শুক্রবার, মে ২৪

হাতে পায়ে ধরে বলেছিলাম পাহাড়ে যাস না, ছন্দার কথা মনে আছে তো!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাধ্যমিকের পরেই স্যারের হাত ধরে পাহাড়ের নেশা চেপে বসেছিল। এভারেস্ট জয় করেও সেই নেশা থামেনি। গিয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম দুর্গম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা জয় করতে। মায়ের বারণ শোনেননি। আর ফেরা হলো না। শৃঙ্গ জয় করে ফেরার পথে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলেই মৃত্যুমুখে ঢলে পড়লেন বিপ্লব বৈদ্য।

কলকাতার আনন্দপুর থানা এলাকার মাদুরদহের বাসিন্দা বিপ্লব বৈদ্য রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কর্মী। বছর ৪৮-এর বিপ্লববাবুর অল্প বয়স থেকেই পাহাড়ে চড়ার নেশা। এর আগে চীনের দিক দিয়ে এভারেস্ট জয় করেছিলেন তিনি। এভারেস্ট থেকে ফেরার পর মা বারণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি শোনেননি। ৫ মে কাঞ্চনজঙ্ঘার উদ্দেশে রওনা হন বিপ্লববাবু। বুধবার তাঁদের দল কাঞ্চনজঙ্ঘার শৃঙ্গ জয় করেন।

এজেন্সি মারফত খবর, ফেরার সময় হয় বিপত্তি। হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় বিপ্লববাবুর। এই অসুস্থতাকে বলা হয় ‘হাই অলটিটিউড পালমোনারি ইডিমা।’ সাধারণত সমুদ্রতল থেকে অনেকটা উঁচুতে থাকলে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। ফলে কেউ কেউ শ্বাসকষ্টে ভোগেন। এই পরিস্থিতিতে শরীরের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পাওয়ার জন্য ফুসফুসেও জল জমতে থাকে। ফলে অক্সিজেনের সরবরাহ আরও কমে গিয়ে হাঁটা-চলার শক্তি কমে যায়। অজ্ঞানও হয়ে যান কেউ কেউ। এই পরিস্থিতিতে আক্রান্তকে সঙ্গে সঙ্গে আইসিইউতে পাঠানো উচিত। বিপ্লববাবু ও আরেক পর্বতারোহী কুন্তল কাঁড়ার অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁদের সেখানে রেখেই চার নম্বর ক্যাম্পে ফিরে আসেন বাকি পর্বতারোহীরা। বৃহস্পতিবার এজেন্সি মারফত খবর পাঠানো হয়, সেখানেই মৃত্যু হয়েছে বিপ্লব বৈদ্যর।

স্ত্রী, দুই মেয়ে ও বৃদ্ধা মা রয়েছে বিপ্লববাবুর। স্ত্রী রেখা বৈদ্য একটি কলেজে পড়ান। তিনি জানিয়েছেন, “গতকাল খবর পেয়েছিলাম উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমি সবরকম ভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। যেটা জানতে পেরেছি হেলিকপ্টার পাঠিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা হচ্ছে। আমাকে অফিসিয়ালি এখনও কিছু বার্তা দেওয়া হয়নি।” ৭৫ বছরের বৃদ্ধা মা শান্তা বৈদ্য একেবারে ভেঙে পড়েছেন। কান্না মেশানো গলায় তিনি বলেন, “এভারেস্ট জয় করে ফিরে আসার পরে আমি হাতে পায়ে ধরেছিলাম। বলেছিলাম পাহাড়ে যাস না। ছন্দার কী হয়েছে দেখ। তোর দুটো বাচ্চা মেয়ে রয়েছে, আমি অসুস্থ বুড়ো মা রয়েছি। তোর স্ত্রী রয়েছে। কিছু হয়ে গেলে কে দেখবে? আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। আমি দিইনি। ও পাহাড় পাগল ছেলে ছিল। পাহাড়ই ওকে শেষ করে দিল। আমার কথা শুনল না। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। ওর মেয়ে দুটো ও স্ত্রীকে কে দেখবে?”

এই পরিস্থিতিতে শান্তাদেবীকে সামলাচ্ছেন বিপ্লববাবুর জ্যাঠার ছেলে আশিস বৈদ্য। তিনি বলেন, “খবর পেয়েছি, মৃত্যু হয়েছে। কী করব জানি না। সবার কাছে সাহায্য চাইছি।” বিপ্লববাবুর দেহ ফিরিয়ে আনতে কাঠমাণ্ডু রওনা হওয়ার কথা পরিবারের। কিন্তু অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে কীভাবে নিয়ে যাওয়া যাবেন সেটা নিয়েই চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।

বিপ্লববাবুর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পাড়ার লোকেরা ভেঙে পড়েছে তাঁর বাড়িতে। বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ তাঁর বাড়িতে আসে আনন্দপুর থানার পুলিশও। কিন্তু এত লোকের ভিড়েও থমথমে বাড়ির পরিবেশ। সোফায় বসে বৃদ্ধা শান্তাদেবী। মায়ের শূণ্য চোখ যেন এখনও খুঁজে চলেছে আদরের ছেলেকে।

আরও পড়ুন

কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে ফিরে বাবা মাকে নিয়ে হিমাচলে যাওয়ার কথা বলে গেছিল কুন্তল

Shares

Comments are closed.