চাষির ছেলে থেকে ভারতের ‘রকেট ম্যান,’ খালি পায়ে কেটেছে কিশোরবেলা, তিনিই এখন ভাসান চাঁদের ভেলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    স্কুলের পরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা বিশেষ হত না। মেঠো পথ ধরে তাড়াতাড়ি বাড়ির রাস্তা ধরত ক্লাস ফাইভের ছোট্ট ছেলেটা। খালি পা। জল-কাদা, পাথরে পা কাটলেও পরোয়া নেই। বাড়ি তাকে ফিরতেই হবে। আম গাছে বোল ধরেছে। একা বাবার পক্ষে সবটা সামলানো সহজ নয়। জলদি বাড়ি ফিরতে পারলে বাগান পরিচর্চা সেরে খানিক পড়াশোনা। তার পরে বাবার সঙ্গে চাষের মাঠের কাজ। ঈশান কোনে মেঘ জমলে, সে দিকে তাকিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেত ছেলেটা। ওই আকাশ টানত তাকে। নীল দিগন্তের ও পারে জমাট বাঁধা রহস্যকে ছুঁতে চাইত এক কিশোর মন।

    খালি পায়েই যার কেটেছে কিশোর বেলা, মেঠো জমির গন্ধে পেরিয়েছে বয়ঃসন্ধি, মাটির অনেক কাছাকাছি থাকা সেই ছেলেই আজ মহাকাশ ছুঁয়েছে। দেশকে নিয়ে নিয়ে গেছে অন্তরীক্ষ গবেষণার উন্নতির শিখরে। তাঁরই নির্দেশে স্যাটেলাইট দেশের মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে যায়। ভারতের ‘রকেট ম্যান’ ইসরোর চেয়ারম্যান কাইলাসাভাডিভো শিবন বা কে শিবনের জীবনের শুরুটা ছিল চড়াই-উৎরাইতে ভরা।


    বাড়ির কাছের সরকারি স্কুলে ভর্তি করেছিলেন বাবা…ছেলে যাতে স্কুল সেরেই চাষের কাজে হাত লাগায়

    কন্যাকুমারীর নাগেরকয়েলের কাছে মেলা সারাক্কালভিলাই গ্রামের ছোট্ট একটেরে বাড়ি। চাষির ছেলে শিবন পড়াশোনা শিখতে চেয়েছিল। আপত্তি করেননি বাবা। তবে শর্ত ছিল একটাই। স্কুলের পড়া শেষে চাষের কাজে হাত লাগাতে হবে। শহরের নামী স্কুল নয়, গ্রামের তামিল মাধ্যম সরকারি স্কুলেই প্রথম অক্ষর জ্ঞান শিবনের। স্কুলের পাঠে বিজ্ঞানের শিক্ষক তেমন নেই, ইংরাজির অত চলও নেই। কিন্তু, ছেলের ইচ্ছা দুর্নিবার। যা কঠিন, যা সহজলভ্য নয়, তাকেই ছুঁতে চায় যে মন! গ্রামের স্কুলে তেমন মাস্টারমশাই কোথায়, আর পরিবারের সকলেই প্রায় নিরক্ষর। একসময় নিজেই নিজের মাস্টারমশাই হয়ে উঠলেন শিবন। চাষ আর পড়াশোনা, চলতে লাগল সমান্তরাল পথে।


    কে শিবনের গ্রামের বাড়ি। এখন সারাই হয়েছে। বড় মিশনের আগে পুজো দিতে ভোলেন না ইসরো কর্তা

    “বাবার আম বাগান ছিল। কয়েক বিঘা জমিতে চাষও করতেন বাবা। আমাকে দুটোই দেখাশোনা করতে হত। আমের মরসুমে ব্যস্ততা বাড়ত অনেক। অভাবের সংসারে মজুর রাখার সামর্থ ছিল না বাবার,” কিশোর বেলার স্মৃতিতে ভাসলেন শিবন। বললেন, “অভাব মানুষকে অনেক শক্তপোক্ত করে তোলে। আত্মবিশ্বাসী মন তৈরি হয়। ঘরে-বাইরে নিজেকে প্রমাণ করার জেদ চেপে গিয়েছিল। এই জেদই পরবর্তীকালে আমার স্বপ্নপূরণের অন্য়তম চাবিকাঠি হয়ে ওঠে।”

    পরিবারের সঙ্গে ইসরো কর্তা

    কিশোর বেলা কেটেছে খালি পায়ে, প্রথম জুতো কলেজে

    দামি জামাকাপড় ছিল বিলাসিতা। হাফ শার্ট আর ধুতিতেই চলে যেত মোটামুটি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চেয়েছিল ছেলে, বাবা বলেছিলেন, “সামর্থ কোথায়। বিএসসি পড়ো। ভালো নম্বর পেলে জমি বেচে তোমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াব।” ছেলে তাতেই রাজি। প্রথম দিন কলেজে খালি পায়ে দেখে অন্য ছেলেরা হাসি-মস্করা করল। চাষির ছেলে বলে টিপ্পনীও শুনতে হলো। শেষে পুরনো একজোড়া জুতো উঠল পায়ে। অঙ্কে বিএসসি অনার্সে তুখোড় নম্বর পেয়ে শিবন ভর্তি হলেন মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। ১৯৮০ সাল। অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে শুরু হলো পড়াশোনা।

