মঙ্গলবার, নভেম্বর ১২

রাষ্ট্র শব্দের অর্থ খুঁজছে যোগাযোগ হারানো কাশ্মীর

শ্রীনগর থেকে তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

যে ফ্লাইট কলকাতা থেকে শ্রীনগর নিয়ে এল সেটার প্রথম এবং একমাত্র স্টপ ছিল চণ্ডীগড়।  সকাল সাতটার দিকে যখন চণ্ডীগড় পৌঁছলাম তখনই পুরো ফ্লাইট খালি হয়ে গেল।  মনে হচ্ছিল আমি একাই কি শ্রীনগরের যাত্রী! ভুল ভাঙল খানিক পরেই।  পিলপিল করে বোর্ডিং শুরু হল।  ফ্লাইট ভরে গেল। সেইসব মানুষের নব্বই শতাংশের চোখেমুখেই কাশ্মীরি ছাপ স্পষ্ট।

গুঞ্জনে কান পাতলে টের পাওয়া গেল উদ্বেগ আর স্বস্তির যৌথ দীর্ঘশ্বাস। উপত্যকার বহু মানুষ বাইরে থেকে বাড়ি ফিরছেন দীর্ঘদিন পর।  তাঁরা আটকে পড়েছিলেন অবরোধের জন্য।  চোখ আটকে গেল এক যুবতীর হাতে আগলে রাখা লম্বা পুতুলে।  হয়তো ছোট্ট মেয়ের জন্য কিনেছিলেন বাইরে থেকে কিন্তু বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেল।

শ্রীনগরে নামতেই ঝাপটা মারল চেনা ঠান্ডা পাহাড়ি হাওয়া।  ওই হাওয়াটুকুই চেনা।  এয়ারপোর্ট থেকে ডাল লেকের দিকে যত এগোচ্ছে গাড়ি, রাস্তাঘাটের শুনসান ভাব স্পষ্ট।  অবরোধ বলা যায় না, শ্রীনগর এখন আর অবরুদ্ধ নয়। নিষেধাজ্ঞা উঠে গিয়েছে উপত্যকা থেকে।  চোখে পড়ল স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদেরও।  যদিও স্বাভাবিক ভাবে ফেরেনি সেই স্বতঃস্ফূর্ততা।

অক্টোবর মাসে ভরা ট্যুরিস্ট সিজন থাকে কাশ্মীরে।  এ বার তাঁদের সংখ্যা হাতেগোনা।  গাড়ি চলছে সংখ্যায় কম।  দোকান খুলেছে কিছু কিছু।  অল্প দূরত্বের ব্যবধানে মোতায়েন অসংখ্য সেনাকর্মী।  ডাল লেকে পৌঁছে উঠতে হল হাউজবোটে, কারণ হোটেল বা রিসর্ট কিছুই খোলেনি এখনও।  শুনলাম অসংখ্য বুকিং বাতিল হয়েছে অগস্টের এক্কেবারে গোড়া থেকে।

ডাল লেকে আমার আস্তানা নিউ মুন হাউজবোট।  সেটির মালিক তারিক আহমেদ বলছিলেন, “এ বছর জুন-জুলাই মাসে খুব ভাল চলছিল ব্যবসা। ফেব্রুয়ারির পুলওয়ামা কাণ্ডের পরেও আমরা পর্যটকদের আলাদা করে ফোন করে গ্যারান্টি দিয়েছিলাম নিরাপত্তার।  তাঁরা আসতে শুরুও করেছিলেন।  কিন্তু অগস্ট মাস থেকে আচমকা সব শেষ।  আড়াই মাস ধরে বন্ধ সব কিছু।

এই পরিস্থিতির ভাল বা খারাপ কী হবে, সেটা ভবিষ্যৎ বলবে।  কিন্তু সাধারণ মানুষ এত অসুবিধার মধ্যে থাকবে কী করে? অন্য রাজ্যের মানুষের সঙ্গে সমানাধিকারের কথা বলা হচ্ছে, মানছি।  কিন্তু এমন ৭২ দিন যোগাযোগহীন জীবন অন্য রাজ্য মেনে নেবে কি?

ইকবাল লোনও একটি হাউজবোটের মালিক।  হতাশা ও বিরক্তি গোপন না করেই বললেন, “কেন্দ্র যদি কাশ্মীরের উন্নয়নের জন্যই এই পদক্ষেপ করে থাকে তা হলে এ বিষয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মতামত হয়তো অপ্রয়োজনীয়।  কিন্তু সরকারকে এটাও বুঝতে হবে উপত্যকার অর্থনীতি, সমাজনীতি বাকি দেশের থেকে অনেকটা আলাদা।  মানুষের জীবনধারণ পদ্ধতিও আলাদা।  শ্রীনগরকে আর পাঁচটা ঘিঞ্জি ও দূষিত শহর হিসাবে দেখতে ভাল লাগবে কি? কলকারখানা, শিল্প – এসব শুরু হোক, কিন্তু তার বিনিময়ে ক্ষুদ্র শিল্প যদি হারিয়ে যায়, বহু বছর ধরে চলে আসা সংস্কার ও ঐতিহ্য যদি বাণিজ্যের কবলে পড়ে হারিয়ে যায়, তা হলে কি তা দেশের জন্য মঙ্গল?” প্রশ্ন করে থেমে যান তিনি।

