জল আছে, প্রাণ নেই, টগবগ করে ফোটে অ্যাসিড পুকুর, সবুজে ঘেরা এই জায়গা ভয়ঙ্কর, হাতছানি দেয় মৃত্যু

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তাপ যেন লাগামছাড়া। কেউ বলেন আগ্নেয়গিরির দেশ। কেউ বলেন লবণের দেশ। কারওর মতে ভৌতিক। হলুদ-সবুজে মাখা এমন এক মনোরম পরিবেশ যে এতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সেটা আগে আঁচও করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। সবুজের সমারোহ, জল থাকলেও এখানে প্রাণ নেই। এমনকি প্রাণের কোনও সম্ভাবনাও নেই। জলে ভর্তি ম্যাগনেসিয়াম। স্থানে স্থানে অ্যাসিড ভর্তি পুকুর ফুটছে টগবগ করে। বাতাস ভর্তি বিষাক্ত গ্যাসে, শ্বাস নেওয়া যায় না। এই জায়গার রহস্যভেদ করতে গিয়ে বিপদের মুখে পড়েছিলেন বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানীই। ইথিওপিয়ার উত্তরে দাল্লোল শহরের ডানাকিল ডিপ্রেশন। রহস্য যার আনাচেকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে।

    দাল্লোরের ড্যানিয়েল ডিপ্রেশনের বিস্তৃত এলাকা প্রাণহীন। এমনকি দাল্লোল শহরকে এখন ভূতের শহর বলেও ডাকা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই এলাকা প্রায় ১৩০ মিটার বা ৪৩০ ফুট নীচে অবস্থিত। অজস্র উষ্ণ প্রস্রবণ ছড়িয়ে রয়েছে এখানে। অ্যাসিডের কারণে জলে মাছ জন্মায় না। একটা সময় বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এমন চরম আবহাওয়ায় একমাত্র অণুজীবরাই বেঁচে থাকতে পারে এখানে। পরবর্তীকালে জানা যায়, অনুজীব কেন প্রাণ তৈরির কোনও সম্ভাবনাই নেই এখানে। চারদিক সবুজে ঘেরা হলেও কী এক বিষাক্ত গ্যাস যেন ছড়িয়ে রয়েছে এখানকার আকাশে বাতাসে। দমবন্ধ করা পরিবেশ। কিছু কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত।

    দাল্লোলে একসময় জীবন্ত আগ্নেয়গিরি ছিল। ১৯২৬ সালে শেষ অগ্ন্যুৎপাত হয়। ভূগর্ভস্থ লাভা গলগল করে বেরিয়ে আসে বাইরে। জলের সঙ্গে মিশে যায় লাভাস্রোত। গনগনে আগুনের স্রোত ছড়িয়ে পড়ে স্থলভূমিতেও। তৈরি হয় নানা ছোটবড় গর্ত। পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও আরও নানা খনিজ দ্রবীভূত হয়ে জমা হয় এই গর্তে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই জলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে নানারকম বিষাক্ত পদার্থ মিশে আছে জলে।

    ‘নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’ নামে বিজ্ঞান পত্রিকায় দাল্লোলের এই জায়গার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বলা হয়েছে এই এলাকা এমনই চরমভাবাপন্ন যে এখানে ব্যাকটেরিয়া থাকাও সম্ভব নয়। তাপমাত্রা গড়ে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস(১০৫ ডিগ্রি ফরেনহাইট) এবং সর্বনিম্ন গড়ে তাপমাত্রা্ মাসে ৪৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১৬.১ ডিগ্রি ফরেনহাইট)। শীতকালে দিনের বেলাতেও তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। কখন কীভাবে এখানে আবহাওয়ার বদলে যায় জানা যায়নি এখনও।

    গবেষকরা বলছেন, ডানাকিল ডিপ্রেশনের রহস্যভেদ করতে গেলে সেখানে থেকে পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো দরকার, যেটা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন অনেক বিজ্ঞানীই। ইথিওপিয়ায় গেলে পর্যটকদের দাল্লোলের আশপাশ ঘুরিয়ে দেখানো হয়। তবে ডানাকিল ডিপ্রেশনের কোর এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখান না ট্যুর গাইডরা। কখন কীভাবে বিপদ আসতে পারে জানা নেই কারও।

    সায়েন্স জার্নালে বলা হয়েছে, এখানকার আগ্নেয়গিরি বৃহস্পতির অতি ভয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরি ‘আইও’-র মতো। আজও ভূগর্ভস্থ লাভা বেরিয়ে এসে পুকুরের জলে মেশে। তাই সবসময়েই টগবগ করে ফুটছে এখানকার জলাশয়গুলো। কোথাও কোথাও শান্ত, নিস্তরঙ্গ ঝর্না রয়েছে, যার চারদিক ঘেরা হলুদ ও সবুজে। ভুল করেও যদি এই জল স্পর্শ করে ফেলা যায় তাহলেই বিপদ। শরীর পুড়িয়ে দেবে অ্যাসিড।

    আফ্রিকার জনজাতির কাছে দাল্লোলের এই জায়গা ভুতুড়ে। তাঁরা বিশ্বাস করেন, দিগন্তবিস্তৃত তপ্ত জলাভূমি আর বিষাক্ত গ্যাসের ডানাকিল ডিপ্রেশনে নাকি ভিনগ্রহের প্রাণীর বাস। এই এলাকায় প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না সেই নিয়ে বহুকাল ধরেই গবেষণা চালাচ্ছে ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের বিজ্ঞানীরা। মুখ্য গবেষক পিউরিফিসিয়োঁ লোপে গার্সিয়া জানিয়েছেন, অতিরিক্ত অ্যাসিড ও ক্ষার মিশে আছে এই এলাকার যত্রতত্র। সেই সঙ্গে খনিজ লবণের প্রাচুর্য। এই তিন বৈশিষ্ট্যই প্রাণ তৈরির পথে মূল বাধা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More