মঙ্গলবার, নভেম্বর ১২

মঙ্গলে ঋতু বদলায়, তুষার ঝড়ে ঢাকে গিরিখাত, ফুঁসে ওঠে আগ্নেয়গিরি, আর কী কী দেখেছে মঙ্গলযান

চৈতালী চক্রবর্তী

উঁচু-নিচু গিরিখাত, প্রলয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরি, মেঘে ঢাকা পাহাড়, তারই উপত্যকায় সুবিশাল হ্রদ— রহস্যময় লাল গ্রহের পর্দা একে একে খুলেছে ইসরোর মঙ্গলযান। রাশিয়ার ROSCOSMOS, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসা (NASA) এবং ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) মতো মঙ্গলযাত্রার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে ইসরোর Mars Orbiter Mission (MOM)। ২০১৩ সালের সেই ঐতিহাসিক যাত্রার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। পরবর্তী মঙ্গল-অভিযানের জন্য তৈরি হচ্ছে ভারত। দ্বিতীয় মঙ্গলযাত্রা হবে ২০২২-২৩ সালেই। লাল গ্রহের রহস্যের খোঁজে ফের ছুটে যাবে ইসরোর Mars Orbiter Mission 2 বা MOM 2। তার আগে একবার দেখে নেওয়া যাক, ‘মম’-এর চোখ দিয়ে মঙ্গলকে ঠিক কেমন ভাবে দেখেছে ইসরো।

ভারতের ঐতিহাসিক মঙ্গলযাত্রা। ২০১৩ সাল। ৫ নভেম্বর।

২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর পিএসএলভি (পোলার স্যাটেলাই লঞ্চ ভেহিকল) রকেটের পিঠে চেপে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকে রওনা দেয় ইসরোর ‘মম’। প্রায় এক মাস পৃথিবীর চারধারে লাট্টুর মতো পাক খেয়ে মাধ্যাকর্ষণের মায়া কাটায় ১ ডিসেম্বর। শুরু হয় মঙ্গলের পথে যাত্রা। ২৯৮ দিন লাল গ্রহের চারধারে পাক খেয়ে শেষমেশ মঙ্গলের কক্ষপথে ‘মম’কে বসানো হয় ২০১৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর (Mars Orbit Insertion)

ভারতের মঙ্গলযাত্রার সূচনা হয় ২০০৮ সালেই। সেই সময় চন্দ্রযান ১ নিয়ে প্রস্তুতি চলছিল পুরোদমে। প্রথম চন্দ্রাভিযানের পরেই ইসরোর দ্বিতীয় মিশন যে মঙ্গল-অভিযান, সেটা ঘোষণা করেন ইসরোর তৎকালীন চেয়ারম্যান জি মাধবন নায়ার। তখন অবশ্য এই মিশনের কোনও নাম ছিল না। ২০১০ সালে কেরলের তিরুঅনন্তপুরমে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (আইআইএসটি) মঙ্গলযাত্রার খুঁটিনাটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের মঙ্গলযাত্রার নাম দেওয়া হয় ‘মার্স অরবিটার মিশন’ (MOM)। ২০১৩ সালে ইসরোর চেয়ারম্যান কেপি রাধাকৃষ্ণান ঘোষণা করেন ২৮ অক্টোবর পৃথিবীর মাটি ছাড়িয়ে উড়ে যাবে ‘মম’। তবে প্রযুক্তিগত কারণের জন্য ‘মম’-এর উৎক্ষেপণ পিছিয়ে যায় ৫ নভেম্বর।

আরও পড়ুন: চাঁদে পাড়ির পাশাপাশি সৌর সন্ধান, সূর্যের দেশে যাবে ইসরোর ‘আদিত্য এল-১’

চন্দ্রযানের ল্যান্ডারের মতো সিগন্যাল হারিয়েছিল মঙ্গলযানও..

মঙ্গলযানের আয়ু ধরা হয়েছিল ছ’মাস থেকে এক বছর। কিন্তু লালগ্রহের পরিক্রমায় পাঁচ বছর পার করে ফেলেছে মঙ্গলযান ‘মম’। ঝড়-ঝাপটা যে আসেনি তা নয়। চন্দ্রযানের মতো রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ‘মম’-এর সঙ্গেও। ইসোরর চেয়ারম্যান কিরণ কুমার জানিয়েছিলেন, ২০১৫ সালের ২ জুন থেকে ২ জুলাই মম-এর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পৃথিবী ও মঙ্গলের মাঝে সূর্য চলে আসায়। ফের ২০১৬ সালের ১৮-৩০ মে তীব্র সৌর বিকিরণের কারণে মম-এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায়নি।