সেই কথার জের টেনেই তারিক বলেন, “আমরা দেশের বিরুদ্ধে নই।  আমরা ভারতের থেকে বিচ্ছিন্নও নই।  কিন্তু দেশের জন্য নিজেদের জাতিসত্ত্বাটুকু হারিয়ে ফেলতে চাই না।  এই বিবাদের সমাধান এত বছরে হয়নি।  শুধু ৩৭০ ধারা তুলে দিলেই সমাধান হয়ে যাবে, সে কথা বিশ্বাস করি না। ”

মোদীর সিদ্ধান্তে কি ক্ষুব্ধ আপনি? প্রশ্ন করেছিলাম প্রৌঢ় ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী রফিক আহমদকে।  নির্বিকার গলায় তিনি বললেন, “মোদীকে একা দোষ দিয়ে কী হবে? কাশ্মীর নিয়ে ফায়দার রাজনীতি কোন দল করেনি? এমনকি আমাদের স্থানীয় নেতানেত্রীরাও কি ছেড়েছেন আমাদের! কম দুর্নীতি করেছেন? এত দিন সেনার অত্যাচার ছিল।  এখন কাশ্মীর সরকার আর পুলিশরাও তো ছাড়ে না। অত্যাচার আর উর্দি যেন এখন সমার্থক শব্দ। ”

দুপুরের দিকে বিশেষ একটি জায়গায় আসতে হল স্থানীয় এক বন্ধুর সাহায্য নিয়ে।  একটা আধুনিক হোটেল, সেখানে একটা হলঘরে গোটা পাঁচেক কম্পিউটার রাখা।  এক একটি কম্পিউটার ঘিরে রয়েছে দশ-বারো জনের জটলা। গোটা রাজ্যের সংবাদমাধ্যম চলছে ওই ঘর থেকেই।  এক একটি কম্পিউটার বড়জোর দশ থেকে পনেরো মিনিট ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে।  খুলছে শুধুমাত্র ইমেল।  রিপোর্টাররা ঊর্ধ্বশ্বাসে ফাইল করছেন সারাদিনের খবর, পাঠাচ্ছেন ছবি।  আমরা, যারা চব্বিশ ঘণ্টা হাতের মুঠোয় ইন্টারনেট নিয়ে বাঁচি, তাদের জন্য এই পদ্ধতি যেন অসম্ভব ঠেকছে।  এই অসম্ভব নিয়েই ৭২ দিন কাটিয়ে ফেলল উপত্যকা।

ওই হলঘরে আলাদা করে মেয়েদের জন্য রাখা যে যন্ত্রটি বরাদ্দ, সেখানে আলাপ হল বাকি সাংবাদিকদের সঙ্গে।  সকলেই নিজের নিজের কাজ নিয়ে তুমুল সমস্যায়।  শুধু কাজ নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও অসংখ্য অসুবিধা।  এক তরুণী সাংবাদিক জানালেন, তাঁর মা আগের দুটো কেমো নিতে পারেননি অবরোধের জন্য।  কাশ্মীর রিডার্সের সাংবাদিক নুসরত সিদ্দিক বলছিলেন, “পোস্টপেড মোবাইল কানেকশন সবে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে।  তার আগে এটুকুও ছিল না।  অথচ রাতবিরেতে অসুখবিসুখ ছিল আমাদের ঘরে ঘরে।  ছিল ছোট বড় নানা বিপদ।  হাতে ফোন শুধু নেই তা নয়, ঘর থেকে বেরনোর নিরাপত্তা নেই।  মানবাধিকার লঙ্ঘন করে অভিন্ন সংবিধান বা সমানাধিকার বা অন্য কোনও অধিকার তো পেতে চাইনি।  অথচ এত মাস ধরে যাদের পড়াশোনা হল না, যাঁরা কাজ করতে পারলেন না, তাঁরা অধৈর্য হলেই সমস্যা বাড়ছে। ”

এ যেন এক জটিল ধাঁধা।  এই ধাঁধার আবর্তে ঘুরছেন ৬৫ বছরের তারিক থেকে পঁচিশ বছরের নুসরত।  প্রজন্মের ব্যবধান থাকলেও তাঁরা আসলে চাইছেন একটাই জিনিস।  রাজনীতির এই টানাপোড়েন থেকে মুক্তি।  তাই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, টেলি যোগাযোগের স্বাভাবিক অধিকার চাইছেন তাঁরা, চাইছেন শান্ত হোক উপত্যকা।  ভরে উঠুক পর্যটকে।  কিন্তু কী ভাবে? সে উত্তর কারও কাছে নেই।

প্রৌঢ় তারিকের কথায়, তাঁরা, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ আসলে লোভ আর রাজনীতির শিকার হয়ে গেছেন নিজেদের অজান্তে।  আর সেই পাকেচক্রে এখন এক এক সময় তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রব্যবস্থা শব্দের অর্থ কী, সেই শব্দের অর্থ কী ‘রাজনীতি’ শব্দটাকে ছাপিয়ে যাবে না কোনও দিন!

গান্ধীজির ট্যাঁকঘড়িটা চুরি গেল

Comments are closed.