ধর্ষণ করে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে মহিলাদের, নিখোঁজ হচ্ছেন বহু মানুষ, ভয়ঙ্কর হত্যালীলা চলছে এই রাজ্যে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    ২০১৬ সালের ২৮ জুন। মন্টানার সেনেট ডিস্ট্রিক্ট ২১। প্রায় মধ্যরাত। অন্ধকার চিরে তীব্র হয়ে উঠল এক মর্মভেদী আর্তনাদ। রাস্তা দিয়ে পাগলের মতো ছুটে চলেছেন এক মহিলা। দাউদাউ করে জ্বলছে তাঁর সারা শরীর। আছাড়িপিছাড়ি খেতে খেতে শেষে একেবারই পড়ে গেলেন মহিলা। রাস্তার মাঝেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল তাঁর গোটা শরীর। ঘটনার ১৪ ঘণ্টা পরে যখন দেহ উদ্ধার হয়েছিল ছাই ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন ওই মহিলার নাম রয়লিন রাইডস হর্স। বয়স ২৮ বছর। মন্টানার ‘ক্রো জনজাতি’র সদস্য। এই মৃত্যু নিয়ে একসময় তোলপাড় হয়েছিল মার্কিন মুলুক। পরে আততায়ীরা ধরাও পড়ে। খুনের কারণ অজানা।

    রয়লিন রাইডস হর্স

    ২০১৭ সাল। জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল ফ্রেডি। তিন দিন পরে তার দেহ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ঝোপঝাড়ের মধ্যে। অর্ধনগ্ন দেহটা জুড়ে ছিল কালশিটের দাগ, দগদগে ক্ষত। কোন এক নিষ্ফল আক্রোশে মারতে মারতেই খুন করা হয়েছিল ফ্রেডিকে। বয়স ১৪ বছর।

    ঘটনা শুধু এই দুটো নয়। আরও অনেক, শত শত। হত্যালীলার শুরু হয়েছে সেই নব্বইয়ের গোড়া থেকেই। ইদানীংকালে বেড়েছে। আচমকাই উধাও হয়ে যাচ্ছেন মানুষজন। কখনও তাদের ক্ষতবিক্ষত, দগ্ধ দেহ মিলছে নির্জন স্থানে, আবার কখনও কোনও হদিশই মিলছে না নিখোঁজদের। রয়লিনের হত্যায় অভিযুক্ত দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল যাদের মধ্যে একজন ছিল ২১ বছরের তরুণ ও অন্যজন ২৬ বছরের তরুণী অ্যাঞ্জেলিকা জো হোয়াইটম্যান। অ্যাঞ্জেলিকা জানিয়েছিল প্রথমে বেধড়ক মেরে আধমরা করে দেওয়া হয়েছিল রয়লিনকে। পরে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসবন্ধ করার চেষ্টা হয়। শেষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় তাঁর শরীরে। কেন এত আক্রোশ সেটা বলতেই পারেনি অপরাধীরা। রয়লিনের ছয় সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছে সরকার।

    রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হচ্ছেন মহিলা-কিশোরীরা, নিষ্ঠুর হত্যালীলা চলছে বছরের পর বছর

    ৮৯০,০০০ হেক্টর জায়গা জুড়ে মার্কিন মুলুকের উত্তর-পশ্চিম অংশে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা মন্টানা। সাত-নয় রকম জনজাতির বাস এখানে। এই আদিবাসীদের সিংহভাগজুড়ে রয়েছে ‘ক্রো উপজাতি’। নেটিভ আমেরিকানদের এই গোষ্ঠী মন্টানায় নিজেদের আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। তাদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা, আইন-আদালত রয়েছে। এই ট্রাইবাল ল্যান্ড বা আদিবাসী জনজাতিদের এলাকাকে অনেকেই ‘ক্রো নেশন’ (Crow Nation) বলে থাকেন।

    কম করেও আট হাজার উপজাতির বাস এখানে। তার মধ্যে ‘ক্রো’ জনজাতি ছাড়াও রয়েছে আরও কয়েকটি আদিবাসী সম্প্রদায়। তবে তারা সংখ্যায় কম। প্রতিবেশী এলাকা নর্দান চেয়েনের সঙ্গে এই ক্রো-দের জীবনযাত্রার ফারাক অনেকটা। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে এক সূক্ষ আড়াল রেখে চলে এই জনজাতি। নিজস্ব সংস্কৃতি আঁকড়েই বেঁচে থাকতে ভালবাসে এরা।

    ক্রো ইন্ডিয়ান জনজাতি

    কানাডা ও মার্কিন মুলুকের অনেক জায়গাতেই ক্রো জনজাতিরা মিলেমিশে গেছে। মন্টানার এই ‘সিরিয়াল কিলিং’-এর বিষয়ে প্রথম তুলে ধরে আমেরিকার কয়েকটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। তারপর হুহু করে এই রহস্যের কথা ছড়িয়ে পড়তে থাকে গোটা মার্কিন মুলুকেই। ক্রো এজেন্সি জানিয়েছে, এই হত্যালীলাতে লাগাম পরানো যাচ্ছে না। রাতের আঁধারে, ভরদুপুরে কীভাবে জলজ্যান্ত মানুষগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে সেটা রহস্যই থেকে যাচ্ছে। মন্টানার বেশিরভাগ এলাকার রাস্তাঘাটই জনশূন্য। সিসিটিভি ক্যামেরা তো দূর, রাস্তায় বিজলি বাতিও একটি-দুটির বেশি নেই। সেক্ষেত্রে অপরাধীদের সনাক্ত করা মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আরও একটা ব্যাপার ঘটছে মন্টানাতে। ক্রো এজেন্সির অফিসার এবং মন্টানা হাউসের আধিকারিক কনর‍্যাড স্টিউয়ার্ট জানিয়েছেন, মহিলা, কিশোরী ও শিশুরাই অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীদের মূল নিশানা। যে ক’টা মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে তার বেশিরভাগই যুবতী বা কিশোরী। প্রত্যেককেই ক্ষতবিক্ষত করে, অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে।

