শুক্রবার, নভেম্বর ১৫

‘স্বামীকে ফিরিয়ে আনুন বাবু, ছেলেমেয়েগুলোর পেটে বড় খিদে,’ বিজিবি ফেরায়নি প্রণবকে, হাহাকার স্ত্রী রেখার

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ১১৭ নম্বর ব্যাটেলিয়নের বাবুদের বেশ চেনেন রেখা। এই ব্যাটেলিয়ন একটু কড়া ধাঁচের। হুটহাট করে বিএসএফ ক্যাম্পে মাছ ধরার অনুমতি মিলত না। তবে টানাটানির সংসারে অত ভাবনাচিন্তা করলে চলে না। সীমান্তের নিয়ম, জলসীমার কড়াকড়ি বোঝেন না তাঁরা। জালে একটু বেশি মাছ উঠলেই, দু’বেলা ভরপেট খাবার। আর ইলিশ ধরা দিলে তো কথাই নেই। মাছ ধরতেই তো গিয়েছিল মানুষটা। প্রণব মণ্ডল। আর ফিরে আসেনি।

“আমার স্বামীকে ফিরিয়ে এনে দিন বাবু। ও না থাকলে সংসার চলবে কী করে? ছেলেমেয়েগুলোর যে বড় খিদে!” চোখের জল বাঁধ মানছে না প্রণব মণ্ডলের স্ত্রী রেখার। বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়ের সংসার। চাল-ডাল বলতে ঘরে কিছুই মজুত নেই। এখন দিন চালাতে প্রতিবেশীদের দয়া। হাঁটাচলা করতে গেলে এখন হাত-পা কাঁপে বৃদ্ধা নিরুবালা মণ্ডলের। বলেছেন, “ছেলে না ফিরলে আমরা আর বাঁচব না। ওর রুজিতেই তো সংসার চলে। এখন খাব কী?”

দুই সঙ্গী অচিন্ত্য ও বিকাশকে নিয়ে ইলিশ ধরতে গিয়েছিলেন প্রণব। বাকি দু’জন বিএসএফের সঙ্গে ফিরে এলেও প্রণব ফেরেননি। গত দু’দিন ধরে বাড়ি আর বিএসএফের ক্যাম্পেই ছুটোছুটি করছেন রেখা। খাওয়া জুটছে না। স্বামী বেঁছে আছেন কিনা শঙ্কা আর উৎকণ্ঠার প্রতিটা মুহূর্ত যেন বড়ই লম্বা। ধার করে কেনা নৌকা, জাল। সঞ্চয়ের ভাঁড়ারও শূন্য।

প্রণবের স্ত্রী রেখা

প্রণবের পরিবার শুধু নয়, গোটা শিরচর তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। বিজিবির হেফাজতে এখনও আটক প্রণব। এ দিকে বাংলাদেশের বিজিবির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে এলেও বিএসএফের ক্যাম্প থেকে রেহাই মেলেনি অচিন্ত্য ও বিকাশের। শনিবার সকালে কাকমারি বিপিও-তে আসেন বিএসএফের অ্যাডিশনাল ডিজি সঞ্জীব সিং। তিনি বলেন, “আমরা দ্রুত প্রণবকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। বিজিবি অন্যায়ভাবে গুলি চালিয়েছে। আমাদের একজন হেড কনস্টেবল মারা গেছেন। এটা দুঃখজনক ঘটনা। দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে।”

ঘটনার সূত্রপাত বুধবার সকালে। পদ্মানদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন জলঙ্গির বাসিন্দা তিন ভারতীয় মৎস্যজীবী প্রণব মণ্ডল, অচিন্ত্য মণ্ডল এবং বিকাশ মণ্ডল। অভিযোগ, সীমান্ত লঙ্ঘনের দাবি তুলে তাঁদের আটক করে বিজিবি। প্রণব মণ্ডলকে নিজেদের হেফাজতে রেখে বাকিদের হুকুম দেয় বিএসএফকে ডেকে আনতে। অচিন্ত্য ও বিকাশ ১১৭ নম্বর ব্যাটেলিয়নের কাকমারি বিএসএফ ক্যাম্পে এসে গোটা বিষয়টা জানান। তাঁদের সঙ্গে নিয়েই স্পিডবোটে চেপে বিজিবি-র সঙ্গে ফ্ল্যাগ মিটিং করতে রওনা দেন বিএসএফ জওয়ানরা। বিএসএফের অভিযোগ,  ফ্ল্যাগ মিটিং হওয়ার পরেও ওই মৎস্যজীবীকে ছাড়া দূরের কথা, বিএসএফের কর্মী আধিকারিকদেরও ঘিরে ফেলার চেষ্টা হয়। পরিস্থিতি আন্দাজ করে ফেরার পথ ধরতেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলি লাগে হেড কনস্টেবল বিজয়ভানের মাথায়। আর এক জওয়ান রাজবীর সিংয়ের ডানহাতে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ ৫১ বছরের বিজয়ভান ও স্পিডবোট চালক রাজবীরকে বৃহস্পতিবার রাতেই সাগরপাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতেই মৃত্যু হয় বিজয়ভানের। গুরুতর জখম রাজবীরও।

এই ঘটনার পরেই দুই দেশের সীমান্তরক্ষীবাহিনীদের মধ্যে চাপানউতোর তুঙ্গে ওঠে। বিজিবি দাবি করে, স্পিডবোটে চেপে বিএসএফের ৬ জন জওয়ান বাংলাদেশের জলসীমার ভিতরে প্রায় ৪০০ মিটার ঢুকে এসেছিলেন। তাঁরাই গুলি চালিয়েছিলেন। ফলে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালাতে হয় বিজিবিকে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের  সীমান্তরক্ষীবাহিনীদের অভিযোগ উড়িয়ে বিএসএফ পাল্টা দাবি করে, বিজিবির সঙ্গে ফ্ল্যাগ মিটিং করে ফিরে আসার সময়েই তাদের দিকে গুলি ছোড়ে বিজিবি। ভারতীয় বাহিনী কোনও রকম অশান্তি করেনি, গুলি চালানো তো দূর। একটাও বুলেট খরচ করেনি বিএসএফ। কিন্তু, অন্যায় ভাবে হামলা চালিয়েছে বিজিবি।

আরও পড়ুন:

বিজিবি গুলি ছুড়েছে, আমরা নয়, দাবি বিএসএফের

পড়ুন দ্য ওয়াল-এর পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

Comments are closed.