    শিবন জানিয়েছেন, সেই সময় অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লেও চাকরির তেমন সুযোগ ছিল না। বড় প্রতিষ্ঠান বলতে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড এবং ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস লিমিটেড। দু’জায়গাতেই ঠাঁই হয়নি শিবনের। অগত্যা ফের পড়াশোনা।

    মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটিতে শিবনের ব্যাচ। ১৯৮০ সাল।

    চাকরি না পাওয়ার ব্যর্থতা জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল কয়েকগুণ

    ১৯৮২ সাল। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে (আইআইএসসি) অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে মাস্টার্স করে ফেললেন শিবন। তার পর এক ধাক্কায় ইসরো চাকরি। তবে পড়াশোনায় ইতি টানেননি তখনও। উচ্চাশা যে দুরন্ত। জানার আগ্রহ অদম্য। বম্বে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অ্যারোস্পেসের উপরেই পিএইচডি শুরু করলেন। তখন ২০০৬ সাল। পড়াশোনা এবং চাকরি দুটোই চলছিল সমান দক্ষতায়। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিংঅ্যারোনটিক্যাল সোসাইটিতেও গবেষণা করেছিলেন শিবন।

    পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকলের (পিএসএলভি) সাজসজ্জার কারিগর শিবন

    জিওসিনক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকলের (জিএসএলভি) সঙ্গে তখন পরিচয় হয়নি মহাকাশবিজ্ঞানীদের। কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানোর শক্তিশালী লঞ্চ ভেহিকল ছিল পিএসএলভি-ই। তারই নকশা বানানোর দায়িত্ব ছিল শিবনের। পিএসএলভি-র যাবতীয় প্রজেক্টের প্ল্যানিং, ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যানালিসিস সবেরই দায়িত্বে ছিলেন শিবন। তাঁর কাজে মুগ্ধ ছিলেন উর্ধ্বতন কর্তারা। ২০১৪ সালে ইসরোর লিকুইড প্রপালসন সিস্টেম সেন্টারের ডিরেক্টর পদে যোগ দেন শিবন। আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ততদিনে তাঁর নাম হয়ে গেছে ভারতের ‘রকেট ম্যান।’

    পিএসএলভি-র আরও উন্নত ভার্সান জিএসএলভি-র ডিজাইনে তখন ব্যস্ত শিবন। কারণ পিএসএলভি লঞ্চ ভেহিকল অনেকবারই উৎক্ষপণের আগে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাতে প্রয়োজন আরও শক্তিশালী আধার। সেটাই জিএসএলভি। প্রথম চন্দ্রযাত্রার জিএসএলভি মার্ক-৩ রকেটের পরিকল্পনাও তাঁর।

    পরের বছর ২০১৫ সালে ভিএসএসসি-র (বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার) ডিরেক্টর হন শিবন। তার তিন বছর বাদেই ইসরোর চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর নাম জেনে যায় গোটা বিশ্ব।

    ৪০ বছরের কর্মজীবনে মহাকাশ বিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন নতুন পথ দেখিয়েছেন শিবন। স্যাটেলাইট পে-লোড এবং ইলেকট্রো অপটিক্যাল ইমেজিং সেন্সরের (এয়ারবর্ন, জিওস্টেশনারি অরবিট এবং লো আর্থ অরবিট স্যাটেলাইট) প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন তিনি। পুরস্কারও পেয়েছেন অজস্র। চন্দ্রযান ২-এর শুরু থেকে শেষ, তাঁর হাত ধরেই হয়েছে। সম্প্রতি তামিলনাড়ু সরকার তাঁকে ডঃ এপিজে আবদুল কালাম অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে।

    শিবন বলেন, তিনি বজ্রকঠিন, নিজের কর্তব্যে অবিচল। আপাত কাঠিন্যের আড়ালে চরম আবেগী এই মানুষটাকে ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছে কোটি কোটি ভারতবাসী। দ্বিতীয় চন্দ্রযাত্রার অসাফল্য তাঁকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। শিশুর মতো কেঁদেছেন শিবন। এই চোখের জল তাঁর ব্যর্থতার নয়, কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা এবং ভালোবাসার পরিচয় দেয়। শিবন তাই হারেননি, হারেনি ইসরোও। মহাকাশের ব্যাপ্তির মতোই তাঁর অবদান ভারতের চন্দ্রযাত্রার ইতিহাসে অমলিন থাকবে। কোটি কোটি ভারতবাসীর স্যালুট আপনাকে শিবন!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More