শুক্রবার, অক্টোবর ১৮

চাঁদের জন্ম রহস্যের পর্দা খুললে, ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির জটও খুলবে ধীরে ধীরে

দিব্যেন্দু নন্দী

রহস্য অনুসন্ধানের সহজাত প্রবৃত্তি নিয়েই জন্মেছে মানুষ। অজানাকে জানার নেশা তার মজ্জাগত। আর এই জন্যই প্রতি মুহূর্তে বদলে যাওয়া পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা অনেক সহজ হয়েছে। নীল গ্রহের নিশ্চিন্তের আশ্রয় ছেড়ে সৌরমণ্ডলের অন্য কোথাও বাস জমাবার দুর্নিবার ইচ্ছা মানুষের বহুদিনের। প্রযুক্তি ধীরে ধীরে সে দিকেই এগোচ্ছে। মহাকাশে মণিমুক্তোর খোঁজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। পিছিয়ে নেই ভারতও। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে আমার মনে হয়েছে, সৌরজগতে আমাদের সবচেয়ে কাছের জন চাঁদ, তাই মহাজাগতিক রহস্যের সোনার কাঠির হদিস চাঁদ ছুঁয়েই পাওয়া যেতে পারে।

ভারতও পারে, দেখিয়ে দিয়েছে ইসরো!

দিব্যেন্দু নন্দী

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের যে তড়িৎ-চুম্বকীয় স্তর অর্থাৎ আয়োনোস্ফিয়ার অভিযানে আগেও রকেট পাঠিয়েছে ভারত। পথ দেখিয়েছিলেন ভারতের ‘অন্তরীক্ষ গবেষণার জনক’ ইসরোর প্রাণপুরুষ ডঃ বিক্রম সারাভাই। প্রথম চন্দ্রাভিযান আশার আলো দেখিয়েছিল। দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযান ভারতের মহাকাশ গবেষণায় সাফল্যের হাতিয়ার। দেশজ প্রযুক্তি ও ইসরোর দক্ষতাকে সুনিপুণ ভাবে মেলে ধরবে।

চন্দ্রযান ২-এর সাজসজ্জাতেই কেরামতি দেখিয়েছেন ইসরোর মহাকাশবিজ্ঞানীরা। চন্দ্রযানের মূল চার অস্ত্র- রকেট লঞ্চার (rocket launcher), লুনার অরবিটার (lunar orbiter), ল্যান্ডার (lander) এবং রোভার (rover)। প্রত্যেকের নিজস্ব প্রযুক্তিগত কাজ রয়েছে। এই চার অস্ত্রে সজ্জিতা হয়েই চন্দ্রযান রওনা দিয়েছে চাঁদের দিকে। রকেট লঞ্চারের কাজ শেষ, সে উড়িয়ে দিয়েছে ‘বাহুবলী’ জিএসএলভি মার্ক-৩ রকেটকে। লুনার অরবিটার কক্ষপথ থেকে ঠেলেঠুলে ল্যান্ডারকে এগিয়ে দিয়েছে চাঁদের দরজায়। ল্যান্ডার এখন চাঁদের নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাকি আছে একজন। ল্যান্ডারের পেটের ভেতর ঘাপটি মেরে রোভার। তার কাজ শুরু হবে আজ ভোর রাতের পর থেকে।

এই গোটা মিশনের ইঞ্জিনিয়ারিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ইনস্ট্রুমেনটেশন, টেলিকম্যুউনিকেশন সবকিছুই ভারতের উন্নত বিজ্ঞান গবেষণার পরিচায়ক। বিশ্বের অন্য দেশের উপর আর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা নেই। মহাকাশ গবেষণায় ভারত যে ‘একক, একমেবাদ্বিতীয়ম’, প্রমাণ করে দিয়েছে ইসরো।

অরবিটার ও পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশনের মধ্যে যোগাযোগ রাখবে ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক

চন্দ্রযানকে চাঁদে নিয়ে যেতে সবচেয়ে শক্তিশালী জিএসএলভি মার্ক-৩ রকেট বেছে নিয়েছে ইসরো। প্রথম দিকে রকেটের জ্বালানি চেম্বারে কিছু ত্রুটি থাকলেও, পরে সেটা সারিয়ে নেওয়া গেছে। চাঁদের পিঠ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের কক্ষপথে বসে আছে অরবিটার। ল্যান্ডারকে ঠেলে চাঁদে পাঠানোই তার কাজ। ইসরোর প্রাণপুরুষ বিক্রম সারাভাইয়ের নামেই ল্যান্ডারের নাম ‘বিক্রম।’  এখন অরবিটার থেকে আলাদা হয়ে চাঁদের একদম সামনাসামনি পাক খাচ্ছে ‘বিক্রম।’ রোভারকে সঙ্গে নিয়ে আজ মধ্যরাতেই চাঁদের বুকে ‘সফট ল্যান্ডিং’ করবে। চাঁদের মাটিতে নামার পরে কাজ আরও বাড়বে। ল্যান্ডার ও রোভার পরিকল্পনা মাফিক ঠিকঠিক কাজ করছে কি না, ইসরোর কন্ট্রোল রুম থেকে তার তত্ত্বাবধান করা হবে। ল্যান্ডারের সঙ্গো যোগাযোগ রাখবে অরবিটার। ‘ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক’ (DSN) কাজে লাগিয়ে গ্রাউন্ড স্টেশনের সঙ্গে সংযোগ রাখবে অরবিটার। রোভার ‘প্রজ্ঞান’-এর তোলা ছবি ও বাকি তথ্য এই নেটওয়ার্ক মারফৎ পৌঁছে যাবে পৃথিবীতে।

চাঁদে পাড়ি দিয়ে কী কী লাভ হতে পারে?

চাঁদের জন্মের ইতিহাস বলবে চন্দ্রযান ২

চাঁদ পৃথিবীর আত্মজা। চাঁদের উৎপত্তি ও বিবর্তনের সঙ্গে পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য জড়িয়ে রয়েছে। চাঁদের জন্ম রহস্যের পর্দা খুললে, ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির জটও খুলবে ধীরে ধীরে। সৌর বিকিরণ ও সূর্য থেকে ছিটকে আসা পদার্থ (Solar Particles) চাঁদের উপর কী প্রভাব ফেলে সেটা জানা যাবে সহজেই। চন্দ্রপৃষ্ঠ বা লুনার সারফেসের স্তরগুলির উপর এই সৌর বিকিরণের জোরালো প্রভাব রয়েছে। যার গবেষণা বহুদিন ধরেই করছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের চন্দ্রাভিযান এই রহস্যের মোড়ক খুলতে পারে। এক্স রে স্পেকট্রোমিটার বসিয়ে সোলার এক্স রে রেডিয়েশনের (Solar X-Ray Radiation) তথ্য মিলতে পারে।

চাঁদে জল মিলবে, আশা সাধারণ মানুষের

চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সূর্যের তেজ বেশি সময় ধরে দেখা যায় না। তার কারণ চাঁদ তার কক্ষপথে সামান্য হেলে থাকে। ফলে চাঁদের উত্তর মেরুর তুলনায় দক্ষিণ মেরু অনেক বেশি অন্ধকার। এই কারণে হিমশীতল দক্ষিণ মেরুতে বরফ থাকার সম্ভাবনা বেশি। আর বরফ মানেই জল। জলের তড়িৎ বিশ্লেষণে পাওয়া যাবে হাইড্রজেন ও অক্সিজেন। এখান থেকে লাভ হবে দু’টো, এক, হাইড্রজেন ব্যবহার করা যেতে পারে জ্বালানি হিসেবে। দুই, অক্সিজেন শ্বাস নিতে সাহায্য করবে। কাজেই আগামী দিনে চাঁদে বসে মানুষের গবেষণার কাজ সহজ হবে।

চাঁদ-মুলুকে পাড়ি দিতে পারে মানুষ

চাঁদের মাটিতে জল মিললে, সেখানে বসেই বানিয়ে নেওযা যেতে পারে হাইড্রজেন ও অক্সিজেন। মহাকাশযাত্রার জ্বালানিও মিলতে পারে চাঁদ থেকেই। ‘লুনার স্পেস স্টেশন’ বানিয়ে আগামী দিনে চাঁদে বসেই মহাকাশ গবেষণায় সামিল হতে পারে মানুষ।

পৃথিবীর মতো চৌম্বক ক্ষেত্রের আবরণী নেই চাঁদের। কাজেই সৌর বিকিরণের ঝাপটা সরাসরি চাঁদে এসে পড়ে। অন্যান্য মহাজাগতিক রশ্মি থেকেও রেহাই পায় না চাঁদ। এই রশ্মিগুলোর রক্ষাকবচ ঠিক কী, তার অভিজ্ঞতাটাই আমাদের অর্জন করতে হবে চাঁদে গিয়ে। চাঁদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে। তাহলে পরবর্তী কালে চাঁদে শুধু মানুষ পাঠানো নয়, স্পেস স্টেশন তৈরি করাও সহজ হয়ে যাবে।

লেখক:

কলকাতার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (IISER) অধ্যাপক।
সেন্টার অফ এক্সেলেন্স ইন স্পেস সায়েন্সেস ইন্ডিয়ার (সেসি) প্রধান বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

Comments are closed.