বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

রবি ঠাকুরের নামে ডাইনোসর! আছে আমাদের কলকাতাতেই

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতা শহরেই রয়েছে সেই ডাইনোসর। মানে ডাইনোসরের ফসিল। আরও চমক হল, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামেই সেই ডাইনোসরের নাম। ভাবছেন তো জাদুঘরে? মোটেও তা নয়। তাহলে কোথায়?

এত অবধি পড়ে যদি অবাক লাগে, তাহলে বলতেই হয় এই তথ্যে বিন্দুমাত্র ভুল নেই। বরাহনগরের ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে আজও রাখা আছে লক্ষ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই ডাইনোসরের জীবাশ্ম। নাম ‘বারাপাসোউরাস টেগোরেই’।

ভারতেই মিলেছিল এই ডাইনোসরের হাড়গোড়। দক্ষিণের গোদাবরী উপত্যকায়। পূর্ণাঙ্গ কাঠামো আবিষ্কারের পর সেটা নিয়ে আসা হয় কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে। পরে রবি ঠাকুরের নামে নাম রাখা হয় সেই জীবাশ্মের। এই ডাইনোসরের খোঁজ এবং তার নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। এর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে বাংলার অন্যতম বিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ ও ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের নামও।

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে রবীন্দ্রনাথের..

প্রশান্তচন্দ্রের পড়াশোনা সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা গুরুচরণ মহলানবিশের নিজের হাতে তৈরি ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুলে। পদার্থবিদ্যায় তাঁর আগ্রহ ছিল অসামান্য। কলেজজীবন কাটে প্রেসিডেন্সিতে। ১৯১২ সালে পদার্থবিদ্যায় বিএসসিতে তুখোড় ফল করেন। পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংস কলেজ থেকে সাম্মানিক ‘ট্রাইপস’ পাশ করেন।

ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম বিদেশে গিয়ে এই সম্মান অর্জন করেছিলেন। অঙ্কের জাদুকর শ্রীনিবাস রামানুজানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় কেমব্রিজেই। দু’জনের মধ্যে গণিতের বিষয়ে আলোচনা হত বিস্তর। পদার্থবিদ্যার গবেষক মহলানবিশের পরিসংখ্যানতত্ত্বে আগ্রহ জন্মায়। তা ছাড়া, আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি, ভূতত্ত্ব, নৃতত্ত্ববিদ্যায় রীতিমতো গবেষণা ছিল তাঁর। কলকাতায় ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজেই স্ট্যাটিস্টিক্যাল ল্যাবোরেটরি তৈরি করেন। তবে অস্থায়ী। ১৯৩২-৩৩ সালে তাঁরই উদ্যোগে বরাহনগরে তৈরি হয় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট। শিক্ষকতার স্বার্থেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। কবিগুরুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। বরাহনগরের এই ক্যাম্পাসে বেশ কয়েকবার এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

প্রশান্তচন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী রানি মহলানবিশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে তৈরি হল ভূতাত্ত্বিক বিভাগ, দক্ষিণ থেকে ডাইনোসর এল কলকাতায়

বরাহনগর ক্যাম্পাসে বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে গবেষণা চলত। প্রশান্তচন্দ্রের উদ্যোগেই ভূতত্ত্বের বিভাগ খোলা হয় এই ক্যাম্পাসে। সেটা ১৯৫৭ সাল। তার আগে ১৯৫৪-তে ব্রিটেনের স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটি থেকে সাম্মানিক ফেলো নির্বাচিত হন তিনি। বরাহনগরের ক্যাম্পাসে নৃতত্ত্ববিদ্যা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। প্রশান্তচন্দ্রের আমন্ত্রণে বরাহনগর ক্যাম্পাসে আসেন লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের গবেষক-অধ্যাপক লামপ্লাউ রবিনসন। তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণ ভারতে তখন ডাইনোসরের জীবাশ্মের খোঁজ চলছে। ১৯৫৮ সালে তেলঙ্গানা নালগোন্ডায় গোদাবরীর উপত্যকায় ডাইনোসরের কিছু হাড়গোড় উদ্ধার হয়। নৃতত্ববিদরা জানান, সেটা ছিল বারাপাসোউরাসের কঙ্কাল। কয়েকটন হাড় নিয়ে রবিনসনের তত্ত্বাবধানে প্রত্নতত্ত্ববিদরা পৌঁছন বরাহনগরের ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে। সেটা ছিল ১৯৬১ সাল। ডাইনোসরের হাড়ের সমষ্টি জড়ো করে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয় বারাপাসোউরাসকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্মানে নাম রাখা হয় ‘বারাপাসোউরাস টেগোরেই’।

জুরাসিক যুগের ১৮ মিটার লম্বা ও ৭ টন ওজনের এই ডাইনোসর আজও সংরক্ষিত বরাহনগরের ক্যাম্পাসে। আইএফএস পারভীন কাসওয়ান সম্প্রতি এই নিয়ে তাঁর টুইটারে পোস্টও করেছেন। বলেছেন, বারাপাসোউরাস কথার অর্থ বড় লেজওয়ালা গিরগিটি। আর টেগোরাই হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এমন নামকরণ শুধু বাংলার নয়, দেশের গর্ব।

Comments are closed.