হন্ডুরাসের বিস্ময় ‘চোলুটেকা’, প্রলয় ঝড়ে নদীর মুখ ঘুরেছে, চিড় ধরেনি সেতুতে

হন্ডুরাসের এই সেতু পৃথিবীর এক বিস্ময়। বিধ্বংসী ঝড় হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, ঘুরিয়ে দিয়েছিল আস্ত একটা নদীর গতিপথ, কিন্তু ভাঙতে পারেনি এই সেতুর গর্ব।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২২ বছর ধরে সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। প্রলয় ঝড় তার বুকে কাঁপন ধরাতে এসেছিল। পারেনি। শিরদাঁড়ায় এতটুকু টান পড়েনি। তার ভিত দৃঢ়, ঋজু। এতটাই মজবুত তার শিকড় যে প্রকৃতির কোনও প্রলয়ঙ্কর ঝড়ই তার অস্তিত্বকে টলাতে পারবে না। চোলুটেকা ব্রিজ (Choluteca Bridge) ।

হন্ডুরাসের এই সেতু পৃথিবীর এক বিস্ময়। বিধ্বংসী ঝড় হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, ঘুরিয়ে দিয়েছিল আস্ত একটা নদীর গতিপথ, কিন্তু ভাঙতে পারেনি এই সেতুর গর্ব। কত শত ভাঙা-গড়ার খেলা দেখে, ফসিল হয়ে যাওয়া ইতিহাসের সাক্ষী নিয়ে এক অথর্ব, নিঃসঙ্গ সেতু হয়ে আজও একা দাঁড়িয়ে আছে চোলুটেকা।

কাজ নেই, তাই হয়তো নামের প্রচারও নেই। একলা সেতু তার নির্মাণশৈলীর অহঙ্কার নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেতু মানে সংযোগ, আর এই সংযোগের রাস্তাটাই ছিনিয়ে নিয়েছে প্রলয় ঝড়। কিন্তু তাও এই সেতু এক নব জীবনের ইঙ্গিত দেয়। হন্ডুরাসের মানুষজনের কাছে এই সেতু পুনর্জন্মের প্রতীক। স্থানীয়রা বলেন ‘উদিত সূর্যের সেতু’ (The Bridge of the Rising Sun) । সব হারিয়েও যে শিরদাঁড়া সোজা করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেয়। সূর্যের আলোর মতোই যার অস্তিত্ব এক নতুন দিনের কথা বলে। চোলুটেকা শুধু ইতিহাস নয় হন্ডুরাসের ভাবাবেগের সঙ্গেও জড়িত। জীবনের নানা উত্থান-পতনের সঙ্গে এই সেতুর তুলনা টানা হয় আজও।

 

১৯৩৫ সালে আমেরিকার সেনা ইঞ্জিনিয়াররা বানালেন  ‘ক্যারিয়াস ব্রিজ’  

সালটা ১৯৩৫। হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট তখন টিবারসিও ক্যারিয়াস অ্যানডিনো। টিবারসিও পরপর দু’বার হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। একবার ১৯২৪ সালে, পরের বার ১৯৩৩-এ। টিবারসিওর নির্দেশে মার্কিন সেনার ইঞ্জিনিয়াররা প্রায় ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু তৈরির কাজ শুরু করলেন। ১৯৩৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হল। সেতুর নাম দেওয়া হল প্রেসিডেন্টের নামেই ‘ক্যারিয়াস’ ব্রিজ। যাকে পুরনো চোলুটেকা বলা হয়। এই সেতু শুধু হন্ডুরাসের নয়, মধ্যে আমেরিকার দীর্ঘতম সেতু ছিল সে সময়। ১৯৩৫-৩৭ সালেও এই সেতুর নির্মাণশৈলী মুগ্ধ করেছিল। অবশ্য তখনও চোলুটেকা উদিত সূর্যের সেতু হয়ে ওঠেনি। তবে ক্যারিয়াস ব্রিজেরও নানা ঝড়ঝাপটা সইবার ক্ষমতা ছিল। এতটাই পাকাপোক্ত ছিল তার গড়ন।

পুরনোকে নতুন রূপ দিলেন জাপানিরা, তৈরি হল ‘উদিত সূর্যের সেতু’

