এখন যেন যাওয়ারই বেলা, রোজই দুঃসংবাদ, আজ পূর্বাও চলে গেল: বুদ্ধদেব গুহ

পূর্বার গলার সঙ্গে সুচিত্রাদির গলার খুব মিল ছিল। খুব প্রাণখোলা দরাজ গলা ছিল পূর্বার। আর কী সুস্পষ্ট উচ্চারণ! সঙ্গীতকেই যেন জীবনের ব্রত করে নিয়েছিল।

১৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

বুদ্ধদেব গুহ 

এখন তো আমাদের সকলেরই যাওয়ার সময়। দিন ঘনিয়ে আসছে যেন। প্রায় রোজই কারও না কারও মৃত্যুসংবাদ পাচ্ছি, আর বিষণ্ণ হচ্ছি। আজ সকালে যেমন পূর্বা চলে গেল। খবরটা শোনা ইস্তক মনটা বড় ভারাক্রান্ত হয়ে আছে।কত দিনের কত স্মৃতি ওর সঙ্গে আমার।

ময়মনসিংহের খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ছিল পূর্বা। ওর বিবাহপূর্ব পদবি ছিল সিনহা, মানে সিংহ। সুচিত্রা মিত্রের খুব পছন্দের ছাত্রী ছিল ও। সুচিত্রাদি প্রথম থেকেই খুব স্নেহ করতেন পূর্বাকে। এসবই কিন্তু রবিতীর্থ প্রতিষ্ঠার আগের কথা। তারপর তো ‘রবিতীর্থ’ গড়ে তুললেন সুচিত্রাদি। সেখানে দ্বিজেন চৌধুরী এসে যোগ দিলেন। পূর্বারও খুব অবদান ছিল সে সময়।

সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল সে সময় অরুণ দাম। সাহিত্যের প্রতি একটা অন্যরকম অনুরাগ ছিল অরুণের। কলেজে একটা দেওয়াল পত্রিকাও বের করত সে সময়। এই অরুণের সঙ্গেই পরে বিয়ে হয় পূর্বার। যদিও বেশ কিছুটা দেরি করেই বিয়ে করেছিল ওরা। বিয়ের পরে বাপের বাড়ির সিংহ পদবি ত্যাগ করে অরুণের পদবি গ্রহণ করে পূর্বা। পরে তো পূর্বা দাম নামেই সে গানবাজনার জগতে খ্যাতি পেয়েছে।

পূর্বার গলার সঙ্গে সুচিত্রাদির গলার খুব মিল ছিল। খুব প্রাণখোলা দরাজ গলা ছিল পূর্বার। আর কী সুস্পষ্ট উচ্চারণ! সঙ্গীতকেই যেন জীবনের ব্রত করে নিয়েছিল।

আমার সঙ্গে পরের দিকে অবশ্য অরুণের তেমন যোগাযোগ ছিল না। অরুণ ছিল আর্টসের ছাত্র। আর আমি কমার্স পড়তাম। আরও পরের দিকে, পেশাগত জীবনে আমি তো একেবারেই অন্য পথে চলে গেলাম। তবুও অরুণ-পূর্বা যোগাযোগ রাখত আমাদের সঙ্গে। মনে আছে, ওদের একমাত্র মেয়ের বিয়েতেও নিমন্ত্রিত ছিলাম আমরা। কি একটা কাজে আটকে যাওয়ায় আমার স্ত্রী ঋতু যেতে না পারলেও আমি গেছিলাম সেই বিয়েতে।

ঋতুর সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল পূর্বার। বয়সে অল্প বড় ছিল বলে পূর্বাকে ও পূর্বাদি বলে ডাকত। পূর্বাও ঋতুকে স্নেহ করত খুব।

মাঝখানে অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ ছিল না অরুণ পূর্বার সঙ্গে। তারপর এই বছর দুয়েক আগে একদিন আমিই ফোন করলাম অরুণকে। পূর্বা কেমন আছে জিজ্ঞাসা করায় অরুণ বলল, ওর তো আলঝাইমার্স হয়েছে, এখন একেবারে শয্যাশায়ী। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বললাম, আমি একদিন যাব তোদের বাড়ি। সেই যাব যাব করে শেষপর্যন্ত গতবছর পুজোর আগে গেলাম ওর বাড়িতে। দেখি বিছানায় শুয়ে আছে পূর্বা। ‘আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে’ এই গানটা গাইতে গাইতেই আমি পূর্বার ঘরে ঢুকলাম। গান শুনে মুখ তুলে তাকালো ও৷ ওর শীর্ণ হাতদুটো হাতের মধ্যে নিয়ে সেদিন অনেকক্ষণ বসে ছিলাম ওদের বাড়িতে।

বাড়ি ফিরে আসার পর অরুণ ফোন করে বলল, “পূর্বা তোকে একেবারে চিনতে পারেনি রে।” খুব অবাক হলাম। বললাম, চিনতে পারে নি? সে কি রে! অরুণ বলল, “আমি তো ওকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করলাম বল তো কে এসেছিল। ও কিছুই বলতে পারল না। মনে করিয়ে দিতে চাইলাম। বললাম, ও তো বুদ্ধ!  বুদ্ধ, যার সঙ্গে ঋতুর বিয়ে হয়েছিল। তারপর মনে হল আবছা কিছু মনে পড়েছে ওর। কিন্তু স্পষ্ট করে মনে করতে পারল না কিছুই।”

খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন পূর্বাকে রোগশয্যায় দেখে। দু’জন নার্স রাখা হয়েছিল ওর দেখাশোনার জন্য। অরুণ তো কোনওদিনই সরকারি চাকরি করেনি। ফলে পেনশনের সুযোগসুবিধে কিছুই পেত না। তার মধ্যে পূর্বার এই জটিল অসুখ। সবমিলিয়ে খুব আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেই ছিল ওরা সে সময়। সুবিধের মধ্যে, অরুণদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকত ওদের মেয়ে জামাই আর নাতি। সে ভারি চমৎকার নাতি হয়েছে পূর্বা-অরুণের। পাশে মেয়ে জামাই থাকায় অসুস্থ মায়ের দেখাশোনাও করতে পারত। অরুণ কিছুটা বলভরসাও পেত। না হলে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে সে একাই বা কোথায় যেত, কী করত জানি না।

আমি সে সময় হাজার দশেক টাকা নিয়ে গেছিলাম পূর্বার জন্য। এটা যদিও বলার কথা নয়। কিন্তু সে সময় ওদের আর্থিক অবস্থা দেখে খুব খারাপ লেগেছিল আমার। কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে কতটাই বা সাহায্য করা সম্ভব!  পূর্বার জন্য একটি অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা মাথায় আসে আমার। মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলে অরুণও সায় দেয় আমার প্রস্তাবে।

অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ‘টেগোর ফাউন্ডেশন’এর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলি। হলের ব্যবস্থা, টিকিটের ব্যবস্থা সব ওরাই করে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় কণ্ঠশিল্পী জোগাড় করা নিয়ে। দুঃখের কথা এই যে, পারিশ্রমিক না নিয়ে গান গাইবে এমন একজনও শিল্পী পাওয়া যায় না সে সময়। শুরু থেকেই উদ্যোগটা যেহেতু আমার ছিল,তাই ওরা আবার আমার সঙ্গেই যোগাযোগ করে এ ব্যাপারে। আমি তো ঠিক মঞ্চশিল্পী নই৷ আমি হলাম যাকে বলে বাথরুম সিঙ্গার। কিন্তু ওরাও নাছোড়বান্দা। শেষমেশ বিজ্ঞাপন দেওয়া হল এই বলে, যে ‘বুদ্ধদেব গুহর সঙ্গে দু’ ঘণ্টা কথা, গান আর গল্পে’। টিকিট বিক্রি ভালোই হয়েছিল। সব মিলিয়ে খুব ভালো অনুষ্ঠান হয়েছিল সেদিন।

আজ পূর্বা চলে গেছে, কিন্তু এটুকু ভেবে ভালো লাগছে যে সেদিনের অনুষ্ঠানের পর সমস্ত খরচ খরচা বাদ দিয়েও পূর্বার চিকিৎসার জন্য প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে দিতে পেয়েছিলাম ওর পরিবারের হাতে। হয়তো অনেক খারাপ কাজ করেছি, কিন্তু জীবনে এই একটা অন্তত ভালো কাজ করেছিলাম বলেই বিশ্বাস করি আমি।

ইদানীং প্রতি রোববারই অরুণের সঙ্গে কথা হত আমার। পূর্বার খবর নিতাম। কিন্তু শরীরের বিশেষ উন্নতি হচ্ছিল না ওর। মাঝে একবার তো অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়। তারপর করোনার থাবায় গত কয়েকমাস তো খুবই বিপর্যয় গেল। কী এমন বয়স অরুণের জামাইয়ের! সেও আচমকা চলে গেল করোনা আক্রান্ত হয়ে। খুব দুঃখ পেয়েছিলাম খবরটা শুনে। অরুণেরও তো বয়স হয়েছে। আমার থেকে কয়েক বছরের বড় ছিল ও। ইদানীং কানে ঠিকঠাক শুনতেও পায় না। তার মধ্যে একের পর এক শোকসংবাদে বড় ভেঙে পড়েছে। ওর কথা যখনই ভাবি, কষ্ট হয় খুব।

প্রতি রোববার অরুণের ফোন আসত। কিন্তু গত রোববার কোনও ফোন এল না। ফলে একটু চিন্তাতেই ছিলাম। তারপর আজ সকালে আমিই ফোন করি অরুণকে। তখনই এল এই দুঃসংবাদ। আমাদের সবাইকে ছেড়ে একা একা সুরোচির ধামেই যেন বিলীন হয়ে গেল পূর্বা। আজ ভাবি রবীন্দ্রনাথের এত গান তো শুনেছি জীবনভর। এত গায়কী, এত রকম কণ্ঠ। কিন্তু পূর্বা দামের মতো অমন কণ্ঠস্বর, অমন উচ্চারণ আর মগ্নতা আর কারও মধ্যে পেয়েছি কি কখনও? রবীন্দ্রগানের জগতে পূর্বার আসন চিরকালই স্বতন্ত্র।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More