কাউন্টডাউন শুরু! সেজে গুজে পিঁড়িতে বসেছে চন্দ্রযান ২, শুভদৃষ্টি বেলা ২টো ৪৩ মিনিটে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এগিয়ে আসছে সময়। ইতিহাস গড়তে চলেছে ভারত। চন্দ্রাভিযানের বাকি আর মাত্র ঘণ্টা দুয়েক। ভারতীয় সময় বেলা ২টো ৪৩ মিনিট নাগাদ ‘বাহুবলী’র পিঠে চেপে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর দিকে হুশ করে উড়ে যাবে চন্দ্রযান-২। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে এখন সাজো সাজো রব। লঞ্চ প্যাড সাজিয়ে কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে রবিবার সন্ধে ৬টা ৪৩ মিনিট থেকে।

১০..৯..৮..৭— ২০ ঘণ্টার অপেক্ষা ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে। প্রতি সেকেন্ড উত্তেজনায় ভরপুর। ১৪ জুলাই ঠিক এমনি একটা উত্তেজনার মুহূর্তে অন্ধকার নেমে এসেছিল সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে। ঠিক ৫৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড আগে থেমে গিয়েছিল কাউন্টডাউনের ঘড়ি। তার কারণ চন্দ্রযানের বাহক রকেট ‘বাহুবলী’র রোগ ধরা পড়েছিল ঠিক সেই সময়তেই। ইসরোর বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, জিএসএলভি মার্ক থ্রি ওরফে বাহুবলী রকেটের ক্রায়োজেনিক জ্বালানির স্তরে ধরা পড়েছিল গণ্ডগোল। ফলে উৎক্ষেপণ থামিয়ে না দিলে, গ্যাস লিক করে মুখ থুবড়ে পড়ত অতি যত্নে তৈরি করা আদরের চন্দ্রযান।

গতকাল, রবিবার ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন জানিয়েছেন, রোগমুক্ত হয়েছে চন্দ্রযানের বাহক ‘বাহুবলী।’ সলিড ও লিকুইড প্রপেল্যান্ট চেম্বারের মেরামতি শেষ হয়েছে। ভালভের চাপও এখন বশ মেনেছে। UH25 জ্বালানি ভরাও শেষ। অতএব সেজে গুজে পিঁড়িতে বসে পড়েছে চন্দ্রযান ২। আমেরিকা, রাশিয়া, চিনের পরে চতুর্থ দেশ হিসেবে আজই বাজিমাত করে দেবে ভারত। নতুন ইতিহাস লিখবে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ইসরো।

প্রতীক্ষার এই চরম মুহূর্তে ফিরে দেখা যাক ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযানের সাত সতেরো

স্বপ্ন দেখা শুরু..

প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম তাঁর বই ‘দ্য সায়েন্টিফিক ইন্ডিয়ান’-এ লিখেছিলেন ভারতের খনিজ ভাণ্ডারে একদিন টান পড়বে। সৌরমণ্ডল খুঁজে সেখান থেকে মণি, মাণিক্য, রত্ন ভাণ্ডার তুলে এনে অভাব মেটাতে হবে দেশকে। স্বপ্নের শুরু সেখান থেকেই। সৌরমণ্ডলে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন চাঁদ। নীল গ্রহের এই আত্মজা-র থেকেই খনিজ তুলে এনে ভাঁড়ার ভরবে ভারত, এমন স্বপ্নই দেখেছিলেন ইসরো তাবড় বিজ্ঞানীরা। ২০০৮ সালে চাঁদের পাহাড় খুঁজতে গিয়েছিল চন্দ্রযান ১। তবে উনিশের এই দ্বিতীয় অভিযান আরও বেশি পরিণত, পরিপক্ক।

চন্দ্রযান ২। এর তিনটি ভাগ। অরবিটার, অর্থাৎ স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ, যা চাঁদের কক্ষপথে ঘুরবে। ল্যান্ডার ‘বিক্রম’, যা চন্দ্রযানকে চাঁদের মাটিতে নামাতে সাহায্য করবে। এবং রোভার ‘প্রজ্ঞান’, অর্থাৎ মূল অনুসন্ধানকারী যান, যা চাঁদের মাটিতে জল ও অন্যান্য খনিজ পদার্থের সন্ধান চালাবে। এই চন্দ্রযানের বাহকও অত্যন্ত শক্তিশালী, সর্বাধুনিক ‘জিএসএলভি-মার্ক-৩’। সব মিলিয়ে চন্দ্রযানের তিনটি অংশ এবং মূল মহাকাশযানের মিলিত ওজন প্রায় ৩৮৫০ কেজি।

‘জিএসএলভি-মার্ক-৩’-এরও রয়েছে একটি ‘অরবিটার’। যা চাঁদের বিভিন্ন কক্ষপথে থেকে প্রদক্ষিণ করবে। ইসরো জানিয়েছে, উৎক্ষেপণের পর ১৭ দিন ধরে গতি বাড়িয়ে ৬ গুণ করা হবে, যার সাহায্যে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে চাঁদের দিকে এগিয়ে যাবে চন্দ্রযান-২। প্রায় দেড় মাস পর সেপ্টেম্বরে চাঁদের পিঠে পা ছোঁয়াবে ল্যান্ডার ‘বিক্রম’। ল্যান্ডারটি নেমে আসার সময় চন্দ্রযান-২-এর অরবিটারটি চাঁদের পিঠ (লুনার সারফেস) থেকে থাকবে মাত্র ১০০ কিলোমিটার উপরে।

