সোমবার, এপ্রিল ২২

বোরখার আড়ালে আমার ‘সুন্দর’ স্বামী, আমিই তার হক্‌দার: ইন্টারনেট কাঁপাল পাক দম্পতি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাকিস্তানের এক অভিজাত রেস্তোরাঁ। ঝাঁ চকচকে পরিবেশে নজর কেড়েছে রেস্তোরাঁর এক কোণার টেবিলে হাসিমুখে বসা এক দম্পতি। ইনস্টাগ্রামে এমন ছবি ভাইরাল হতেই মুহূর্তের মধ্যে কয়েক হাজার লাইক, কমেন্ট। ইনস্টাগ্রাম থেকে সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় গত কয়েকদিনে এই ছবি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এই ছবির সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা জানেন হাসি মুখের দম্পতি এখানে প্রধান বিষয় নয়। চমকটা অন্য জায়গায়।

নিজেদের ‘দ্য মিউলি ওয়েডস’ বলতেই ভালোবাসেন দু’জনে। ইনস্টাগ্রাম ও টুইটারে এই নামের অ্যাকাউন্ট থেকেই এই ছবি পোস্ট করেছেন দিন কয়েক আগে। সুবেশা তরুণীর পাশে বসা বোরখার আড়ালে তাঁর স্বামীই এই ছবির মূল আলোচ্য বিষয়। তরুণী সেজেছেন হাল ফ্যাশনের কুর্তিতে। অথচ তাঁর পাশে বসা স্বামীর পরনে বোরখা। প্রথম ঝটকা এখানেই। পৌরুষের তেজ যেন মেঘের আড়ালে ঢাকা, চাঁদের আলোর মতো ছড়িয়ে পড়েছে নারীর রূপ।

বিষয়টা হয়তো এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু হয়নি। ছবির সঙ্গে তরুণীর আনুষঙ্গিক কিছু মন্তব্য ঝড় তুলেছে বিশ্বে। তর্ক-বিতর্কের ইতি অবশ্য হয়নি, তবে তরুণীর কথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ছকবাঁধা লিঙ্গবৈষ্যম্যের প্রতি যে সপাটে এক চড় কষিয়েছে সেটা বলাই বাহুল্য। তরুণী নিজেও জানিয়েছেন, এই ছবি পোস্ট করা হয়েছে বিশেষ এক উদ্দেশ্যে। এখানে তিনি ছায়াবৃত্তের মধ্যে থাকা কোনও নারী নন, বরং পুরুষের ভূমিকাটা নিয়েছেন তিনিই। তাঁর প্রতিটা কথা তাই পুরুষের দৃষ্টিতেই বলা। প্রতিটা শব্দে রয়েছে অর্থপূর্ণ শ্লেষ।

তরুণী শুরুটা করেছেন ঠিক এ ভাবে, ‘‘দেখে নিন ইনি আমার সুন্দর স্বামী। জানি তাঁর সৌন্দর্য আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না। কারণ, তিনি বোরখায় নিজেকে ঢেকে রেখেছেন। এই আড়াল-আবডালের কারণ আমিই তাঁর একমাত্র হক্‌দার। তাঁর উপর আমারই অধিকার রয়েছে। অন্যের পাপ-নজর যাতে তাঁকে স্পর্শ করতে না পেরে তাই এত রাখঢাক। এই সমাজ ভালো নয়। তবে আমার সঙ্গে ও যখন বের হয় তখন কোনও চিন্তা নেই। আমি তো আছি!’’

চিরাচরিত ধ্যানধারণা আর ছকে বাঁধা পুরুষতন্ত্রকে এক ধাক্কায় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন পাক তরুণী। দেখাতে চেয়েছেন এখানে তিনি নিষ্ক্রিয়, ভিতু, অক্ষম নন, নির্ভরশীলও নন। তিনি সাহসী, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এক নারী, যিনি নিজের স্বাতন্ত্রে বাঁচতে ভালোবাসেন।

