মঙ্গলবার, জুন ২৫

শম্ভু মিত্রের ‘বহুরূপী’তে কালির ছিটে! শ্লীলতাহানির অভিযোগ ঘিরে সংসারে অশান্তি

চৈতালী চক্রবর্তী

যত দিন ডিসিপ্লিন, তত দিন বহুরূপী। বলেছিলেন দলের প্রথম সভাপতি মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। বাংলা সংস্কৃতির পাতা উল্টালে আজও ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে এই দলের ‘ছেঁড়াতার’, ‘চার অধ্যায়’, ‘দশচক্র’, ‘রক্তকরবী’, ‘পুতুলখেলা’, ‘রাজা’ আর ‘রাজা অয়দিপাউস’, ‘বাকি ইতিহাস।’ ঐতিহ্যের সফর সাত দশকের। ‘গ্রুপ থিয়েটার’ নামের শব্দবন্ধ যেখানে উচ্চারিত হয় সেখানে স্বভাবতই এসে পড়ে ‘বহুরূপীর’ নাম। মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের ‘বহুরূপী’, শম্ভু মিত্রের ‘বহুরূপী’ একটা ঐতিহাসিক মাইলস্টোন, তারই আকাশে আজ ফের অশান্তির ছায়া। ফাটল একটা ধরেছিল আগেই, এ বার অভিযোগ উঠল শারীরিক হেনস্থার। ফেসবুক লাইভ করে এমন বিস্ফোরক অভিযোগ আনলেন দলেরই এক তরুণী নাট্যকর্মী। ঘটনার সত্যতা নিয়ে স্বভাবতই দু’ভাগে বিভক্ত এই নাট্য সংস্থা।

শম্ভু মিত্র

আগামী পয়লা মে ভারতের প্রথম সঙ্ঘনাট্য বা গ্রুপ থিয়েটার ‘বহুরূপী’ পূর্ণ করতে চলেছে তার ৭২ বছরের ঘটনাবহুল অস্তিত্ব। কোনও সংগঠন যখন তার বাহাত্তর বছরের বসন্ত পেরিয়ে আসে, তখন তার পারিপার্শ্বিকতা, তার নিজস্ব ধরন, ইতিহাস, কর্মকাণ্ড, ঘটনা পরম্পরা সবকিছু মিলিয়েই সে হয় সুবিশাল। তিল তিল করে গড়ে ওঠা বীণার তারে যখন একটা বেসুরো ঝঙ্কার ওঠে, তখন চোখ-কান এবং মননের জন্য সেটা খুব একটা স্বস্তিকর হয় না। যেমন হয়নি ‘বহুরূপী’র ক্ষেত্রেও। দলের ভিতরেই দিনে দিনে ফুলে-ফেঁপে উঠছে অরাজকতা, মহিলারা এখানে শারীরিক হেনস্থার শিকার— এমন অভিযোগের আওয়াজ উঠতেই ঝড় শুরু হয়েছে নাট্যদলের অন্দরে।

অভিযোগটা ঠিক কী?  সঙ্গীতা সরকার নামে দলেরই এক তরুণ নাট্যকর্মী সম্প্রতি ফেসবুক লাইভ করে ‘বহুরূপী’র পরিবারে সাম্প্রতিক সময় ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাকে নিজের অভিজ্ঞতায় ব্যাখ্যা করেন। প্রায় ৩২ মিনিটের এই লাইভে সঙ্গীতার দাবি ছিল, ‘‘আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করা হয়েছে নাট্য সংস্থার অন্দরে। সেটা করেছেন দলেরই এক প্রবীণ সদস্য। ঘটনার কথা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’’ তাঁর কথায়, ‘‘দলের সিনিয়ররা প্রথমে বিষয়টাতে তেমন গুরুত্ব দেননি। অনেকেই সামান্য ঘটনা মনে করে মানিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। পরে দলবদ্ধ ভাবে চিৎকার করে আমরা প্রতিবাদ করি। শুধু শারীরিক হেনস্থাই নয়, দলের এক সিনিয়র দিদিও আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন।’’

৭২ বছরের এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যখন দলবদ্ধ আওয়াজ ওঠে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই মতামত নানা টুকরো টুকরো পর্যায়ে ভেঙে যায়। পক্ষে ও বিপক্ষে বিশাল জনমত গড়ে ওঠে। এমনটা হয়েছে এই নাট্যদলের ক্ষেত্রেও। অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সরাসরি আঙুল তোলেননি সংস্থার সর্বময় কর্তৃপক্ষ থেকে নাট্যদলের প্রাক্তন সদস্যদের কেউই, তবে সকলেই তাঁদের নিজস্ব, ব্যক্তিগত মতামত জানিয়েছেন ‘দ্য ওয়াল’কে।

