে বার করতে হয়, যার ‘ব্রেন ডেথ’-এ মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু হার্ট একেবারে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। এর পরে রক্তের গ্রুপ ও ফ্যাক্টর ম্যাচ করা প্রয়োজন হয়। তবেই সেই হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়। বিকল্প পদ্ধতি, কৃত্রিম হৃদযন্ত্র বসানো। সন্তোষ বাবুর ক্ষেত্রে এই বিকল্প পথেই হাঁটেন কার্ডিওলজিস্ট প্রকাশ কুমার হাজরা।

কী ভাবে কাজ করছে এই কৃত্রিম হৃদযন্ত্র?

কার্ডিওলজিস্ট প্রকাশ কুমার হাজরা জানিয়েছেন, সন্তোষ বাবুর হৃদপিণ্ডের বাম প্রকোষ্টের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল এই কৃত্রিম বৈদ্যুতিক যন্ত্র। এই যন্ত্রের কাজ সহজ ভাষায় বলতে গেলে, বিকল হয়ে যাওয়া বা ঘুমিয়ে পড়া হৃদপিণ্ডকে জাগিয়ে তোলা। অর্থাৎ তাকে ফের চাঙ্গা করে তোলা। সেটা কী ভাবে হয়? ইলেকট্রিক্যাল ইমপা‌ল্‌স তৈরি করে হৃদপেশিকে সরবরাহ করতে হয়। এটা কৃত্রিম পদ্ধতিতে তৈরি একটা ধাক্কা যা হৃদপিণ্ডের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এর পর রয়েছে হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ঠগুলিতে রক্ত প্রবাহকে সচল করে তোলা। যাতে সারা শরীরে রক্তের গতি নিয়ন্ত্রিত হয়। এই যন্ত্রটি কাজ করে রোটর পাম্পের মতো। এর সঙ্গে লাগানো থাকে লিড বা তার। যেটা জোড়া থাকে হার্টের বাম প্রকোষ্ঠের সঙ্গে। সেখানে জমা হওয়া বিশুদ্ধ রক্ত টেনে নিয়ে এই লিড সেটা ছড়িয়ে দেয় সারা শরীরে। ডাক্তারবাবু জানিয়েছেন, রোগীর পেটের কাছে ফুটো করে চ্যানেল তৈরি করতে হয়। এই চ্যানেল দিয়ে হার্টের সঙ্গে জোড়া হয় এই যন্ত্র। এর থেকে একটি তার বেরিয়ে আসে শরীরের বাইরে। যেটি যুক্ত করা থাকে লিথিয়াম ব্যাটারির সঙ্গে। এই ব্যাটারি তড়িৎ শক্তি তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট গতিতে লিডের মাধ্যমে হার্টে সরবরাহ করে হার্টের গতিকে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বাড়াতে সাহায্য করে। একটি ব্যাটারি সাধারণত ৮-১০ বছর পর্যন্ত যায়। ব্যাটারি শেষ হলে ব্যাটারির ক্যানটি পরিবর্তন করতে হয়। তবে ব্যাটারিতে যদি কোনও গণ্ডগোল ধরা পড়ে, তাহলে ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে সেটা কাজ করা বন্ধ করে দেবে। মৃত্যু হবে রোগীর। কৃত্রিম হৃদযন্ত্র বসালে তাই রোগীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। ব্যাটারির চেকআপ করাতে হয় মাঝে মধ্যেই।

সন্তোষ বাবু এখনও দিব্যি সুস্থ, সচল আছেন। তিনি বলেন, “আমি ভালো আছি। সব কাজ করতে পারি। কলকাতার ডাক্তারদের অনেক ধন্যবাদ।”

হার্টমেট ইমপ্ল্যান্টে কলকাতাও এখন এগিয়ে

ভারতে প্রথম কৃত্রিম হৃদযন্ত্র Artificial Heart Pump-এর সফল ইমপ্ল্যাট হয় ২০১২ সালে। চেন্নাইতে। ৫৮ বছরের এর রোগীর দেহে হার্টমেট-২ এলভিএডি HeartMate-II LVAD” (Left Ventricular Assist Device) বসান কার্ডিওলজিস্টরা। সেই সময় অবশ্য হার্টমেটের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। বিদেশ থেকে আমদানি করতে হত এই যন্ত্রের কলকব্জা। যাতে খরচ হত কোটি কোটি টাকা। ২০১৮ সাল থেকে এই যন্ত্র আমদানির খরচ কমে। কলকাতায় হার্টমেট ইমপ্ল্যান্টের খরচ ৪০-৬০ লক্ষ টাকা। শহরের কার্ডিওলজিস্টরাই এই অস্ত্রোপচার সফল ভাবে করতে পারেন। ভিন রাজ্যে ছোটার প্রয়োজন হয়না। কলকাতায় আরও তিন জনের শরীরে হার্টমেট ইমপ্ল্যান্ট হতে পারে। সেই প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে।

Comments are closed.