সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

চাঁদের পাড়ায় উঁকি, মঙ্গলে চোখ, ‘স্পেস স্টেশন’ বানাতে চলেছে ইসরো, চন্দ্রযানের পর বড় মিশন ভারতের

চৈতালী চক্রবর্তী

২০১৭ সাল। জানুয়ারি মাস। মহাশূন্যের অতলান্ত গা ছমছমে অন্ধকারে হাঁটছেন এক মহিলা মহাকাশচারী। টানা সাড়ে ৬ ঘণ্টা। ভারতীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত। পেগি হুইটসনআন্তর্জাতিক মকাকাশ স্টেশন (International Space Station) থেকে প্রকাশিত এই ভিডিও দেখে চমকে গিয়েছিল বিশ্ব। মহাশূন্যে সবচেয়ে বেশি সময় হাঁটাহাঁটি করার রেকর্ড করে ফেলেছিলেন ৫৬ বছরের মার্কিন মহিলা মহাকাশচারী পেগি।

মহাকাশে মানুষ পাঠানোর প্রক্রিয়া এখনও শুরু করেনি ভারত। বায়ুসেনার অফিসার রাকেশ শর্মা গিয়েছিলেন ১৯৮৪ সালে। তিনিই প্রথম ও একমাত্র ভারতীয় যিনি মহাকাশে ঘুরে এসেছিলেন। তবে তিনি মহাশূন্যে পা রাখেননি। কারণ মহাকাশে ঘুরে বেড়াতে হলে একটা পাকাপাকি থাকার জায়গা প্রয়োজন, যেটা এখনও ভারতীয় মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে নেই। মহাকাশে নভশ্চরদের বাড়ি অর্থাৎ স্পেস স্টেশন তৈরির ভাবনা বহুদিন থেকেই রয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর। চন্দ্রযানের পরে এ বার ইসরোর অন্যতম বড় মিশন স্পেস স্টেশন। যারই একটা অঙ্গ হিসেবে ২০২১ সালে তিন নভশ্চরকে নিয়ে মহাকাশে পাড়ি দেবে ইসরোর ‘গগনযান।’

মার্কিন মহিলা মহাকাশচারী পেগি হুইটসন

স্পেস স্টেশনের নকশা বানাতে মহাকাশে পাড়ি দেবে দুটি স্যাটেলাইট

আগামী বছর ডিসেম্বরে থেকেই স্পেস স্টেশন বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। পৃথিবীর সর্বনিম্ন কক্ষপথে একটা আস্ত বাড়ি বানানো তো মুখের কথা নয়! পৃথিবী থেকে পাড়ি দেওয়া মহাকাশচারীদের থাকার ঘর করতে হবে। আলট্রাভায়োলেট রশ্মি বা যে কোনও মহাজাগতিক রশ্মির বিকিরণ থেকে স্পেস স্টেশনকে রক্ষা করার মতো পরিকাঠামো থাকতে হবে। স্টেশনের ভেতরে ও বাইরে তাপমাত্রার একটা ভারসাম্য থাকবে। সব মিলিয়ে কাজটা খুবই কঠিন। ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে মালমশলা নিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে জড়ো করার চেষ্টা হবে। মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে  Space Docking Experiment (Spadex)। এই স্প্যাডেক্সের কাজ করবে দুটি স্যাটেলাইট।

পিএসএলভি রকেটে চাপিয়ে দুটি উপগ্রহকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের বাইরে। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতেই স্পেস স্টেশন বানানোর জায়গা বের করে ফেলবে তারা। এর পর শুরু হবে বাড়ি বানানোর প্রক্রিয়া Docking Technology। শিবন জানিয়েছেন, এর জন্য দুটি স্যাটেলাইটের গতি নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখতে হবে। না হলে তারা নিজেদের মধ্যেই ধাক্কাধাক্কি করবে। মহাশূন্যে সবকিছুই ভর-শূন্য দশায় থাকে। অর্থাৎ মাইক্রোগ্র্যাভিটি (মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব যেখানে নেই) কাজ করে। কাজেই সব দিক ভেবেচিন্তে, বিচারবিবেচনা করেই নকশা বানাতে হবে স্যাটেলাইট দুটিকে।

ইসরোর ইলাস্ট্রেশন

স্পেস স্টেশন প্রজেক্টের রাস্তা তৈরি করবে গগনযান

বায়ুসেনার অফিসার রাকেশ শর্মা মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন রুশ মহাকাশয়ান ‘সয়ুজ টি-১১’-এ চেপে। গগযান হল প্রথম দেশি মহাকাশযান, যা মানুষ পিঠে নিয়ে মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াবে। ভারতের এই ‘Manned Space Mission’-এর দিনকাল এখনও সঠিক ভাবে ঘোষণা করা হয়নি। প্রযুক্তিগত সব দিক ঠিক থাকলে ২০২১-২০২২ সালের মধ্যে তিন নভশ্চরকে নিয়ে মহাকাশে উড়ে যাবে গগনযান। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এত বড় মিশন তো আর শুধু নাম কেনার জন্য নয়। তাহলে গগনযানের উদ্দেশ্য কী ?