দম্পতির ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল থেকে নেওয়া ছবি।

এর পরের কথায় কটাক্ষের রেষ আরও তীব্র। ‘‘জানেন, আমরা শুধু এই রোস্তারাঁতেই খেতে আসি। কারণ এখানে স্টেরয়েড ছাড়া চিকেন পাওয়া যায়। আমরা স্বাস্থ্য সচেতন, জানি স্টেরয়েড দেওয়া চিকেন খেলে যৌনক্ষমতায় প্রভাব পড়ে। আমি একেবারেই চাই না, ওর যৌনক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাক, কারণ ওর বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যই হলো সন্তান উৎপাদনে সহযোগিতা করা। আমাকে মা বানানো। তাই যাই হোক না কেন, ওকে আমি এখানেই খেতে নিয়ে আসবো।’’

কথার ঝাঁজ প্রতি মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হয়েছে, ‘‘আমি চাই ও এ ভাবেই নিজেকে বোরখার আড়ালে লুকিয়ে রাখুক। কারণ ও আসলে ‘খুলি তিজৌরি’। চাই না, যে কেউ ওকে স্পর্শ করুক। যৌন হেনস্থার শিকার হোক। তবে তেমন কিছু হলে ভাগ্যের পরিহাস ভেবে তা মেনে নেবো। আশা রাখব, হেনস্থাকারীদের সাজা হবেই।’’ সমাজের থেকে আড়ালে রাখলেও স্বামীকে যে সমান অধিকার দিতে তিনি ভোলেন না, সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তরুণী। স্বামীর শরীর-মনের উপর অধিকারের পাল্লাটা তাঁর দিকেই ভারী, তবে কিছুটা স্বাধীনতা দিতে তিনি কার্পণ্য করেন না। ‘‘আমি ওকে বাইরে কাজ করতে যেতে দিই, বারণ করি না। আর ড্রাইভিং করতেও অনুমতি দিই,’’ তরুণীর চোখে ব্যঙ্গের হাসি। যার অর্থ, স্বামী তাঁর নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু একটু আধটু স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে!

‘নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, বরং নারী হয়ে ওঠে।’ ১৯৫৯ সালে সিমোন দ্য বোভোয়া বলেছিলেন। শিশু তার লিঙ্গ সম্পর্কে সচেতন থাকে না। চুলে ফিতে বেঁধে, ফ্রক পরিয়ে, হাতে পুতুল তুলে দিয়ে তাকে ‘নারী’ হিসেবে নির্মাণ করে সমাজ। ‘নির্মাণ’ কিন্তু এখানেই থেমে থাকে না। সভ্যতা, ‘জোর যার মুলুক তার’-কে কাজে লাগিয়ে মেয়েদের মস্তিষ্কে তালা দিয়ে রাখার প্রথা বহু যুগ ধরেই চলে আসছে। বয়স বাড়লে এবং শরীর জবাব দিলে এর পরের নারী হয়ে ওঠে ভোগ্যা, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র। ঘরে-বাইরে অবাঞ্ছিত স্পর্শ, গার্হস্থ্য হিংসাকে মেনে নেওয়া সবই সেখানে দস্তুর।

এই লুকিয়ে রাখা অস্বাচ্ছন্দ্য ও হয়রানির কাহিনিই একটু অন্যভাবে বলতে চেয়েছেন এই নারী। দেশ, ধর্মের তোয়াক্কা না করেই ‘ঠোঁটে আঙুল, চুপকথা’ পর্যায় পেরিয়ে তিনি সাহসী। তাই প্রবল সমালোচনার মুখেও তিনি অকপট, ‘‘আপনাদের ব্যঙ্গ বোঝাবার দায়িত্ব আমার নয়। এখানে ফটোগ্রাফিও ‘হারাম’। তাও আমি এটা করেছি আপনাদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য। ‘কবর কে শাপ, জাহান্নুম কে আগ’ থেকে আপনাদের বাঁচানোটাই আমার উদ্দেশ্য।’’

নিজেকে নারীবাদী বলতে সচ্ছন্দ নন তরুণী। তিনি নারীবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি।  ‘উত্তর-আধুনিক’ সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি বৈষম্যের সীমারেখাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন। তাই এই ছবি শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কোনও ঘটনা নয়, বরং দেশ-কালের গণ্ডি, সীমান্তের বেড়াজাল পেরিয়ে মেয়েটি বিশ্বের সকল নারীজাতিকেই একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। যার প্রবল ঝাপট সব বৈষম্যকেই ভাসিয়ে দেবে।

Shares

Comments are closed.