প্রায় ৪৪ বছরের বাঁধন ছিন্ন করে ‘বহুরূপী’ থেকে আলাদা হয়েছেন পার্থ গোস্বামী। বর্তমানে তিনি ‘স্পন্দন’-এর সঙ্গে যুক্ত। পার্থবাবুর মতোই দল ছেড়েছেন বুলু মজুমদার, শেখর হীরা-র মতো আরও কয়েকজন প্রাচীন ও প্রবীণ সদস্য। ঘটনার প্রসঙ্গে পার্থবাবুকে ফোনে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেন, ‘‘এমন অভিযোগের কথা কানে এসেছে। তবে পুরো ঘটনা না জেনে কিছু বলাটা ঠিক নয়। তবে যে অভিযোগ উঠেছে তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর, এটাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়াও যায় না আবার বলাও যায় না এর কোনও সারবত্তা নেই।’’ তাঁর কথায়, ‘‘মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে আমি বলতে পারি ক্রিয়েটিভ জগতে এই ঝড় নতুন কিছু নয়। একজন নবীন কবিকেও যেমন তাঁর প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তেমনি এক অভিনেতাকেও। মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন বঞ্চনা বা হেনস্থার ঘটনা ঘটলে তাকে সমাজের ভয়ে মুখে আঙুল দিয়ে চুপে করিয়ে দেওয়া হয়। উচ্চবিত্তের ক্ষেত্রে আবার অনেক সময় দেখা যায় ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আমার বক্তব্য, যদি এমন কিছু ঘটে থাকে সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে তার প্রতিকার করা উচিত।’’

নাট্যদলে ভাঙনের সুর যে বহুদিন আগেই বেজে গিয়েছিল তা একবাক্যে স্বীকার করেছেন পার্থবাবু। বহু স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বকে দল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। নিজের হাতে গড়া ‘বহুরুপী’ থেকে একসময় সরে এসেছিলেন শম্ভু মিত্র। দল ছেড়েছিলেন তৃপ্তি মিত্রও। বেরিয়ে এসে পরবর্তী সময়ে ‘পঞ্চম বৈদিক’ গড়েছিলেন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শাঁওলী মিত্রও। বছর দুয়েক আগে, দল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন দীর্ঘ দিনের তিন শিল্পী সুমিতা বসু, সুকৃতি লহরী এবং তুলিকা দাস। অভিযোগ, নতুন প্রজন্মের চারজনকেও বহিষ্কার করেছিল এই নাট্যদল। দলের পুরনো এই তিন অভিনেত্রী শুধুমাত্র অভিনয় বা নির্দেশনা নয়, দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বও সামলাতেন। তাঁদের কেউ ৩৬ বছর, কেউ ৩১ আবার কেউ ২৮ বছরেরও বেশি নাট্যদলের সঙ্গে আত্মার বন্ধন তৈরি করেছিলেন। অসন্তোষ যে দানা বেঁধেছিল বহুদিন আগে থেকেই, তিক্ততা যে বয়ে চলেছিল শিরায়-উপশিরায় সেটা স্বীকার করেছেন তাঁদের অনেকেই।

দেবেশ রায়চৌধুরী

ক্ষোভ-বিক্ষোভের দোলাচালে তাহলে কি কর্তৃপক্ষ বনাম বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর সরাসরি সংঘাত লাগল? ঝড় একটা উঠেছে নিঃসন্দেহে, তবে বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী বলে কোনও পৃথক তকমা সেঁটে দিতে রাজি নন নাট্যদলের অন্যতম মুখ, প্রবীণ নাট্যকর্মী দেবেশ রায়চৌধুরী। তাঁর মত কিছু ভিন্ন। তিনি বললেন, ‘‘বড় কষ্ট লাগে, বড় দুঃখ হয় যখন দেখি বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা কাদা ছোড়াছুড়ি করছে। এখন চারদিকেই অরাজকতা, অসন্তোষ চলছে। ডিসিপ্লিনের জায়গায় আঘাত আসছে, যারা মনে করছে মানিয়ে নিতে পারছে না তারাই অভিযোগ তুলছে। আমি কোনও নির্দিষ্ট দলের নয়, আমি এখানে কাজ করি। অসন্তোষ সব জায়গাতেই তৈরি হয়, মানিয়ে-গুছিয়ে নেওয়াটাই দস্তুর।’’ সেই সঙ্গেই তাঁর দাবি, ‘‘এক শ্রেণির লোক বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। হই হই তৈরি করে আনন্দ পায়। বিষয়টা নিঃসন্দেহে স্পর্শকাতর, তবে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে তবেই আওয়াজ তোলা উচিত। নতুন নতুন যারা দলে আসছে, কিছুদিন পরেই বলছে পার্ট চাই। না পেলেই রাগ, অসন্তোষ, কী বলবো!’’ প্রবীণ এই অভিনেতার কথায়, সামান্য ঘটনাকে বাড়িয়ে ব্যাখ্যা করে দলের দিকে কাদা ছোড়ার চেষ্টা চলছে। এটা কোনওমতেই বাঞ্ছনীয় নয়। ‘‘আমি যে এই বিষয়ে সায় দিচ্ছি সেটা একেবারেই নয়। আমি বলতে চাইছি অশান্তি ছড়িও না। ভালো করে কাজ কোরো। কাদা ছুড়ে প্রতিষ্ঠানকে বদনাম করে কোনও লাভ নেই, বরং মন দিয়ে কাজ করাটাই উচিত,’’ মত দেবেশবাবুর।

