সোমবার, অক্টোবর ১৪

দেবীর আরাধনার সঙ্গে উদযাপন হোক অন্তরাত্মার শুভ চেতনার, উপাসনার অনন্য ভাবনায় সাজল বেহালা জয়রামপুর সার্বজনীন

সোহিনী চক্রবর্ত্তী

রোজকার ইঁদুরদৌড়ের জীবনে নিজেদেরকে ভালোবাসতে ভুলে গিয়েছি আমরা। তাই হয়তো আশেপাশের কারও ভালো হলে সহ্য হয় না অনেকের। চারিদিকে হতাশা-অসন্তোষ-রাগের বহিঃপ্রকাশই আজকাল বেশি। নিজেদের অন্তরে থাকা সুন্দরের চেহারাটাই যেন দিন দিন ভুলে যাচ্ছি আমরা। কিন্তু এই পুজোয় মা দুর্গার আরাধনার সঙ্গে উদযাপন হোক আমাদের ভিতরে থাকা পবিত্রতার। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে প্রকাশ পাক মানবজাতির অন্তরাত্মার সৌন্দর্য। এই পুজোয় সবাই একটু অন্যরকম করে ভাবুন, তেমনটাই চান বেহালার উপাসনা। নিজেদের ভালো থাকার ইচ্ছেগুলোকে কোণঠাসা না করে বরং উদযাপন করা হোক অন্তরের শুভ শক্তির। এই পজিটিভ ভাইবস নিয়েই উপাসনার এ বারের পুজোর ভাবনা ‘দেবী’। যার মাধ্যমে মা দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি সেলিব্রেট করা হবে মনুষ্যত্বকেও।

নবরাত্রির শুরুতেই ট্রান্সজেন্ডার ‘লক্ষ্মী’ রূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন অক্ষয় কুমার। আগামী ছবি ‘লক্ষ্মীবম্ব’-এর নিউ লুক প্রকাশ করে আক্কি বলেছেন, “নবরাত্রি মানেই অন্তরের দেবীকে শ্রদ্ধা জানানো এবং নিজের ভিতরে থাকা সীমাহীন শক্তির উৎসব।” ঠিক অক্ষয়ের মতো করেই ভাবেন এই শহরের তরুণ শিল্পী উপাসনা চট্টোপাধ্যায়। চেনা ছকের বাইরে গিয়েই অন্যরকম কিছু করাটাই নেশা তাঁর। গত কয়েক বছর ধরেই কলকাতার বুকে যে সব প্রতিমা শিল্পীর নাম শোনা যায় তাঁদের মধ্যে উপাসনা অন্যতম। এ বার বেহালার জয়রামপুর সার্বজনীনের প্রতিমা এবং মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ৭২ বছরে পা দিয়েছে পুজো। তাই উদ্যোক্তারাও চেয়েছিলেন একটু অন্যরকমের ছোঁয়া থাকুক এ বারের পুজোয়।

ক্লাবকর্তাদের হতাশ করেননি উপাসনা। চালচিত্র তৈরি থেকে অনন্য থিমের ভাবনা, প্রতিমা নির্মাণ থেকে মণ্ডপ সজ্জা, সবেতেই ছক্কা হাঁকিয়েছেন তিনি। মা দুর্গার চালচিত্র তৈরি করেছেন ‘রোদ্দুর’ নামে এক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত দৃষ্টিহীনরা। উপাসনার কথায়, “ওঁরা হয়তো আমাদের মতো দেখতে পান না। কিন্তু ওঁদের মনের দৃষ্টি আমাদের থেকেও অনেক বেশি জোরালো। সেখানে কোনও অন্ধকার নেই, শুধু আলো আছে। সেই আলোর ভরসাতেই এ বার মা দুর্গার চালচিত্র সাজিয়েছেন ওঁরা।” দড়ি, কড়ি ও আরও নানা প্রাকৃতিক জিনিস দিয়েই বানানো হয়েছে ঠাকুরের চালচিত্র। সবেতেই লেগে রয়েছে প্রাণের ছোঁয়া।

দেবী প্রতিমা বানিয়েছেন এবং সাজিয়েছেন উপাসনা নিজে। তাঁর ভাবনায় উঠে এসেছে অন্তরাত্মার সঙ্গে আমাদের নিবিড় যোগাযোগের কথা। উপাসনা বলেন, “আমরা প্রত্যেকে একে অন্যের থেকে অনেকভাবে আলাদা হলেও কোথাও না কোথাও আমাদের মধ্যে একটা যোগ রয়েছে। একজন মায়ের সঙ্গে সন্তানের যেমন নাড়ির যোগ থাকে, এই সম্পর্কও অনেকটা তেমনই। প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছি আমরা। একজন মানুষের সঙ্গেও আর একটা মানুষের যোগাযোগ থাকে। আর দেবী দুর্গা তো আমাদের সকলের মা। তাঁর সঙ্গে তো আমাদের আত্মার যোগ রয়েইছে।” বিশ্বের সবকিছুর মধ্যে থাকা এই যোগসূত্রকেই এ বার নিজের কাজে তুলে ধরেছেন উপাসনা।

প্রতিমা সজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে কড়ি, নারকেল দড়ি, ধানের শীষ, বীজ, খড় এবং আরও নানান প্রাকৃতিক জিনিস। দেবীর চোখ বানানো হয়েছে দড়ি দিয়েই। পরিবেশের প্রতিটি জিনিসের সঙ্গেই যে আমরা ভীষণ ভাবে জড়িয়ে সেই ভাবনাই নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছেন উপাসনা। তাঁর কথায়, “আজকাল নিজেদের স্বার্থের জন্য আমরা বড্ড বেশি চারপাশের ক্ষতি করি। তার ফলে সাময়িক ভাবে হয়তো আমাদের মনে হয় আমরা ভালো আছি। কিন্তু আদতে তা নয়। বরং নিজেদের ধ্বংসের আর একটু কাছে ঠেলে দিই আমরা। আমাদের অন্তরে ভালোবাসার বদলে জন্ম নেয় বিদ্বেষ। শেষ পর্যন্ত এই হিংসাই আমাদের শেষ করে দেয়।”

তাই উপাসনা মনে করেন, সময় এসেছে বদলের। এ বার সকলেরই উচিত নিজের অন্তরআত্মার শুভ চিন্তার উদযাপন করা। নেগেটিভিটি বিসর্জন দিয়ে সেলিব্রেশন হোক পজিটভিটির। তাই মণ্ডপ থেকে প্রতিমা সবেতেই রয়েছে ঐক্যের বার্তা। মাতৃপ্রতিমার সামনে রয়েছে অগ্নিকুণ্ড থেকে জন্ম নেওয়া শিশু। উপাসনা বলেন, “নতুন প্রাণের জন্ম হওয়ার থেকে এই বিশ্বে পবিত্র আর কীই বা হতে পারে। আর জন্মের পর থেকেই তো প্রকৃতির সবকিছুর সঙ্গে আমাদের এক অদ্ভুত যোগাযোগ তৈরি হয়। যেটা মা দুর্গার সঙ্গে আমাদের আত্মিক যোগ কিংবা একজন মায়ের সঙ্গে তাঁর শিশুর নাড়ির যোগাযোগের তুলনায় কোনও অংশে কম নয়।”

Comments are closed.