গগনযানের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে

ইসরো চেয়ারম্যান শিবন জানিয়েছেন, মহাকাশে গগনযানের ভিতর মোটামুটি সাত দিন থাকবেন নভশ্চররা। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের কাজ হবে মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য দশা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো। গগনযানের বিশেষ ক্যামেরায় ধরা পড়বে পৃথিবীর কক্ষপথের হাল-হকিকত। গগনযানের ভিতরেও ওজন-শূন্য অবস্থায় থাকবেন মহাকাশচারীরা। সেই সময় তাঁদের অভিজ্ঞতা কেমন, বেঁচে থাকার জন্য তাঁদের কেমন রসদই বা দরকার তার খুঁটিনাটি জানতে পারবে ইসরো।

পৃথিবীর নানা দেশের স্পেস স্টেশন। দেখুন ভিডিও:

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন আস্ত একটা ফুটবল মাঠের মতো, তারই কাছাকাছি যাবে ইসরো

শিবন জানিয়েছেন, ভারতের মহাকাশ স্টেশনের ওজন হবে ২০ টনের মতো। গগনযান সফল হলে এই মিশন সম্পূর্ণ হয়ে যাবে ২০৩০ সালের মধ্যেই। নিজেদের স্পেস স্টেশনে বসেই বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারবেন মহাকাশচারীরা। প্রয়োজনে ১৫-২০ দিন টানা থাকতে পারবেন।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) রয়েছে পৃথিবী থেকে বড়জোর ৩৭০ কিলোমিটার উপরে।  মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA), রাশিয়ার রসকসমস (Roscosmos), জাপানের জাক্সা (JAXA), ইউরোপের ইসএ (ESA) এবং কানাডার সিএসএ (CSA)—এই পাঁচটি মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের সম্মিলিত চেষ্টায় ১৯৯৮-২০১১ সালের মধ্যে গড়ে উঠেছিল আইএসএস। শিবন জানিয়েছেন, ভারতের ‘দেশি স্পেস স্টেশন’ তৈরির কাজেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে নাসা ও রাশিয়ার রসকসমস।

‘মডেল মহাকাশ স্টেশন’ তৈরি প্রায় শেষ চিনের, চতুর্থ দেশ হিসেবে তোড়জোড় ভারতেরও

মহাকাশ স্টেশন বানানোর জন্য চিন পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম উপগ্রহটি মহাকাশে পাঠিয়েছিল বেশ কয়েকবছর আগে। তার নাম ছিল- ‘তিয়াংগং-১’। তার কাজকর্ম শেষ হয়ে গেলেও সেটি এখনও পৃথিবীর চার পাশে চক্কর মারছে।  দ্বিতীয় উপগ্রহ ‘তিয়াংগং-২’ মহাকাশে পাড়ি দেয় ২০১৬ সালে।  যা আদতে উপগ্রহ হলেও আগামী দিনে চিনা মহাকাশ স্টেশনেরই একটি প্রোটো-টাইপ। পাকাপাকি ভাবে চিনা মহাকাশ স্টেশন গড়ে তোলার প্রস্তুতি। যাতে মহাকাশচারীরা থাকবেন। কোনও মহাকাশযান গিয়ে সেখানে নামতেও পারবে। ২০২২ সালের মধ্যেই এই স্পেস স্টেশন জালু হয়ে যাবে বলে চিনা সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। এর দৈর্ঘ্য হবে ১৫ মিটার বা ৪৯ ফুটের কিছু বেশি। মানে প্রায় পাঁচ তলা বাড়ির সমান।

চিনা স্যাটেলাইট তিয়াংগং-২

ইসরো জানিয়েছে, ভারতের স্পেস স্টেশন বানানোর তোড়জোড় শুরু হয় ২০১৭ সালেই। চিনকে টেক্কা দিতে ভারতের গগনযান মহাকাশে গিয়ে সব খুঁটিনাটি দেখে আসবে। তারপরেই পিএসএলভি-তে চেপে পাড়ি দেবে দুটি স্যাটেলাইট।

এ বার ঝুপ করে নেমে পড়া যাবে চাঁদের পিঠে, উঁকি দেওয়া যাবে মঙ্গলের পাড়ায়

মহাকাশে একটা পাকাপাকি হিল্লে হলে চাঁদে পাড়ি বা মঙ্গল-মিশন অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে বলে মনে করছে ইসরো। প্রথমত, এতদিন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের মায়া কাটাতে নানা রকম রকেটের পিঠে চাপিয়ে মহাকাশযানগুলির উৎক্ষেপণ করতে হত। সেটা আর করতে হবে না। স্পেস স্টেশ হবে পৃথিবীর বাইরেই, অতএব অর্ধেক কাজ হয়েই গেল।

দ্বিতীয়ত, চাঁদের রাস্তা বা লুনার সারফেস চটজলদি ধরতে পারবে ইসরোর মহাকাশযান। আগামী দিনে চন্দ্রযান ৩, মার্স অরবিটার মিশন-সহ একগুচ্ছ প্রকল্প রয়েছে ইসরোর। সুতরাং, সৌরমণ্ডলের বিভিন্ন গ্রহে যাওয়ার জন্য এটাই হবে ইসরোর একমাত্র ‘ট্রান্সপোর্টেশন হাব’। তাতে জ্বালানির সাশ্রয় হবে অনেকটাই।

তৃতীয়ত, স্পেস স্টেশনে বসেই নানা রকম পরীক্ষানিরীক্ষা করা সহজ হবে। মাইক্রোগ্র্যাভিটির গবেষণা অনেক সহজ হবে। নাসার মতোই মহাকাশের বিভিন্ন সময়ের ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠাতে পারবেন মহাকাশচারীরা। মহাকাশবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।

আরও পড়ুন:

চাঁদে পাড়ির পাশাপাশি সৌর সন্ধান, সূর্যের দেশে যাবে ইসরোর ‘আদিত্য এল-১’

Comments are closed.