মঙ্গলে দিন-রাত, ঋতু বদল আছে, মেঘে ঢাকা শান্ত পাহাড় আর ফুঁসে ওঠা আগ্নেয়গিরি আছে। পাঁচ বছরে কী কী দেখিয়েছে মঙ্গলযান…

১৯৭২ সালে মঙ্গলযাত্রার সূচনা করেছিল নাসা-র মেরিনার-৯ অরবিটার। মঙ্গলের অজস্র ছবি তুলে এক অচেনা জগতের দ্বার উন্মোচিত করেছিল। তার পর থেকেই মঙ্গল-অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ে গোটা বিশ্ব। এখনও অবধি তিন রকমের মঙ্গল-অভিযান হয়েছে। এক, ফ্লাই বাই (মঙ্গলের ‘পাশ’ দিয়ে চলে যাওয়া); দুই, অরবিটার (মঙ্গলের কক্ষপথে ঘোরা); তিন, ল্যান্ডার/ রোভার (মঙ্গলে অবতরণ ও সফর করা)। ইসরোর মঙ্গলযান আসলে অরবিটার। কক্ষপথে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করাই এর কাজ। ‘মম’-এর শীরে বসানো পাঁচটি যন্ত্র—মিথেন সেন্সর (MSM), মার্স কালার ক্যামেরা (MCC), লেম্যান অলফা ফোটোমিটার (LAP) মার্স এক্সোফেরিক নিউট্রাল কম্পোজিসন অ্যানালাইজার (MENCA), থার্মাল ইনফ্র্যারেড ইমেজিং স্পেকট্রোমিটার (TIS) মঙ্গলের মাটির গঠন, চরিত্র, আবহাওয়ার প্রকৃতি, বাতাসে মিথেন গ্যাসের অস্তিত্ব, বাযুম্ডলে অ-তরিদাহত কণার গবেষণা চালাচ্ছে। মঙ্গলযান ‘মম’ দেখিয়েছে, মঙ্গলে দিন-রাত আছে, ঋতু পরিবর্তন আছে, আছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু, খুব উঁচু পাহাড় আছে, বিরাট আগ্নেয়গিরি আছে, বিশাল নদীখাতও আছে, যা একদা সেখানে জল থাকার প্রমাণ দেয়।

পৃথিবীর দিন-রাতের আয়ু যতটা, মঙ্গলের দিন-রাতের আয়ুও প্রায় ততটাই। পৃথিবী নিজের কক্ষপথে লাট্টুর মতো ঘুরতে যে সময় নেয় (২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট), তার চেয়ে সামান্য কিছুটা বেশি সময় নেয় লাল গ্রহ। ঘণ্টার হিসেবে তাই মঙ্গলের একটি দিন (দিন ও রাত মিলে) আমাদের চেয়ে সামান্য একটু বড়। তার দৈর্ঘ্য ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট থেকে ২৪ ঘণ্টা ৩৯ মিনিটের মধ্যে। এটাকে বলে ‘সল’।

মম-এর মার্স কালার ক্যামেরা প্রথম ছবি তুলে পাঠায় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই। তার পর থেকে এখনও অবধি হাজারেরও বেশি ছবি এবং ডেটা পাঠিয়েছে ভারতের মঙ্গলযান। মঙ্গলপৃষ্ঠ (Mars Surface) থেকে ২৫৫৫ কিলোমিটার উচ্চতায় ১৩২,৮ মিটার রেজোলিউশনের প্রথম ক্রেটার বা গহ্বরের ছবি তোলে মঙ্গলযান ‘মম।’ মঙ্গলের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত গেইল ক্রেটারের খোঁজ ছিল মম-এর অন্যতম সাফল্য। বিভিন্ন সময়ে মঙ্গলের বুকে গ্রহাণু, উল্কাপিণ্ড আর ধূমকেতুরা আছড়ে পড়ার ফলেই তৈরি হয়েছিল সেই গেইল ক্রেটার এলাকা।  অস্ত্রেলিয়ার জ্য়োতির্বিজ্ঞানী ওয়াল্টার ফ্রেডেরিক গেইলের নামে এই গহ্বর। তৃতীয় চমক ছিল ৫৮০০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে ৩১০ মিটার রেজোলিউশনে এমসিসি ক্য়ামেরায় তোলা হেনরি ক্রেটার। পল পিয়ের হেনরি ও ম্যাথিউ-প্রসপার হেনরির নামে এই ক্রেটার। একজন ফরাসি জ্য়োতির্বিজ্ঞানী, অন্যজন, টেলিস্কোপ বানিয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। এই গেইল ক্রেটারের পাহাড়ি এলাকার পরেই ছিল গিরিখাত। এমসিসি ৯৬ মিটার রেজোলিউশনে সেটা লেন্সবন্দি করে।

