মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

স্কেটবোর্ডে চড়ে স্বপ্নের উড়ান মাছবিক্রেতা মায়ের ছোট্ট মেয়ের, সাগরপাড়ের রুপোলি পর্দায় কুড়োল প্রশংসা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সম্প্রতি আটলান্টা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হয়েছে একটি ভারতীয় শর্ট ফিল্ম। ‘কমলি’ নামের সেই ফিল্মটি দেখে, মুগ্ধ সাগরপাড়ের দর্শকেরা। অনেকেই আশা করছেন, এ বছরের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড প্রাপক হিসেবে গণ্য হতে পারে এই ভারতীয় সিনেমাটি।

কিন্তু আপনি আরও অবাক হবেন, এই সিনেমার অন্তরালে থাকা আসল গল্পটার কথা জানলে। জীবন থেকে নেওয়া এ গল্পের বাস্তব নির্যাসটুকুই ফুটে উঠেছে সিনেমায়। তেমন কোনও ‘সিনেম্যাটিক’ উপাদানের প্রয়োজনই হয়নি সিনেমায়। এমনটাই জানাচ্ছেন পরিচালক সাশা রেইনবো, যিনি আদতে নিউজ়িল্যান্ডের মানুষ হলেও কাজের সূত্রে বাস করেন লন্ডনে। এবং সেখান থেকে ভারতে উড়ে এসেছিলেন, ছোট্ট মেয়ে কমলিকে নিয়ে সিনেমা তৈরি করতে।

চেন্নাই সংলগ্ন সৈকত-শহর মহাবলীপুরমের বাসিন্দা সুগন্থি নামের এক সিঙ্গল মাদার আর তাঁর ন’বছরের ছোট্ট মেয়ের জীবনের গল্প নিয়েই সিনেমাটি তৈরি করছেন সাশা। সুগন্থি পেশায় মাছ বিক্রেতা। বহু কষ্টে বড় করছেন মেয়ে কমলিকে। কিন্তু সে মেয়ের বড় হওয়া খুব সাধারণ নয়। নিজের দু’পায়ে হেঁটে নয়, স্কেটবোর্ডে চড়ে, সাঁ সাঁ করে ছুটে চলার জীবন তার। সেই জীবনের গল্পই সিনেমার ফ্রেমে বেঁধেছেন সাশা।

দেখুন সেই সিনেমার ট্রেলার।

সুগন্থির যখন বিয়েটা ভেঙে যায়, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৪। তাঁর এক ভাই সার্ফিং গাইড ছিলেন সমুদ্র উপকূলের। সেই ভাইয়েরই এক বন্ধু একটি স্কেটবোর্ড উপহার দেন কমলিকে। সে তখন অনেক ছোট, বড় জোর বছর পাঁচেক বয়স তার। তখন থেকেই স্কেটবোর্ড নিয়ে খেলত কমলি। যদিও তার এলাকায় মেয়েদের স্কেটবোর্ডে চড়ে ঘোরাটা মোটেই চেনা দৃশ্য ছিল না, তবু কখনও বাধা দেননি সুগন্থি। চেয়েছিলেন, তাঁর মেয়ে শক্তিশালী হোক, মেয়ে বলে সমাজের তৈরি করা সব রকমের কমতি ও খামতিকে জয় করুক নিজের ইচ্ছেয়।

তা-ই হয় এক সময়। প্রথম প্রথম পাড়া-প্রতিবেশীর চোখে লাগলেও, এক সময়ে স্কেটবোর্ডে করে কমলির ছুটে চলা যেন গোটা এলাকার লিঙ্গবৈষম্য ভাঙার প্রতীক হয়ে ওঠে। তার কথা জানতে পেরে প্রথমে এক বার ভারতে এসেছিলেন সাশা রেনবো। লন্ডনের গানের ব্যান্ড ‘ওয়াইল্ড বিস্ট’-এর একটি গান, ‘আলফা ফিমেল’-এর ভিডিও শ্যুট করার জন্য কমলিকে বেছে নিয়েছিলেন সাশা। সেই ভিডিও বেশ জনপ্রিয় হয়। কিন্তু পরে, কমলির জীবনের গল্প আরও গভীর ভাবে নাড়া দেয় সাশাকে। তিনি দু’বছর পরে ফের ফিরে আসেন ভারতে। ঠিক করেন, শর্ট ফিল্ম তৈরি করবেন কমলিকে নিয়ে।

দেখুন আলফা ফিমেল গানের সেই মিউজ়িক ভিডিও।

“কমলির জীবনটা যেন ভারতবর্ষের একটা অবিশ্বাস্য গল্প। কমলির জীবনটা শেখায়, কেবল একটা মানুষের হাত ধরে কেমন করে পরিবর্তন শুরু হতে পারে। আমি মনে করি, ভারতের মতো একটি দেশে কমলির মা, সুগন্থির মতো মানুষেরা আসল হিরো। ওঁদের সাহসকে কুর্নিশ জানানো উচিত সারা দেশের। আমি বিশ্বাস করি, সমাজে যখন মেয়েদের সমানাধিকার নিয়ে এত দ্বন্দ্ব, মেয়েদের অবস্থান যখন ক্রমেই নীচে নামছে, তখন এরকম সাহসের সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যের মোকাবিলা করা সহজ নয়। ছোট্ট মেয়ের পায়ে ঘুঙুরের মদলে স্কেটবোর্ড বেঁধে দিতে যথেষ্ট দম লাগে।”– বলছিলেন ছবির পরিচালক সাশা রেনবো।

সুগন্থি জানালেন, বিচের ধারে মশলাদার মাছভাজা বিক্রি করাই তাঁর পেশা। কিন্তু তিনি চান না, তার কোনও প্রভাব তাঁর মেয়ের জীবনে পড়ুক। তিনি চান, কমলি স্কেটবোর্ডের চাকায় অনেক লম্বা উড়ান নিক। তিনি বলেন, “আমার পরিবার, বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশী– কেউ রাজি হয়নি, আমার মেয়ে স্কেটবোর্ডে ছুটুক। সকলেই শুধু বলেছে, পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙলে গোটা জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে কমলির। ওর বিয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু আমি এ সব কথায় কান দিইনি। আমি চেয়েছিস ও আরও বড় হোক। ও যেন আমার মতো সীমাবদ্ধ জীবন না কাটায়!”

আটলান্টায় কমলির সিনেমা রিলিজ় করার পরে ইন্টারনেট জগতে ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছে কমলি। তার ট্রেনিংয়ের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন টোনি হক নামের এক পেশাদার স্কেটবোর্ডারও। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছে খুব দ্রুত।

দেখুন ভিডিও।

ক্লাস ফাইভের ছাত্রী কমলি সব মিলিয়ে খুব খুশি। বলছে, “আমার খুব ভাল লাগছে। আমি স্কেটবোর্ডে চড়েই দুনিয়া জয় করতে চাই।”

Comments are closed.