১৯৯০ সালের পর থেকে নতুন রাস্তা তৈরির দরকার ছিল। হন্ডুরাস সরকার ঠিক করে নতুন চোলুটেকা সেতু তৈরি হবে। খবর যায় জাপানের প্রথম দশে থাকা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি হাজ়ামা আন্দো কর্পোরেশনে। এই জাপানি সংস্থার তখন বিরাট নাম। ১৯৯৬ সাল। নতুন চোলুটেকা তৈরির কাজ শুরু করেন জাপানি ইঞ্জিনিয়াররা। ১৯৯৮ সালে সেতু তৈরি শেষ হয়। দেখা যায় পুরনো চোলুটেকার থেকেও এর দৈর্ঘ্য বৈশি। প্রায় ৪৮৪ মিটার দীর্ঘ সেতুর নাম রাখা হয় ‘উদিত সূর্যের সেতু’ । চোলুটেকারই যেন নবজন্ম হয়। জাপানি ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি লাতিন আমেরিকার দীর্ঘতম সেতুর তকমা পায় চোলুটেকা।

মজবুত, সুদর্শন সেতু। তার নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে চোলুটেকা নদী। ১৯৯৮ সাল থেকেই জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় এই সেতু। ভারী যান চলাচলেও বাধা থাকে না। তবে এই সুখ বেশিদিন সইল না। ওই বছরই হন্ডুরাসে আছড়ে পড়ল সুপার সাইক্লোন হারিকেন মিচ।

প্রলয় ঝড়ে তছনছ হল হন্ডুরাস, সুখের ঘর ভাঙল চোলুটেকার

১৯৯৮ সালে মধ্য আমেরিকায় আছড়ে পড়ল হারিকেন মিচ। ‘ফিফথ ক্যাটেগরি’ সুপার সাইক্লোন যাকে দ্বিতীয় ভয়ঙ্কর আটলান্টিক হারিকেন বলা হয়। ঝড়ের দাপটে তছনছ হল মধ্য আমেরিকা। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ল হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়াতে। হন্ডুরাসের প্রায় ১৫০ ব্রিজ ভাঙল, নদীর জল উপচে ভাসিয়ে গিয়ে গেল শহর-গ্রাম। জলে ডুবল ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। প্রাণ গেল প্রায় সাত হাজার মানুষের। নিকারাগুয়াতে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারালেন ঝড়ের তাণ্ডবে।

বিধ্বংসী ঝড়ের দাপট মুখ বুজেই দেখল চোলুটেকা। তার চারপাশে তখন শুধুই ধ্বংস আর হাহাকারের চিহ্ন। রাস্তাঘাট নেই, নদীর গতিপথ বদলে গেছে, নদী উপত্যকা বন্যার জলে ভেসে গেছে। গোটা এলাকার মানচিত্রই বদলে গেছে। বাড়িঘর, মানুষের অস্তিত্ব মিটে গেছে। শুধু খাঁ খাঁ প্রান্তর এক অতি ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিভীষিকা নিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে রয়েছে। তারই মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে চোলুটেকা। একা, নিঃসঙ্গ। ঝড় তার কোনও ক্ষতি করতে পারেনি।

মুখ ফিরিয়েছে নদী, চোলুটেকা আজও একা

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, প্রচণ্ড ঝড়ের দাপটে নদীর গতিমুখই বদলে গেছে। একটা এলাকার মানচিত্রই পাল্টে গেছে। একটা আস্ত নদীকে যেন জোর করে তার গতিপথ থেকে সরিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্যদিকে। এত সবকিছুর পরেও চোলুটেকা সেতুর একটা স্তম্ভেও কাঁপন ধরেনি। তবে মানুষের প্রযুক্তি একদিকে যেমন চোলুটেকার গর্ব, অন্যদিকে অভিশাপ। কারণ এই সেতুর এখন আর কোনও কাজ নেই। যোগাযোগের রাস্তাই তো নেই। সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই নদীও মুখ ঘুরিয়েছে। চোলুটেকা তাই একা। হন্ডুরাসবাসীরা বলেন, ‘The Bridge to nowhere’। চোলুটেকা সেতু নিয়ে এখনও নানারকম তর্ক-বিতর্ক আছে। অনেকেই বলেন, ১৯৯৮ সালে এমন একটি ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়তে পারে তার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও ব্রিজের নবনির্মাণ সঠিক পরিকল্পনা মেনে হয়নি। ঝড়ের দাপটে কী কী ক্ষতি পারে সেটা খতিয়ে দেখে নেওয়া উচিত ছিল ইঞ্জিনিয়ারদের। এমন একটা সেতু যার নির্মাণকাজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করা হয়, সেই সেতুই এখন কর্মহীন হয়ে পড়ে রয়েছে। কবে এবং কীভাবে ফের তাকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা যাবে, সে প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More