মঙ্গলে এক সময় ছিল বড় বড় নদী। কম করে ১৭ হাজার কিনোমিটার দৈর্ঘ্যের।‘লাল গ্রহে’র উত্তর গোলার্ধে ‘অ্যারাবিয়া টেরা’ (Arabia Terra) সুবিস্তীর্ণ এলাকায় ওই সব বড় বড় নদীর ‘ফসিল’-এর হদিশ দিয়েছিল মঙ্গলযান ‘মম।’ লাল গ্রহ বরাবরই পাথুরে আর বরফে মোড়া ছিল বলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের যে ধারণা বদ্ধমূল ছিল তাকেই ভেঙে চুরমার করে দেয় ‘মম।’ তার পাঠানো তথ্য থেকেই বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে ‘অ্যারাবিয়া টেরা’য় প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বইত বড় বড় নদী। আয়তনে এই ‘অ্যারাবিয়া টেরা’ একটা সুবিশাল এলাকা মঙ্গলে। প্রায় একটা ব্রাজিলের মতো।

অ্যারাবিয়া টেরার মতোই সুবিশাল গিরিখাত ভেলস মেরিনারিস— লাল গ্রহের এই গিরিখাত (Grand Canyon) ৪০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২০০ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং ৭ কিলোমিটার গভীর।

গিরিখাতগুলিতে যেমন জলের অস্তিত্বের প্রণাণ মিলেছে, তেমনি বিশাল বিশাল জীবন্ত আগ্নেয়গিরিরও খোঁজ পেয়েছে ইসরোর মঙ্গলযান যেগুলো নিয়মিত ভাবে লাভা উগরে যেত। যা প্রাণের অস্তিত্ব আর তার বিবর্তনেরই অন্যতম প্রমাণ।  মঙ্গলযান ‘মম’-এর সাম্প্রতিক খোঁজ বিশাল পর্বতশ্রেণি অলিম্পাস মনস (Olympus Mons)। অনেকগুলো জীবন্ত আগ্নেয়গিরির সমষ্টি এই পর্বতশ্রেণি দৈর্ঘ্যে ২৫ কিলোমিটার। বিস্তৃত ৬২৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে।  কখনও মেঘের আড়ালে শাস্ত-সুন্দর থাকে এই পর্বতের চূড়া। আবার কখনও উত্তপ্ত লাভা স্রোত উগড়ে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এর রূপ।

১৯৯২ সালে নাসা পাঠায় মার্স অবজার্ভার নামের অরবিটার, যা মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছনোর আগে রহস্যজনক ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। তার পর ১৯৯৬ থেকে এ পর্যন্ত মঙ্গলে যত সফল অভিযান হয়েছে, তাতে ইসা-র (ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি) মার্স এক্সপ্রেস ছাড়া বাকি সবই নাসার। সফল অভিযানের তালিকায় আছে চারটি অরবিটার: মার্স গ্লোবাল সার্ভেয়র, মার্স ওডিসি, মার্স রেকনেসাঁস ও ইসা-র মার্স এক্সপ্রেস; চারটি রোভার: পাথফাইন্ডার, স্পিরিট, অপরচুনিটি ও কিউরিয়সিটি; একটি ল্যান্ডার: ফিনিক্স। মাঝে ১৯৯৮ সালে পাঠানো  মজাপানের মঙ্গলযান নোজোমি মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। ২০১১ সালে চিনের তৈরি মঙ্গলযান ইংহুয়ো-১ পৃথিবীর অভিকর্ষ ছাড়াতে ব্যর্থ হয়। সে দিক থেকে নাসার পরে মঙ্গলযাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পালক উঠেছে ইসরোর মাথাতেই। চন্দ্রযান ২-এর পর পরবর্তী মার্স মিশনও এসে গেল প্রায়। ইসরো জানিয়েছে,, ‘মম ২’ মঙ্গলের মাটিতে জৈব বস্তুর প্রমাণ খুঁজবে। প্রাণের অস্তিত্বের খোঁজই হবে ভারতের পরবর্তী মঙ্গলযাত্রার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

আরও পড়ুন:

মঙ্গলের আকাশে শরতের মেঘ, ঝিরিঝিরি বরফে শীত নেমেছে দক্ষিণে, মুগ্ধ হয়ে দেখল ‘মার্স এক্সপ্রেস’

পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

Comments are closed.