    নিজস্ব সংস্কৃতি আঁকড়েই গোটা দুনিয়া থেকে আলাদা এই জনজাতি

    কখনও ধর্ষণ, কখনও শ্বাসরোধ আবার কখনও পুড়িয়ে খুন

    ২০১৩ সাল। ২১ বছরের হান্নার ক্ষতবিক্ষত দেহ খুঁজে পাওয়া যায় রাস্তার ধারে। কয়েক মাস আগেই মা হয়েছিলেন হান্না। পুলিশ জানিয়েছিল, যুবতীর শরীরে কাপড়ের কণামাত্র ছিল না। ছিন্নভিন্ন ছিল যোনি। সারা শরীরে পচন ধরেছিল। রাস্তার সিসিটিভি ক্যামেরায় শেষবারের মতো হান্নাকে হাঁটতে দেখা গিয়েছিল। অদ্ভুতভাবে এর পরের ঘটনাও সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে গিয়েছিল। ১৪ বছরের ফ্রেডিকেও ধর্ষণ করেই খুন করেছিল আততায়ীরা।

    প্রথমে মনে করা হয়েছিল মহিলাদের শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই খুন করা হচ্ছে। কিন্তু রয়লিনের মৃত্যুর পরে সে ভুল ভাঙে। কারণ রয়লিনকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। অপরাধীদের মধ্যে ছিল এক মহিলাও।


    হত্যালীলার প্রতিবাদ মন্টানায়

    হান্নার মৃত্যুর পরে কয়েক মাস কাটে। একই ভাবে খুন করা হয় তাঁর মাকে। অভিযোগ ওঠে হান্নার পরিবারেরই কেউ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে প্রমাণের অভাবে মামলা ধামাচাপা পড়ে যায়।

    ২০০৮ সালের আরও একটি নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কিনারা এখনও করতে পারেনি পুলিশ। একটি পরিবারের প্রায় সকলকেই খুন করে পুঁতে দেওয়া হয় ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। ক্রো এজেন্সির অফিসার স্টুয়ার্ট বলেছেন, জুলিয়েট লিটিল লাইট, তাঁর স্বামী টেডি ও তাঁদের একমাত্র ছেলে ওয়েট নিখোঁজ হয়ে যায় আচমকাই। পুলিশ যখন তল্লাশি চালাচ্ছে, সেই সময় রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় জুলিয়েটের ঠাকুমার। বৃদ্ধার সারা শরীর কেউ ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছিল। এর একবছর পরে মন্টানার সীমানার বাইরে একটি নদী উপত্যকায় খুঁজে পাওয়া যায় অসংখ্য হাড়গোড়। ডিএনএ মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয় এই হাড়গোড়গুলো ছিল জুলিয়েটের পরিবারের। কী কারণে এবং কেন তাঁদের খুন করা হয়েছিল সেই কারণ অজানা। হত্যা পদ্ধতিও সামনে আনতে চায়নি পুলিশ।

    সিরিয়াল কিলিং-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-আন্দোলন

    গত বছর থেকেই মন্টানার বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন শুরু করেছেন আদিবাসীরা। Missing and Murdered Indigenous People (MMIP) নামে সেই আন্দোলনের পুরোভাগে রয়েছেন মহিলারাই। ক্রো জনজাতির সঙ্গে এই আন্দোলনে নেমেছেন নদার্ন চেয়েন ও অন্যান্য প্রদেশের জনজাতিরাও। জাতীয় সড়কের উপর প্ল্যাকার্ড নিয়ে চলেছে দফায় দফায় প্রতিবাদ।

    বিক্ষোভকারীদের তরফে স্লোগান তোলা হয়েছে, অপরাধপ্রবণতা লাগামছাড়া হয়েছে মন্টানায়। ধর্ষণ-গণধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৬০ শতাংশ। সংখ্যালঘু আদিবাসীদের উপর নির্যাতন চলছে। মন্টানার গভর্নর স্টিভ বুলক জানিয়েছেন, বিগত কয়েক দশকে মন্টানাতে শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ বিরোধ বেড়েছে। সেটাও এই হত্যালীলার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ক্রো ইন্ডিয়ানদের আধিপত্য মেনে নিতে পারছেন না শ্বেতাঙ্গরা।

    টিম ফক্স

    মন্টানা স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল টিম ফক্স জানিয়েছেন, এই আদিবাসী জনজাতির আইনের মধ্যে অনেক গলদ রয়েছে। যার কারণেই সঠিক বিচার হয় না অপরাধীদের। প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে তারা আবার অপরাধ করতে শুরু করে দেয়। তা ছাড়া বিগত কয়েক বছরে পারিবারিক বিবাদ, তরুণদের মধ্যে ড্রাগের নেশা অস্বাভাবিক ভাবে বড়েছে। সেটাও এই হত্যালীলার কারণ হতে পারে। খুনের পদ্ধতি ও ধরন ভিন্ন ভিন্ন। কাজেই আততায়ী একাধিক। গোটা মন্টানা জুড়েই এই খুনের নেশা মহামারীর আকার নিয়েছে। আগামী দিনে আরও ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘটতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More