বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮

সাতটা ফুটবল স্টেডিয়ামের সমান ডিটেনশন ক্যাম্প অসমে, নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়াদের ঠাঁই কি এখানেই?

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোটের আগে আগেই শোরগোল উঠেছিল গোয়ালপাড়া ডিটেনশন শিবিরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে এক বাঙালির। সচিত্র ভোটার তালিকা থাকা সত্ত্বেও ২০১৭ সালে বিদেশি হিসেবে তাঁকে ঘোষণা করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। বন্দি করা হয় গোয়ালপাড়ার এক শরণার্থী শিবিরে। ভোট মিটেছে। অসমের জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকাও প্রকাশিত হয়েছে। বাদ পড়েছে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম। যাঁরা নিজেদের নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারেননি, তাঁদের ভবিতব্য কী? এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে অসমের বুকে সেই তালিকায় নাম না ওঠা কয়েক লাখ মানুষের মনে। তাহলে কি ঠাঁই হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে?

জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে থেকেই ডিটেনশন ক্যাম্প বানানো কাজ শুরু দেয় রাজ্য সরকার। রাজ্যে নানা প্রান্তে অন্তত ১০টি শরণার্থী শিবির রয়েছে। তবে এই শিবিবের আকার-আয়তন প্রকাণ্ড। নাগরিকত্ব বিল থেকে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়তে পারে ভেবেই হয়তো আগাম পরিকল্পনা করেই রাখা হয়েছিল।

গুয়াহাটি থেকে ১৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে গোয়ালপাড়ার জেলার মাটিয়া গ্রাম। এখানেই ২.৫ হেক্টর জমির উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রকাণ্ড শরণার্থী শিবির। নাগরিক পঞ্জী থেকে বাদ পড়া মানুষে আশ্রয়ের জন্যই গত বছর  এতদিন নিজের রাজ্য, নিজের বাড়ি, নিজের পরিবার বলে গর্ব করতেন যাঁরা, নাগরিকপঞ্জির গেরোয় উদ্বাস্তু সেই সব মানুষগুলোর শেষ মাথা গোঁজার আশ্রয় বলতে এখন এই শরণার্থী শিবির। আড়ে বহরে সাতটা ফুটবল স্টেডিয়ামের সমান। দেশের মধ্যে একমাত্র অসমেই এত বিশাল ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে।

মাটিয়ার এই ডিটেনশন ক্যাম্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় গত বছর থেকেই। বরাদ্দ করা হয় ৪৬ কোটি টাকা। অসম পুলিশ হাউজিং কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ শেষ হয় ডিসেম্বর নাগাদ। বর্তমানে ডিটেনশন ক্যাম্পের খোলনলচা আরও বদলে গেছে। আগে হাজার তিনেক মানুষ ঠাঁই নিতে পারতেন এই ক্যাম্পে। এখন আরও বেশি সংখ্যক পারবেন। সার বেঁধে বাড়ি পর পর দাঁড়িয়ে রয়েছে অভিবাসীদের পথ চেয়ে। অন্তত ১৫টা চারতলা বাড়ি তৈরি হয়েছে শরণার্থীদের জন্য। হাসপাতাল, অডিটোরিয়াম সবই রয়েছে। বিরাট বড় রান্নাঘর। হাজার হাজার মানুষের জন্য রান্না হবে। বাথরুমের সংখ্যা আগে ছিল হাতে গোনা। এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮০টি। কর্তৃপক্ষদের কথায়, বাথরুমের পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

নিরাপত্তার ব্যবস্থাও বেশ আঁটোসাঁটো। ডিটেনশন ক্যাম্পের বাইরে ২০ ফুটের দেওয়াল, ভিতরে ৬ ফুটের চওড়া দেওয়াল আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখবে শরণার্থীদের। অসম পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, ‘‘শিবিরের ঘরগুলো হোস্টেলের ঘরের মতো। এক একটি ঘরে চার-পাঁচ জন থাকতে পারবেন। প্রতিটি ঘরে বড় বড় জানলা রাখা হয়েছে। আলো-হাওয়া চলাচল করতে পারবে ভালোভাবেই।’’ খোলামেলা পরিবেশেই রাখা হবে শরণার্থীদের, জানিয়েছেন ওই আধিকারিক।
বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে মহিলা ও শিশুদের। প্রসূতিদের জন্য থাকবে ভিন্ন ব্যবস্থা। ২৪ ঘণ্টা ডাক্তার-নার্স থাকবেন চাইল্ড কেয়ার ইউনিটে। শিশুদের পড়াশোনার দিকেও খেয়াল রাখা হবে।

গত ৩১ অগস্ট এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তার মেঘ ঘনিয়েছে রাজ্য জুড়ে। ২০১৮-র ৩০ জুলাই নাগরিকপঞ্জির খসড়া প্রকাশ করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। সেইসময় তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন ৪১ লক্ষ মানুষ। তাই গত একবছর ধরে চূড়ান্ত তালিকার দিকে তাকিয়েছিল গোটা দেশ। চূড়ান্ত খসরায় দেখা যায়, ১৯ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৭ জনের নাম বাদ পড়েছে।

তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে বলে এখনই কাউকে বিদেশি বলে দেগে দেওয়ার সম্ভাবনা যদিও নেই। ১২০ দিনের মধ্যে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারবেন ওই সমস্ত মানুষ। আবার ট্রাইব্যুনালে মামলা হেরে গেলে, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। কিন্তু কত দিনে সেই প্রক্রিয়া শেষ হবে, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। সাধারণ মানুষের ১ হাজার ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে অসমের এই এনআরসি অসম ও অসমের বাইরেও কয়েক কোটি মানুষকে অস্তিত্বের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

Comments are closed.