নাট্য সংস্থার সঙ্গে বহুদিন ধরেই যুক্ত সুশান্ত দাস। অভিযোগকে এক কথায় উড়িয়ে দিয়ে তাঁর দাবি, ‘‘ওরা নাকি বিভাসদাকে (চক্রবর্তী) জানিয়েছে। বিভাসদার সঙ্গে আমারও কথা হয়েছে। এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। একজন ৬৮ বছরের প্রবীণ ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেছে ওই মেয়েটি, যার কোনও সত্যতা নেই। এক বছর আগের একটা সামান্য ঘটনাকে এখন সামনে আনার কারণটা কী সেটাই বুঝতে পারছি না। কী উদ্দেশ্য তাদের, এটাই আগে দেখতে হবে।’’ সুশান্তবাবুর কথায়, অভিযোগ তুলেছে যে মেয়েটি সে নতুন এসেছে। অভিযোগের তীর যাঁর দিকে নাট্যদলের সেই প্রবীণ সদস্য ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। সম্প্রতি তাঁর স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। এখন তিনি বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না, হাঁটাচলা তো দূর। তাঁর মানসিক স্থিতিও ঠিক নয়। এমন একজন মানুষের বিরুদ্ধে এই জঘন্য অভিযোগ এনে কী প্রমাণ করতে চওয়া হচ্ছে? প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, ‘‘আমরা ঘটনা শোনার পর ব্যবস্থাও নিয়েছি। ওই প্রবীণ ব্যক্তি প্রকাশ্যে মেয়েটির কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। আমরা তাঁকে দল থেকে বসিয়ে দিয়েছি।’’

রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত

সাম্প্রতিক অভিযোগ এবং দল ভাঙা-গড়া নিয়ে কিছু ভিন্নধারার মতামত দিয়েছেন চুরাশি বছরের প্রবীণ নাট্যকর্মী রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। ‘‘আমি নিজে থিয়েটারের ব্যাপারে যা প্র্যাকটিস করার চেষ্টা করি তা হলো, আমার পরিবারে যদি কোনও ঝগড়া হয় তাহলে আমি পরিবারে থেকেই যন্ত্রণা সহ্য করে লড়াই করবো। আমার বউকে ডিভোর্স দিয়ে আলাদা করে কটূক্তি করবো না, তাঁকে পাশে রেখেই তাঁর সঙ্গে লড়াই চালাব। আমার দলেও আমি তো সবসময় ঠিক করিনি, ভুলও করিনি। মতান্তর হয়েছে, মনান্তরও হয়েছে, কিন্তু আমি কখনও দল ছেড়ে চলে যাই নি। কারণ মনে করেছি দল ছেড়ে চলে যাওয়াটা ঠিক নয়। কোনও সংগঠন, সেটা পরিবার থেকে শুরু করে সরকার, রাজনৈতিক দল বা থিয়েটারের দল— ঝগড়া করার অধিকার তারই থাকে, যে সংগঠনের মধ্যে থেকে গিয়ে ঝগড়া করে।’’ ব্যাখ্যা তাঁর। বলেছেন, ‘‘আমি চাই ঝগড়া না বাড়ুক, মিটমাট হোক। শান্তি ফিরে আসুক।’’

মৌলবাদী রাজনীতির চাপে বিরক্ত হয়ে শম্ভু মিত্র গণনাট্য ছেড়ে আসেন ১৯৪৮-এর জানুয়ারির শুরুতে। ওই বছরের মাঝামাঝিই গোড়াপত্তন হয় ‘বহুরূপী’-র (তখনও নামকরণ হয়নি)। পুরনোদের মধ্যে শম্ভু মিত্রের গণনাট্যের সঙ্গী এবং তাঁর ফ্রেন্ড, ফিলোসপার, গাইড মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য বটগাছের মতোই আগলে রেখেছিলেন এই নাট্যদলকে। ১৯৫০-এ তাঁরই কথামতো দলের নাম হয় ‘বহুরূপী’। বাহাত্তর বছরের মাথায় সেই ‘বহুরূপী’র অন্দরেই জমাট বাঁধা এই অসন্তোষ এবং অস্বস্তিকে মেনে নিতে পারছেন না কোনও নাট্যব্যক্তিত্বই।

Comments are closed.