মঙ্গলবার, আগস্ট ২০

তিন চাকার চলন্ত লাইব্রেরিতে বই ফেরিওয়ালা, শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে বই পৌঁছে দিচ্ছেন শিশুদের হাতে

চৈতালী চত্রবর্তী

“বই পড়াতেই আনন্দ। বই ছাড়া শিশুরা বড়ই একা,” অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক অ্যানটোনিও লা কাভার দৃঢ় বিশ্বাস একদিন তাঁর জন্মভিটে ও তার আশপাশের শহর-গ্রামের গোটাটাই শিক্ষার আলোয় মুড়ে দেবেন। স্কুল থেকে অবসর নেওয়ার পর শিক্ষার দূত হয়ে তাই পথে নেমেছেন তিনি।

তিন চাকার ভ্যানটাই এখন তাঁর চলন্ত লাইব্রেরি- বিবলিওমটোকারো। কাঁচের শো কেসে ঠাসা বই। ইতালির ব্যাসিলাকাতার রাস্তা ধরে পাহাড়ের বাঁক ঘুরে ছুটে চলেছে তাঁর মোবাইল লাইব্রেরি। পথে শিশুদের দেখলেই বই হাতে হাসিমুখে বেরিয়ে আসছেন সাদা চুলের প্রৌঢ়। বই ফেরি করাই তাঁর কাজ।

পাহাড়ের কোলে প্রত্যন্ত গ্রাম সান পাওলো। ২৭০ জন গ্রামবাসীর মধ্যে মাত্র দু’টি শিশু পড়াশোনা করে। তাও দূরত্বের জন্য স্কুলে যেতে পারে না। বাকিদের অক্ষর জ্ঞানটুকুও নেই। পাশাপাশি গ্রামগুলোরও একই ছবি। শিক্ষার আলো অশিক্ষার অন্ধকার দূর করতে পারেনি সেখানেও।

“আমার খুব কষ্ট হয় যখন দেখি কচিকাঁচারা বই পড়ার স্বাদ থেকে বঞ্চিত। আমার নিজের গ্রামেও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বই পড়ার চল নেই। কোনওরকমে স্কুলের গণ্ডি পার হওয়াটাই সেখানে রেওয়াজ,” প্রৌঢ়ের চোখে ক্লান্তি। সিলেবাসের গতে বাঁধা পড়াশোনার বাইরেও যে একটা মস্ত জগৎ আছে তার ছবি তুলে ধরাটাই প্রয়াস লা কাভার।

শহর থেকে গ্রামে ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। ক্লান্তি নেই, বিরক্তি নেই। চড়াই-উৎরাই ভেঙে ছুটে চলেছে তাঁর লাইব্রেরি। সবরকমের বই আছে তাঁর সংগ্রহে। ছোটদের জন্য রঙিন ছবির বই যেমন আছে, তেমনি কিশোর-কিশোরীদের জন্য নানা রকম গল্প-উপন্যাস, তরুণদের জন্য সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, লা কাভার সংগ্রহের তালিকাটা দীর্ঘ। ভ্যানের ভিতর ঢুকলে দেখা যাবে, ভিতরে লাগানো আছে ছোট এলসিডি টিভি। শিশুদের সিনেমা বা নামী মানুষের বক্তৃতা শোনানোর ব্যবস্থাও আছে।

লা কাভার চলন্ত লাইব্রেরি দেখলেই এখন ছুটে আসেন শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্করাও। কেউ পছন্দের বই বেছে দাঁড়িয়েই পড়তে শুরু করে দেন, আবার কেউ কিছুদিনের জন্য চেয়ে নেন বই। সেই পথে ফের বই-ফেরিওয়ালাকে দেখলে ফেরত দিয়ে দিলেই হল। তবে শিশুদের অনেক বই উপহার হিসেবেও দিয়ে দেন লা কাভা। কাছে বসিয়ে বই পড়তে সাহায্যও করেন খুদেদের। হাতে সময় থাকলে রীতিমতো টেবিল, চেয়ার পেতে বসে ছোটখাটো ক্লাসও নিয়ে নেন। সব ব্যবস্থাই রয়েছে তাঁর মোবাইল ভ্যানে।

লা কাভার কথায়, “বই ফেরি করাই আমার আদর্শ। এখানে কোনও সামাজিক বার্তা নেই, কোনও সংস্কারের ঘেরাটোপ নেই। শুধু অনাবিল আনন্দ আছে। আমার মনের খেয়ালে শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোই উদ্দেশ্য, এটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।”

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Comments are closed.