২২ জুলাই দুপুরে রওনা দেওয়ার পরে পৃথিবীর কক্ষপথে পাক খেতে খেতে ক্রমশ চাঁদের দিকে গতি বাড়াবে চন্দ্রযান। ২৩ দিনের পাতায় ১৪ অগস্ট পৃথিবীকে গুডবাই জানিয়েছে চাঁদের কক্ষপথের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাবে। ২২ সেপ্টেম্বর চাঁদের কক্ষে পা রাখবে ‘বাহুবলী।’ সময়সূচী মতো পৃথিবী ছাড়ার ৫৪ দিনের মাথায় চাঁদে জমিয়ে বসার কথা চন্দ্রযানের, তবে প্রথম উইনডো নষ্ট হওয়ায় সেই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা হবে। দক্ষিণ মেরু (৭০ ডিগ্রি অক্ষাংশে) দিন অর্থাৎ সূর্যের আলো থাকতে থাকতেই কাজ শুরু দেবে চন্দ্রযানের রোভার ‘প্রজ্ঞান’।

আজই চাঁদে পাড়ি না দিলে বড় ক্ষতি হতো, জানিয়েছে ইসরো

১০০০ কোটি প্রকল্প তছনছ হতো সন্দেহ নেই, কাজ করার সময়ও পিছিয়ে যেত চন্দ্রযানের।

তার একটা বড় কারণ হলো, চাঁদের অন্ধকার পিঠ মানে দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সেটা চাঁদের প্রদক্ষিণের সময় ধরে ঠিক হয়। সেই মাফিক উইনডো নির্বাচন করেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। এই উইনডো ঠিক হয় চাঁদের প্রদক্ষিণের সময়কাল ধরে।মহাকাশবিজ্ঞানীদের কথায়, চাঁদে এক দিন হয় পৃথিবীর ২৮ দিনের হিসেবে। অর্থাৎ নিজের কক্ষপথে লাট্টুর মতো ঘুরপাক খেতে চাঁদ সময় নেয় পৃথিবীর ২৮টি দিন। পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতেও চাঁদ ওই একই সময় নেয়। এই ২৮ দিন সময়ের মধ্যে চাঁদের কোনও একটি এলাকায় সূর্যের আলো থাকে ১৪ দিন ধরে। পরের ১৪ দিন থাকে অন্ধকার।

ইসরোর ল্যান্ডার বিক্রম এবং রোভারের যেগুলির চাঁদে পিঠে নামার কথা, তারা কাজ করে সৌরশক্তিতে। সেই হিসেবে ১৫ জুলাই উৎক্ষেপণ হলে, চাঁদে নামতে চন্দ্রযান ২-এর সময় লাগত ৫৩-৫৪ দিন। ৬ সেপ্টেম্বর রাতে পৌঁছলে ৭ সেপ্টেম্বর সূর্যের আলো ফোটার সময় থেকেই ল্যান্ডার বিক্রম ও রোভার প্রজ্ঞান কাজ করতে পারত। যে সময়টা চাঁদের ওই নির্দিষ্ট পিঠে থাকত সূর্যের আলো। টানা ১৪ দিন ধরে কাজ করতে পারত ল্যান্ডার ও রোভার। ১৫ জুলাইয়ের পরবর্তী উইনডো ছিল ৩১ জুলাই। ইসরোর বিজ্ঞানীদের কথায়, ৩১ জুলাই দিনটিকে টার্গেট করে রাখলে, কোনও ভাবে যদি উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয় তাহলে ১৪ দিনের ওই হিসেবটা নড়চড় হয়ে যাবে। আবার পরবর্তী উইনডো অর্থাৎ অগস্ট বা সেপ্টেম্বরে চন্দ্রযান ২ কে রওনা করালে, সে ক্ষেত্রে চাঁদে নেমে কাজ শুরু করতে আরও অনেকটা দিন বেশি লেগে যেত। প্রায় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প এবং চাঁদের রহস্যময় দিক নিয়ে গবেষণাতে একেবারেই বিলম্ব করতে চায় না বলেই জানিয়েছে ইসরো।

চাঁদে জমে আছে বরফ! চমক দিয়েছিল প্রথম চন্দ্রযান, খুঁজে বার করবে দ্বিতীয়

প্রথম চন্দ্রযান অপ্রত্যাশিত ভাবে চাঁদে বরফের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছিল। সেই বরফ কত দূর বিস্তৃত এবং তার মোট পরিমাণ কত, সেটা কিন্তু এখনও আমাদের জানা নেই। চন্দ্রযান-২ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অবতরণ করার চেষ্টা করবে। কারণ, মেরু অঞ্চলেই বরফ থাকার সম্ভাবনা বেশি। সেই বরফের পরিমাণ থেকে তার গভীরতা সবকিছুই খুঁটিয়ে দেখবে চন্দ্রযান ২। চাঁদে জল কোথা থেকে এল, কী ভাবে এল এই সব প্রশ্ন নিয়ে গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে যাবে বলেই ধারণা বিজ্ঞানীদের। পাশাপাশি, পৃথিবীর উৎসের অনেক রহস্যেরও সমাধান করতে পারে চন্দ্রযান ২।

জল ছাড়াও চাঁদে ‘হিলিয়াম-৩’ মৌল নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন। সে জন্যও চন্দ্রযান-২-এর পাঠানো তথ্য খুবই সাহায্য করবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More